কথা বলছিস না কেন? মন খারাপ করলে কি মা বেঁচে উঠবে? অমন অনেক কষ্ট আসবে জীবনে, সইবি কী করে!
বলো হরি–হরিবোল।
চমকে ওরা মুখ ফেরাল। অনেকগুলো মানুষ ঢুকল শ্মশানে। আথালিবিথালি কাঁদছে এক মাঝবয়সি বিধবা। কয়েক জন তাকে ধরে নিয়ে গেল সিঁড়ির দিকে। ওদের পাশ দিয়েই খাটটাকে বয়ে নিয়ে গেল। ইউক্যালিপ্টাসের গন্ধে ঝেঁঝে উঠল জায়গাটা। সন্তোষ মুখ ঘুরিয়ে নিল। সিঁড়ির কাছ থেকে কান্নার রেশ আসছে।
হাওয়াটা এমন বিদঘুটে বইছে…
চিতার ওপর ঝুঁকে সন্তোষ খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে আবার বলল, আগুন সব মাথার দিকে উঠে এসেছে। পা দুটো এখনও ধরল না।
বাবা আমি দেয়ালে নাম লিখব।
কী লিখবি?
চোখাচোখি হল ওদের। পা দিয়ে এক টুকরো জ্বলন্ত কাঠকে চিতায় ঠেলে সন্তোষ বলল, কী হবে লিখে, কালকেই বৃষ্টিতে ধুয়ে যাবে।
পাগলটা চিৎকার করছে। বিধবার কান্না শোনা যাচ্ছে। মৃতদেহ নামিয়ে লোকগুলো চাপা স্বরে জটলা করছে। সারা শ্মশানে মাংস পোড়ার গন্ধ চারিয়ে রয়েছে। বাইরে রেলইঞ্জিন হঠাৎ হুইসল দিল।
নীচু হয়ে নাড়ু একটা ফুল তুলে নিল। এইমাত্র খাট থেকে পড়ে গেছে। সন্তোষের নজর এড়ায়নি। হাত বাড়াল সে। নাড়ু হাত মুঠো করে পিছনে রাখল।
কী করবি ওটা নিয়ে?
বাড়িতে নিয়ে যাব।
কেন?
আমি গঙ্গায় দেব।
না, গঙ্গার কাছে যেতে হবে না।
আমি চান করব।
না, অসুখ করবে।
সন্তোষ উঠে দাঁড়াল। নাড়ু পিছিয়ে গেল। পিছনে দেওয়াল। সামনে জুড়ে সন্তোষ এগিয়ে আসছে। থমকে গেল। কুকুরটা নাড়ুর গা ঘেঁষে আসতেই তাড়াতাড়ি একটা ঢিল কুড়িয়ে নিল। মেরো না খোকা, ও কামড়াবে না।
শ্মশানের গেটের কাছে শোয়া লোকটা শুয়ে শুয়েই বলল, আজ সকালেই ওর বাচ্চাটা রেলে কাটা পড়েছে। ওকে মেরো না।
পাগলা একদৃষ্টে তাকিয়ে। সন্তোষ নাড়কে আগলে শক্ত হয়ে দাঁড়াল।
অ্যাই ক্যাপ্টেনসাব, ইধার আও।
গেটের কাছে শোয়া লোকটা পাগলকে ডাকল। মিলিটারি কায়দায় ঘুরে পাগল সেলাম করল। গটগট করে লোকটার কাছে গিয়ে হাত পাতল। মাটি থেকে একটা ঢিল তুলে লোকটা ওর হাতে দিতেই সেলাম করে পাগল চলে গেল সিঁড়ির দিকে। আচমকা ইঞ্জিনের হুইসল বাজল। মালগাড়ি শান্টিং-এর শব্দ আসছে।
ভয় পেয়েছিলি?
চিতার একধারটা ধসে পড়ল। ওঁড়োগুঁড়ো ফুলকি উড়ছে। আগুন গোলাপি হয়ে উঠেছে।
আমাদের ভাগ্যি ভালো এখনও বৃষ্টি নামেনি।
টেনে টেনে কান্নার সুর আসছে। মালগাড়ি শান্টিং হচ্ছে। লোহায় লোহায় ঠোকাঠুকি হয়ে কর্কশ শব্দটা গুড়গুড় করে সরে যাচ্ছে এক গাড়ি থেকে আর এক গাড়িতে।
শম্ভুজ্যাঠার দিদি মালগাড়ির তলা দিয়ে পার হতে গিয়ে কাটা পড়েছিল।
নাড়ু চুপ করে থাকল। চারদিকে চোখ বুলিয়ে সন্তোষ আবার বলল, সকাল হলেই আগে তোর জন্য কোরা কাপড় কিনতে হবে। কিন্তু ডোম ব্যাটা গেল কোথায়? এক বার ডেকে আনবি?
কেন?
মাথাটা বাঁশ দিয়ে ভেঙে দেবে। দেওয়ালের সঙ্গে সিঁটিয়ে গেল নাড়। থরথর করে কেঁপে উঠল ওর গোটা শরীর। ভয় করছে। হাসপাতালের লিফটের সেই চৌকো লোহাটার মতো বাবা যেন নেমে আসছে। অনেকক্ষণ পেচ্ছাপ করিনি। যন্ত্রণা হচ্ছে। খিদে পাচ্ছে। থলিতে পেয়ারা আছে। মা খেতে ভালোবাসে।
দাঁড়িয়ে রইলি যে?
পারব না।
কথা বললে শুনিস না কেন? তখন বললুম, ফুলটা দিতে দিলি না কেন?
আমার ইচ্ছে, আমার খুশি।
নাড়ু চিৎকার করে উঠল। সন্তোষ থ হয়ে গেছে। গোড়ালি আর পায়ের পাতা এখনও পোড়েনি। ফুলে টসটস করছে। হাওয়া দিচ্ছে। আগুন কাত হয়ে মাথার দিকে জ্বলছে।
আমার কথা শুনবি না?
না।
শুনবি না?
না।
থলির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে নাড়ু একটা পেয়ারা ধরল। বাবা এগিয়ে আসছে। মারব। চৌকো লোহার মতো এগিয়ে আসছে। পালাব। এই শ্মশান থেকে বেরিয়ে যাব। যেদিকে হোক চলে যাব। ছুটব।
আমার অবাধ্য হবি? বল, অবাধ্য হবি?
নাড়ুর হাত মুচড়ে ধরল সন্তোষ। বিকট চিৎকার করে বিধবাটি ছুটে এল। সাজানো চিতায় মৃতদেহটা তোলা হচ্ছে।
ছিটকে পিছিয়ে গেল সন্তোষ। হাতে দাঁত বসিয়ে দিয়েছে। শরীর জ্বলে উঠল। ছেলে আমায় ঘৃণা করে। আমি কী অন্যায় করেছি! ও শাস্তি দিতে চায়, অতটুকু ছেলে কী বোঝে দোষ-গুণের। ওকে শায়েস্তা করতে হবে। মারতে হবে। ভীষণ মারব, ওকে কাঁদিয়ে ছাড়ব।
ছুটে এল সন্তোষ নাড়ুর দিকে। জ্বলন্ত চিতাটাকে পাক দিয়ে নাড়ু ছুটল। শ্মশানের গেট পার হয়ে রাস্তায় পড়ল। পিছনে সন্তোষ ছুটে আসছে। দু-ধারে নির্জন রাস্তা গঙ্গার ধার ঘেঁষে সিধে চলে গেছে। অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। সামনে সারি দিয়ে মালগাড়ি দাঁড়িয়ে। এক লহমা ইতস্তত করে নাড়ু মালগাড়ির তলা দিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
নীচু হয়ে গাড়ির ফাঁক দিয়ে সন্তোষ গলে এল। অন্ধকার। এক হাত দূরেই আর একসার ওয়াগন। লম্বা টানা একটা গলি যেন। চিৎকার করে সন্তোষ ডাকল। কান পাতল। সাড়া নেই। আবার চিৎকার করল। সাড়া নেই। টুকরো পাথরের গলিটা এবড়োখেবড়ো। সন্তোষ টলে পড়ছিল। দু-হাত দিয়ে দু-দিকের ওয়াগন ধরে দাঁড়াল।
লোহার লাইনে কাঁপতে কাঁপতে কাছে আসছে একটা শব্দ। অন্ধকারে ফুলকিগুলো ছিটকে উঠছে। ইঞ্জিন আসছে। কোন লাইনে আসছে। সন্তোষ নাড়ুর নাম ধরে চিৎকার করল। কান পাতল। লাইনে গুড়গুড় শব্দটা জোর হচ্ছে। ওপাশে যেন পাথর ছিটকে পড়ার শব্দ হল। নাড়ু কি হাঁটছে? ইঞ্জিনটা কোন লাইন ধরে আসছে? ও যদি ভয় পেয়ে গাড়ির তলা দিয়ে আবার পালাতে যায় আর সেই সময়ই ইঞ্জিন গাড়িতে ধাক্কা দেয়। শম্ভুজ্যাঠার দিদির মুন্ডুকাটা লাশটা কাঁপছিল। কাঠের স্লিপার ক-টায় অনেক দিন পর্যন্ত কালো ছোপ ধরে ছিল। নাড়ুর মা র পেটের ব্যাণ্ডেজটা কালো হয়ে গিয়েছিল। এই গলিটা অন্ধকার। কিছু দেখা যায় না।
