সন্তোষ একইভাবে বসে ছিল। চিতা সাজানো হয়ে গেছে। এধার-ওধার তাকিয়ে সে নাড়কে ডাকল। চিৎকার করে ডাকল। দেওয়াল ঘেঁষে অন্ধকার দিকটায় নাড়ু সরে গেল। তিনটে লোক দেওয়ালে ঠেস দিয়ে চুপ করে বসে রয়েছে। ওদের এড়িয়ে নাড়ু আরও
অন্ধকারে পাঁচিলের ধার পর্যন্ত চলে এল। পাঁচিলের পরেই গঙ্গা।
চিৎকার আসছে। নাড়ু পাঁচিল আঁকড়ে দাঁড়াল, যাব না। কিছুতেই না। এখানকার গন্ধ ভালো লাগছে না। গরম লাগছে। মানুষগুলো সব কেমন কেমন। এখানে থাকব না, দেওয়ালে মা-র নাম লিখব। লুকিয়ে লিখব।
সন্তোষ খুঁজতে খুঁজতে নাড়ুর কাছে এল। নরম সুরে বলল, আয় নাড়ু, এখানে থাকিসনি!
ওরা সাজানো চিতার কাছে এল। সমিতির লোকেরা মৃতদেহটা মাটিতে নামিয়ে দিয়ে গেছে। সেইভাবেই এতক্ষণ পড়ে আছে। তবে পরনের কাপড়টা সন্তোষ বদলিয়ে একটা কোরা থানে ঢেকে দিয়েছে।
পায়ের দিকটা তুই ধর, তুলে দিই।
মৃতের কাঁধ ধরে সন্তোষ তাকাল। নাড়ু ইতস্তত করছে। চিতা সাজানোর ডোম নাড়ুর পাশে দাঁড়াল।
ভয় কী খোকাবাবু, এ তো হালকা লাশ আছে।
গোঁজ হয়ে নাড়ু দাঁড়িয়ে রইল। ডোম হাসল। সন্তোষকে লক্ষ করে বলল, কষ্ট হচ্ছে? হবেই তো।
তুমি একটু ধরো তো ভাই।
সন্তোষ কাঁধটা মাটি থেকে খানিকটা তুলে ধরে তাকিয়ে রইল ডোমের দিকে। নাড়ু অস্বস্তি বোধ করল। কেমন শক্ত চোখে বাবা তাকাচ্ছে। রেগে গেলে অমনভাবে তাকায়, নিতুদের নতুন চুনকাম করা দেওয়ালে ছবি এঁকেছিলুম বলে নালিশ করেছিল। বাবা তখন ওইভাবে তাকিয়েছিল। মা জড়িয়ে ধরেছিল তাই লাঠির ঘা পিঠে পড়েনি। মা-র হাতে কালশিরে পড়েছিল। কাচের চুড়ি ভেঙে গিয়েছিল। ডোমটা মা-র পা দুটো আঁকড়ে ধরেছে। ঝড় জমাদার ছুঁয়ে দিয়েছিল বলে মা চান করেছিল। বাবা ঝড়কে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিয়েছিল। একে বাবা নিজে থেকে ডেকেছে।
সরো, আমি ধরছি।
মৃতের পা-দুটো নাড়ু প্রায় ছিনিয়ে নিল। ডোম হেসে সরে দাঁড়াল। হালকা দেহটা অনায়াসেই চিতায় উঠল। শুধু সাজানো কাঠগুলো এক বার খচমচ করল। কতকগুলো কাঠ মৃতের বুকের ওপর ডোম চাপিয়ে দিল।
নাড়ু আয়, মুখে আগুন দিবি।
সন্তোষ হাতে-মাথায়-কপালে ঘি মাখিয়ে দিল। অল্প আলোতে চুলে-লেগে-থাকা বনস্পতির গুঁড়ো গুড়ো দানাগুলো আকাশের তারার মতো দেখাচ্ছে। চিতা জ্বলে উঠলেই চুলের সঙ্গে ওগুলোও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তুলো পাকিয়ে একটা সলতে তৈরি করে সন্তোষ মৃতের ঠোঁটের ওপর রাখল। নাড়ু কাছে আয়।
দেশলাই জ্বেলে সন্তোষ কাঠিটা নাড়ুর হাতে দিল। নিভে গেল কাঠিটা। আর একটা জ্বালতে গেল, জ্বলল না। চারটে কাঠি নষ্ট হতেই বিরক্ত হল সে। ঝিরঝিরিয়ে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি পড়েই থেমে গেল। ছোট্ট চিতাটা এখনও জ্বলছে। ছুটে গিয়ে সন্তোষ দেশলাইটা সেঁকে আনল। কাঠি জ্বেলে নাড়ুর হাতে তুলে দিয়ে আড়াল করে ধরল।
এক পলকের জন্য নাড়ু সন্তোষের মুখে তাকাল। ঠোঁট দুটো তেলতেলা। ফু দিয়ে যদি নিভিয়ে দিই কাঠিটা? তাহলে ধরে ফেলবে, মারবে!
হয়তো নিজেই আগুন দিয়ে দেবে। মা-র মুখে ছেলেদেরই আগুন দিতে হয়, নয়তো পাপ হয়।
সলতেটা জ্বলে উঠতেই নাড়ু কাঠিটা ফেলে দিল। মড়মড় করে পাটকাঠি ভাঙছে ডোম। পিছিয়ে গেল নাড়।
কতক্ষণ লাগবে পুড়তে?
ঘণ্টা তিন-চার।
কাঠ ভিজে নেই তো, যা বৃষ্টি শুরু হয়েছে ক-দিন ধরে!
নাড়ু হাঁটছে। দুপাশে সার-দেওয়া মাটিখোঁড়া জমি, দুটো নিবুনিবু চিতার পাশে জটলা করছে কতকগুলো লোক। মাঝখানে পথটা সিধে গঙ্গায় গিয়ে পড়েছে। সিঁড়ির মাথায় এসে নাড়ু দাঁড়াল। শ্মশানের আলোয় জল দেখা যাচ্ছে। জল চিকচিক করে কাঁপছে। হাসলে মা-র গোটা শরীরটা অমন কাঁপত। আমার গঙ্গায় চান করতে ইচ্ছে করছে।
হ্যাই, তোজো, হিটলার, সবকোই ফল-ইন হো যাও। হাম গোলি করেঙ্গা।
গলায় শালপাতা-জড়ানো লোকটা বীরদর্পে আকাশের দিকে আঙুল তুলে বুক চিতিয়ে দাঁড়াল।
টে–ন শন।
পা জোড়া করে, গটগটিয়ে লোকটা কুন্ডলী-পাকানো কুকুরটাকে লাথি কষাল। কুকুরটা ছুটে পালাতেই সে ঘুরে দাঁড়াল নাড়ুর দিকে। নাড়ু ছুটে পালিয়ে এল সন্তোষের পাশে। চিতা ধরে গেছে। আধপোড়া পাটকাঠিগুলো গুঁজে দিচ্ছে ডোম।
কোথায় গেছলি?
ওইদিকে, গঙ্গা দেখছিলুম।
একা যাসনি, মাতাল-গেঁজেলরা আছে।
একটানা সুর করে কিছু পড়ার শব্দ আসছে। অনেক লোক একসঙ্গে পড়ছে। উবু হয়ে সন্তোষ দেখছে ডোমের কাজ। মাংস পোড়ার গন্ধ।
আবার কোথায় যাচ্ছিস?
নাড়ু থেমে গেল। সেখান থেকেই বলল, এদিকে গান গাইছে।
না, যেতে হবে না, এখানে থাক।
নাড়ু সন্তোষের কাছে এসে দাঁড়াল। কাঠের ফাঁক দিয়ে আগুন উঠছে। কুঁকড়ে গুটিয়ে গেল চুলগুলো। মুখটা দেখা যাচ্ছে। চোখ-বোজানো। ঠোঁট দুটো অল্প ফাঁক-করা। হাতের আঙুল কালো হয়ে উঠেছে। গোড়ালি দুটো ভারী দেখাচ্ছে। একটা দমকা হাওয়া বয়ে গেল। মাথার কাছে এক ঝলক আগুন হুস করে ঠেলে উঠল।
নাড়ু চোখ ফেরাল। সন্তোষকে আড়চোখে দেখল। চোখ দুটো যেন ঘুমে ভারী। অমন চোখ করে পুজোর সময় বাবা যাত্রা দেখে! মা থাকে চিকের আড়ালে। কৌটো-ভরতি পান না থাকলে মা যাত্রা দেখতে পারে না।
একটা দমকা হাওয়া বয়ে গেল। আগুনের আঁচ লাগল নাড়ুর গায়ে।
কোথায় যাচ্ছিস?
ওইদিকে।
না।
হাতের মুঠো শক্ত করে নাড়ু তাকিয়ে রইল। উঠে দাঁড়াল সন্তোষ। চিতার আলোয় তার চোখ জ্বলছে।
তুই এখান থেকে বার বার পালাচ্ছিস কেন?
নাড়ুর কাঁধে নাড়া দিল সন্তোষ। পুট পুট শব্দ হচ্ছে। চিতার পাশে দাঁড়-করানো একটা কাঠ পড়ে গেল।
