চমকে উঠল সন্তোষ। বইওয়ালা চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। পাশ দিয়ে যাবার সময় আচমকা কথাটা বলেছে।
হ্যাঁ, চেষ্টার তো ত্রুটি হয়নি। বহুদিন ভুগল।
কী হয়েছিল?
টিউমার, দু-বার অপারেশন হয়েছে, ধকলটা সামলাতে পারল না।
সন্তোষ বারান্দার বাইরে তাকাল। পুরো বারান্দাটা জাল দিয়ে ঘেরা। কেন, রোগীরা যদি ঝাঁপিয়ে পড়ে! মরাটা কি ভগবানের হাতে? হ্যাঁ তো বললুম, না ভেবেই বললুম। অমন না ভেবে আমরা অনেক কথাই বলি! আমার এখন মুখের ভাব বিষণ্ণ করা উচিত। নয়তো লোকটা কিছু মনে করতে পারে। কিন্তু যদি না করি তাহলে কী হয়। আজ বৃষ্টি হবে। না হলেই ভালো। ক-টা বাজল? যত রাত হবে ততই অসুবিধে। কলকাতাটাকে তো দিনের বেলাতেই ধাঁধা মনে হয়।
বাড়িতে আর কে আছে?
কেউ না! শুধু একটা বছর চারেকের বাচ্চা!
মুখের চুকচুকানি শব্দটা শুনতে বেশ লাগে। লোকটা সত্যিই বেশ ভালো। একটা বই কিনে সাহায্য করা উচিত। বইওয়ালার হাত থেকে সন্তোষ একটা পত্রিকা তুলতে যাচ্ছিল। খপ করে বইওয়ালা কেড়ে নিল। সন্তোষের হাত দুটো ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, শান্ত হোন। ছেলের মুখ চেয়ে বুক বাঁধুন! অস্থির হলে কি চলে?
নাড়টা এখনও রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। ঠিকই বলেছে বইওয়ালা। ছোটো ছেলে, ওকে এখনই খাইয়ে দেওয়া উচিত। হাঙ্গামা চুকতে ক-টা বাজবে কে জানে!
কী যে করব ভেবে পাচ্ছি না! কলকাতায় চেনাশোনা তো কেউ নেই।
চারটে লোকও নেই?
না, কারখানায় ছুটি হয়ে গেছে। এখন আর সেখানেও কাউকে পাব না।
তাহলে তো সৎকার-সমিতিতে খবর দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
লোকটা ফিরিস্তি দিয়ে যাচ্ছে এরপর করণীয় কাজগুলোর। অনেক কাজ। কিন্তু এখন যদি এখান থেকে চলে যাই তাহলে কী হয়! ওরা অপেক্ষা করবে, আমার বাড়িতে খবর দেবে। না এলে গাদায় ফেলে দেবে।
সঙ্গে টাকা আছে তো?
আছে।
আর দেরি করবেন না।
হ্যাঁ যাচ্ছি।
হাঁটতে শুরু করল সন্তোষ। কালকেই বুঝেছিলাম ও আর বাঁচবে না। আজ পোস্টাপিস থেকে টাকা তুলে রেখেছি। সেভিংসের লোকটা খচ্চর। একেবারে কোনো সময়েই সই মেলে না। আজ মিলে গেছে। বোধ হয় ওর মেজাজ ভালো ছিল। বইওয়ালা জিজ্ঞেস করল সঙ্গে টাকা আছে কি না। যদি বলতুম নেই, তাহলে কি ও দিত! নিশ্চয় দিতে পারত না। ও কি আমায় আশ্বস্ত করতে চাইল? না কি পরে একসময় একথা বলেছি বলে নিজেকে বিবেকবান ঠাউরে আনন্দ পাবে।
বাবা।
তুই এখানে এলি কেন?
সিঁড়ির শেষ ধাপে সন্তোষ দাঁড়িয়ে। দারোয়ান তাকিয়ে আছে, ওর একটা হাত নাড়ুর। কাঁধে। সান্ত্বনা দিচ্ছিল। অথচ ওর সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়েছিল।
আমি ওপরে যাব।
কেন?
মাকে দেখতে চায় ছেলেটা। দেখে কী করবে। চোখ উলটে আছে হয়তো, কিংবা জিভটা ঝুলে আছে। ঠোঁট চাটা অভ্যেস। রেগে গিয়ে যখন কথা বলতে পারে না তখন ঠোঁট চাটে। মরার সময় হয়তো রেগে উঠেছিল। বুক পর্যন্ত ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছিল তো! কিন্তু রাগার সঙ্গে বুকের কী সম্পর্ক, সে তো মাথার।
বাবা, দেখতে যাব।
কী দেখবি? দেখার আর আছে কী?
নাড়ুর কাঁধে হাত রেখে সন্তোষ হাঁটতে শুরু করল। অন্ধকার হয়ে আসছে। যারা রোগী দেখতে এসেছিল ফিরে যাচ্ছে। নার্সেস কোয়ার্টারে কেউ গান গাইছে। আউটডোরের দরজায় কাতরাচ্ছে মাঝবয়সি এক সধবা। হাতের তিনটে আঙুল ঘেঁচে গেছে।
ট্রামরাস্তা পার হয়ে ওরা তিনটে হোটেল পেল।
নাড়ু, কিছু খেয়ে নিবি নাকি?
খিদে নেই!
পরে পাবে, খেয়ে নিলে হত।
না, খিদে নেই।
নাড়ু তুই এখানে থাক। আমি সৎকার-সমিতির অফিসে যাচ্ছি, এখুনি ফিরব। হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে সন্তোষ কথাগুলো বলল।
এক প্যাকেট সিগারেট কিনি।
মা তোমায় সিগারেট খেতে বারণ করেছিল।
থমকে পড়ল সন্তোষ। ছেলেটা মনে করে রেখেছে। ওর সামনেই একদিন কথা হয়েছিল বটে। মরার সঙ্গে স্মৃতির একটা যোগ আছে। পুরোনো মানেই তো মৃত। স্মৃতিও তাই। স্মৃতি জ্যান্ত মানুষকে মেরে ফেলে। কী দরকার পুরোনো কথা মনে রাখার! রাত্রে অপারেশন হয়েছিল। সারারাত গেটে বসেছিলুম। ভোর বেলায় দারোয়ানকে বলেছিলুম একটু খবর এনে দিতে। ও যেতে রাজি হয়নি। ঝগড়া হয়েছিল। আমাকে আটকেছিল, ভেতরে যেতে দেয়নি। গালাগালি দিয়েছিলুম। কিন্তু এখন ও আর আমায় আটকাবে না। এখন আর ওর ওপর রাগ নেই, কিন্তু সেদিন অসম্ভব রেগে হাঁটতে শুরু করি। রাস্তায় তখন জল দিচ্ছিল। দাঁড়ালুম, পাশে ছিল সিগারেটের দোকান। সাড়ে তিন বছর পর খেলুম পর পর তিনটে।
সিকিটা পালটে দাও ভাই।
প্যাকেট খুলতে খুলতে সন্তোষ পিছনে তাকাল। বুকের অসুখ এখনও সারেনি। বেশি জোরে টান দেওয়া ঠিক নয়। ওর ভয় ছিল সিগারেট খেলে আমি শিগগিরই মরে যাব। কিন্তু ও-ই আগে মরল। বেঁচে থাকতে খাইনি, আমার নিজের মরার ভয়ে না ওর কথা রাখতে!
বাবা!
তুই এখানে দাঁড়িয়ে থাক। আমার বেশি দেরি হবে না।
জোরে জোরে টান দিয়ে সন্তোষ সিগারেটটা ফেলে দিল। বাসটা এসে গেছে।
তুই থাক, কেমন।
আকাশটা মেঘলা। মাথা নীচু করে নাড়ু আস্তে আস্তে হাঁটল। মা বলত, নাড়ু বৃষ্টি হবে, ইশকুল যাসনি। বলত, তোর বাবার গেঞ্জিটা এখনও শুকোল না, এসে রাগ করবে। তোর বাবা পোস্তর বড়া খেতে ভালোবাসে, লক্ষ্মীটি চট করে কানাইয়ের দোকান থেকে ঘুরে আয়।
ইটের টুকরোটায় শট মারল নাড়ু, রাস্তার মাঝখানে গিয়ে পড়ল। ওটা যদি ট্রামলাইনের ওপর পড়ত তাহলে ট্রামটা গুঁড়িয়ে দিয়ে যেত। ট্রামের তার থেকে অমন বিদ্যুৎ জ্বলে ওঠে কেন! মা বলেছিল আকাশের বিদ্যুৎকে মেশিনে জমা করে রাখে। তাই থেকে খরচ হয়। বিদ্যুৎ চমকায় শুধু বর্ষাকালে, তাও মাঝে মাঝে। ওইটুকুতে সারা বছর এত আলো হয় কী করে? সেই ছেলেটা আমায় জিভ ভেঙিয়ে গেছে। ওর মা যদি জানতে পারে তাহলে কি বকবে?
