নাড়ুর ঠোঁট কাঁপতে শুরু করল। আস্তে আস্তে সরে এসে গেটে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। থলিটা বুকে চেপে কুঁজো হয়ে নাড়ু কাঁদল। কাঁদল অনেকক্ষণ ধরে। শুধু একটি বুড়ি যেতে যেতে ওকে দেখে একটুক্ষণ দাঁড়াল, কাছে আসার জন্য পা বাড়িয়েও কী ভেবে মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেল। নাড়ু জোরে কাঁদেনি। হাত দিয়ে চোখ ঢেকে রেখেছিল। পিঠটা অল্প অল্প কাঁপছিল। খুব কাছে কেউ এলে শুনতে পেত গুনগুন গানের মতো একটা সুর। ওর পিছন দিয়ে অনেক মানুষ চলে গেল। কেউ কেউ তাকিয়েছিল। শুধু বুড়িটা একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে মাথা নেড়ে চলে গেছল। অনেকক্ষণ পরে জামার হাতায় চোখ মুছে নাড়ু দোতলা বাস দেখতে লাগল।
অল্পবয়সি ডাক্তার দুঃখ জানালেন। বললেন, আমরা চেষ্টার ত্রুটি করিনি। হঠাৎ পরশু থেকে—আপনি তো দেখেই গেছলেন। কাল থেকে গ্লুকোজ স্যালাইন চলছিল। এরপর ডাক্তারবাবু বলার মতো কথা খুঁজে না পেয়ে চুপ করে গেলেন। সন্তোষের মুখের দিকে তাকিয়ে কী ভেবে আবার বললেন, সার্টিফিকেট আমি এখুনি দিয়ে দেবার ব্যবস্থা করছি।
সন্তোষ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল। পর্দা সরিয়ে একটি নার্স উঁকি দিয়ে গেল। ওষুধের গন্ধ আসছে। ছপ ছপ শব্দ হচ্ছে বারান্দায়। জমাদার দড়িবাঁধা সোয়াবটা ছুড়ে ছুড়ে নিশ্চয় বারান্দা সাফ করছে। ফরফর করে উড়ল টেবিলের কাগজ। ডাক্তারবাবু কাচের ড্যালাটা নিয়ে লোফালুফি করছেন।
বারান্দায় বেরিয়ে এল সন্তোষ। থুথু ফেলল কাঠগুঁড়োর বাক্সে। বারান্দার বাঁ-ধারে দুটো কেবিন। পর্দা ঝুলছে। খাটে বসে গল্প করছে একটি জোয়ান। সিঁদুরপরা একটি মেয়ে কমলালেবু ছাড়াচ্ছে। ডান দিকে অনেক দরজা। দরজায় পর্দা নেই। সারি সারি ওয়ার্ড। সেই বাচ্চা মেয়েটির পায়ে-বাঁধা ভারী লোহাটা এখনও ঝোলানো রয়েছে। অনেক দিন ও এখানে আছে। হাউহাউ করে একদিন কেঁদেছিল বাড়ি যাবার জন্য। ও ভালো হয়ে যাবে একদিন। একদিন বাড়ি ফিরে যাবে।
হাসপাতালের মাঠে ফুটবল খেলা হচ্ছে। একপক্ষ বুঝি গোল দিল। সন্তোষ মুখ ফিরিয়ে এক বার তাকাল। মাঠটাকে ঘিরে থোকা থোকা মানুষ, যেন কালো পিঁপড়ের সারি। দেখতে বেশ লাগে। সেই বইওয়ালাটা আসছে। ও রোজ একগাদা পত্রিকা সঙ্গে করে আনে। পা-ভাঙা মেয়েটিকে একখানা বই কিনে দিলে কেমন হয়। পকেটে হাত দিল সন্তোষ। খড়খড় করল চারখানা দশটাকার নোট।
বুকে হাত জড়ো করে মেয়েটি শুয়ে আছে। সন্তোষ পাশে এসে দাঁড়াল। তাকাল মেয়েটি। অবাক হয়ে গেছে।
কেমন আছ?
ভালো।
বাড়ি থেকে কেউ আসেনি?
এসেছিল, চলে গেছে।
সন্তোষ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। মুখ ফিরিয়ে নিল মেয়েটি।
একে বই কিনে দিয়ে কী লাভ! একে খুশি করে কী আনন্দ পাব! অন্যের আনন্দ দেখে আমার কী দরকার মিটবে! আমার তো কিছুর দরকার নেই। সন্তোষ পাশের বেড়ে তাকাল। বেডটা খালি। লাল কম্বলে ঢাকা। হয়তো আজকেই কেউ এসে যাবে। কোণে সেই হাসিখুশি ফর্সা মেয়েটির নাকে অক্সিজেনের নল। আজ সকালে নিশ্চয় অপারেশন হয়েছে। ওকে জড়িয়ে ধরে নিশ্চয় ওর মা। উনি কাঁদছেন। মেয়ের বিপদ কেটে গেছে তাই কাঁদছেন। বমি করছে মেয়েটি। আঁচল দিয়ে মা মুখ মুছিয়ে দিলেন। ওই ছেলেটি কালকেও বোকার মতো বসেছিল। মেয়েটিকে কাল বিরক্ত দেখেছিলুম। আজও বিরক্ত করতে এসেছে। কেন আসে?
সন্তোষ পায়ে পায়ে এসে দাঁড়াল। সকলে ওর দিকে তাকাল, মেয়েটি কথা বলছে। কথা বলা ওর এখন উচিত নয়। চোখটা ভিজে ভিজে, কাঁদছে, বোধ হয় কষ্ট হচ্ছে। নীচু হয়ে সন্তোষ ছেলেটিকে বলল, কথা বলতে দিচ্ছেন কেন, তাতে বমি আরও বাড়বে।
চুপ করে মেয়েটির মুখের দিকে ছেলেটি তাকিয়ে বসে রইল। ছেলেমানুষ, এখনও সংসারের আঁচ গায়ে লাগেনি। ও চিরকাল হয়তো এমনি করে বোকার মতো তাকিয়ে থাকবে। সন্তোষ পিছন দিকে তাকাল। পাশে তাকাল। সব কটা বেডের মানুষ তার দিকে তাকিয়ে। ওরা কেন তাকিয়ে রয়েছে তা জানি। ওরা ফিসফিস করে কী বলছে তাও জানি। ওরা কৌতূহলী হয়ে পড়েছে। আমি এখনও কেন কাঁদছি না; ওরা খুশি হবে কাঁদলে। কিন্তু কেন কাঁদব!
ঘরের আর এক কোণের সেই বেডটা লালপর্দায় ঢাকা। সন্তোষ পর্দার পাশে দাঁড়াল। সারা ঘরের মানুষ এখন আমার দেখছে। একটু ঝুঁকে উঁকি দিলেই পর্দার ভিতরটা দেখা যাবে। কিন্তু কী দেখব? ওই মানুষগুলো রোজ আমায় আসতে দেখেছে, দিনের পর দিন, তবু ওরা আমায় দেখছে। ওরা নতুন কিছু-একটা আমার মধ্যে দেখতে চায়। কিন্তু আমি কী দেখাব? সেই মানুষটা আছে কি? হাসপাতালে আসার আগের মানুষটা! ও আগে হাসত, রাগ করত, রাগ ভাঙাবার জন্য অপেক্ষা করত। তারপর দিনের পর দিন বিছানায় শুয়ে থেকে স্বভাব বদলে গেল, চেহারা বদলে গেল। তার মানেই ও নতুন হল কি? নতুন কথাটার মানে কী? ওকে আগে দিনরাত কাছে পেতুম, কিন্তু হাসপাতালে মাত্র দু-ঘণ্টার সম্পর্ক তৈরি হল। বাঁধা সময়ে রোজ এক ধরনের কথা বলা আর শোনা। ক্লান্ত হয়ে পড়তুম, হাঁপিয়ে উঠতুম, ভালো লাগত না আর আসতে। আজ সেই একঘেয়েমির হাত থেকে রেহাই পেলুম। তবে কেন কাঁদব? ওদের আশা পূরণ করতে কেন কষ্ট করব!
উঁকি দিলেই পর্দার ভিতরটা দেখা যায়। সন্তোষ না দেখে বারান্দায় বেরিয়ে এল। এবার হাঙ্গামা অনেক। আগে সার্টিফিকেটটা নিতে হবে, শ্মশানে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করতে হবে। কলকাতায় চেনাশোনা কেউ নেই। কারুর সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।
সবই ভগবানের হাত।
