মাথা নীচু করে হাঁটতে হাঁটতে নাড়ু হাসপাতালের মধ্যে ঢুকল। চুপচাপ। থমথমে। আউটডোরে গল্প করছে দুটি ছাত্র। সধবাটির হেঁচা আঙুলে ব্যাণ্ডেজ বাঁধছে কম্পাউণ্ডার। একটা বেড়াল ঢুকল। গোড়ালি ঠুকল একজন। বেড়ালটা বেরিয়ে গেল। হাফ প্যান্টপরা ওয়ার্ডবয় দেয়ালে ঠেস দিয়ে ঝিমোচ্ছে। এই বাড়িটা ছাড়িয়ে আর একটা রাস্তা। নাড়ু রাস্তায় নামল।
গন্ধ আসছে। ওষুধের গন্ধ। কুনিপিসির ছেলে হবার সময় এমন গন্ধের ওষুধ এসেছিল। মা দু-রাত্তির ওদের বাড়ি ছিল। কুনিপিসি মরে গেল, সবাই কাঁদলে মাও কাঁদল। কুনিপিসি বাবার বোন নয়, পাশের বাড়িতে থাকে। বাবা কাঁদল না।
এসো খোকন, এখানে বসো।
দারোয়ান নাড়কে ডাকল। গুটিগুটি ওর পাশে নাড়ু দাঁড়াল। ওর মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে চুপ করে বসে রইল দারোয়ান। ছড়াৎ করে লিফটের দরজা খুলল। খট খট করে চলে গেল এক ডাক্তার।
ওপরে যাবে, দেখতে?
চুপ করে রইল নাড়ু।
যাও।
দারোয়ান পিঠে হাত রেখে চাপ দিল। পায়ে পায়ে নাড়ু সিঁড়ির দিকে এগোল। জুতোর শব্দ হচ্ছে ঠিক ওই ডাক্তারের মতো। জুতো কিনতে যাবার সময় মা বলে দিয়েছিল ফিতেওয়ালা কালো রঙের জুতো কিনতে। বাবা মা-র জন্য একটা চটি কিনেছিল, কালো রঙের।
খোকা দাঁড়াও, উঠে এল দারোয়ান। লিফটে চড়বে?
নাড়ু ঘাড় কাত করল।
এই জগদীশ, খোকাকে দোতলায় নিয়ে যা।
নাড়ু লিফটের মধ্যে ঢুকল। বোতাম টিপতেই গোঁওও শব্দ উঠল। ঝাঁকুনি দিয়ে লিফট উঠতে শুরু করল। দারোয়ান হাসছে। ওর জুতো, হাঁটু, পেট, মাথা দেয়ালে ঢাকা পড়ে গেল। বুক শিরশির করছে। সেই চৌকো লোহাটা এখন নীচে নেমে আসছে। পেটের নীচে ব্যথা করছে। মা রোজ রাত্তিরে ঘুম থেকে তুলে নর্দমায় বসিয়ে দিত। মা ধরে দাঁড়িয়ে থাকত, নইলে ঘুমের ঘোরে পড়ে যেতুম।
লিফট থামতে নাড়ু বেরিয়ে এল। লিফট আবার নীচে নেমে গেল। চৌকো লোহাটা ওপরে উঠতে উঠতে থেমে গেল। লোহার দড়িটা কাঁপছে। যদি দড়িটা ছেড়ে। নাড়ুর বুক কাঁপল, বাজ পড়ার শব্দে এমন করে বুক কাঁপত। ছুটে মাকে জড়িয়ে ধরতুম।
বারান্দা ধরে নাড়ু হাঁটতে শুরু করল। কেবিনে একটা লোক খাটে শুয়ে বই পড়ছে। বারান্দাটা জাল দিয়ে ঘেরা। পাখিরা আসতে পারবে না। জুতোর শব্দ হচ্ছে। রোগীরা ঘাড় ফিরিয়ে দেখছে। একেবারে শেষের দরজায় নাড়ু দাঁড়াল। ঘরের মধ্যে চেয়ারে বসে নার্স কী লিখছিল। ওকে দেখে উঠে দাঁড়িয়েও আবার বসে পড়ল।
আঙুলে ভর দিয়ে নাড়ু ঘরে ঢুকল। সবাই দেখছে। মাথা নীচু করে লাল পর্দা-ঘেরা খাটের পাশে না দাঁড়াল। এবার কেউ দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু রোগীদের কথা শুনতে পাওয়া যাচ্ছে।
এইটিই তো আসত বাপের সঙ্গে।
হাঁ। একটি ছেলে।
তবু রক্ষে, মাত্র দুটি। আমার মতো হলে বাপের অবস্থাটা ভাবুন তো!
ভাবব আর কী, আবার বিয়ে করবে।
ইস, অতই সোজা!
সাদা চাদরে মুখ পর্যন্ত ঢাকা। নাড়ু সাবধানে চাদরটা গলা পর্যন্ত নামিয়ে দিল। চোখ বোজানো। মুখটা একটু ফাঁক করা। চোখের কোলে কালি। নাড়ু দাঁড়াল, চোখের পাতা যেন ভিজে ভিজে। কেঁদেছিল।
চাদর দিয়ে নাড়ু চোখ মুছিয়ে দিল। কপালটা চওড়া দেখাচ্ছে। চুলগুলো পাতলা হয়ে গেছে। জট পড়েছে। কমলাদি মাঝে মাঝে খোঁপা বেঁধে দিত, এখন যদি আঁচড়ে দিই তাহলে কি নার্স এসে আমায় বকবে?
খাটের লাগোয়া ছোট্ট আলমারিটা নাড়ু খুলল। চিরুনি, সিঁদুরকৌটো, আয়না, সাবান, মাজন, তেলের শিশি। সবগুলো এক বার হাতে করে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে কান পাতল, নার্সের জুতোর শব্দ শোনা যায় কি না।
উনিও বলেন, গানের মধ্যে রবীন্দ্র সংগীতই সবথেকে ভালো। এখানে একটা রেডিয়ো থাকলে বেশ হত।
যাট নম্বর বেডের মেয়েটি গান জানে, ডাকুন-না।
আপনি যান, কাল একটা বই চেয়েছিলুম, দেয়নি।
খস খস শব্দ হল। অনেক দিনের জট, চিরুনি আটকে যাচ্ছে। মাথাটা নড়ে উঠতেই ফ্যাকাশে মুখ করে নাড়ু তাকিয়ে রইল।
চুলের গোছা আঙুলে পাকিয়ে মা চুল আঁচড়াত। না হলে মাথায় খুব ব্যথা লাগে। চুলগুলো সব পিঠের তলায়।
মৃতের কাঁধ ধরে নাড়ু তুলতে গেল। মাথাটা কাত হয়ে গড়িয়ে পড়ল বালিশে। খট খট জুতোর শব্দ আসছে। তাড়াতাড়ি মাথাটা সিধে করে চাদর টেনে দিল। পিছিয়ে আসার সময় থলিতে পা লাগল।
দুটো পেয়ারা গড়িয়ে পড়ল। থলিটা তুলে নিল নাড়।
তুমি একা যে, বাবা কোথায়? এখানে আর থেকো না, বাইরে গিয়ে বোসো।
নার্স ওর কাঁধে হাত রেখে ঘরের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিল। নাড়ু মাথা নামিয়ে হেঁটে গেল বারান্দা ধরে। নীচে নেমে দেখল দারোয়ানের টুল খালি। আবার রাস্তায় এসে দাঁড়াল। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে তখন।
সন্তোষ আর সৎকার-সমিতির ছাইরঙা পোশাকপরা লোকটি গাড়ির মধ্যে স্ট্রেচারটা তুলে দিল। ডালা দুটো বন্ধ করতেই গাড়ির পিছনটা একটা টিনের বাক্স হয়ে গেল। ড্রাইভার আর সমিতির দুজন লোক বসল সামনের সারিতে, পিছনে সন্তোষ আর নাড়। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে সামনের রাস্তায় পড়তেই সন্তোষ বলল, দেরি হয়ে গেল। গাড়ি ছিল না, তাই বসেছিলুম।
রাস্তার দিকে মুখ ফেরাল নাড়। পাশ দিয়ে ট্রাম যাচ্ছে। সমান সমান যাচ্ছে। ঘণ্টা পড়ল। ট্রামের গতি মন্থর হল। নাড়ু হাসল।
বাবা, ট্রামগাড়ি মোটরের সঙ্গে পারে না?
ওকে যে থামতে থামতে যেতে হয়, তোক উঠবে নামবে—তবে তো!
সন্তোষ আড়চোখে তাকাল এক বার। জ্বলজ্বল করছে ছেলেটার চোখ। গোগ্রাসে বাইরের সব কিছু যেন গিলছে।
