টুপু তুমি কি ঘুমিয়ে পড়েছ? এখন রাত কত? লুলা বাগানে ডেকে উঠল, ওকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। লুলা আজ সকাল থেকে ডাকছে। শান্তা এখনও ফেরেনি। ও আজ ফিরবে না। টুপু, তোমার বাবাকে দেখে সত্যি দুঃখু পাই। হয়তো সুপ্রিয় একদিন আত্মহত্যা করবে তবু শান্তাকে পাবে না, তাকে আমিও পাইনি। সুপ্রিয় স্বেচ্ছায় মরতে চায় কীসের জ্বালায়? এটা কি ওর স্বভাব? সুব্রত জানে সে একদিন মরবেই, তাই ভয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে সেই দিনটার কথা ভেবে।
টুপু, শান্তা যদি আর না ফেরে, তাহলে আমি সেরে উঠব কি? যদি তাই হয় খুব আশ্চর্যের ব্যাপার হবে, তাই না? শান্তা যেন আর না ফেরে। তুমি আর আমি শুধু থাকব, থাকবে বাগানটা আকাশটা, আর মাঝে মাঝে বোলতা কিংবা ফড়িং।
সিঁড়ি দিয়ে কে যেন উঠছে টুপু। শান্তা কি চটি পরে বেরিয়েছিল? কিন্তু শান্তা হবে কেন, সে তো আজ রাতে ফিরবে না। তাহলে কি লুলা? রাত্রে ও সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। বারান্দায় এসে মাথা নীচু করে কী যেন শোঁকে, জানলায় পা রেখে ঘরের মধ্যে তাকায়, চলে যাবার আগে দরজা আঁচড়ায়। টুপু, আমার ঘরের দরজাটা বোধ হয় খোলা। এ ঘরে শেষ এসেছিল সুপ্রিয়। সে চলে গেল শান্তার কথা ভাবতে ভাবতে। বন্ধ করে গেছে কি দরজাটা? কিন্তু বন্ধ করবে কেন, ওর কি তখন মনে ছিল লুলার কথা, তার মা-র কথা?
টুপু শব্দটা সিঁড়ি থেকে বারান্দায় উঠে এল যে! ওখান থেকে ঘরের দরজায় আসতে কতক্ষণ লাগবে? না, তার আগে জানলা দিয়ে দেখবে। অন্ধকার ঘরে চোখ সইয়ে নিতে দেরি হবে ওর। কত দেরি হবে? লুলা আসছে। শীতে-ফাটা চামড়া চুলকোনোর মতো ওর নখের শব্দটা এগিয়ে আসছে। জানলায় শব্দ হল কেন? তোমার ঠাকুমার ঘোমটার লালপাড়ে চুলের তেল লেগে বাসি রক্তের রং ধরত, লুলার জিভে কী লালপাড় জড়িয়ে আছে? কেউ এসে বন্ধ করে দেবে না এখন দরজাটা। আমাকেই বন্ধ করতে হবে, আমায় উঠতে হবে, আমায় বাঁচতে হবে। ওই ঝকঝকে বাঁকানো দাঁত, ফাঁকে ফাঁকে পচা মাংসের গন্ধ, ঠোঁট আর মাড়ির ভাঁজে জমে উঠছে লালা, আর তাই চেটে নেবার শব্দ। আমায় উঠতে হবে, দরজা বন্ধ করতে হবে। কিন্তু আমার ক্ষমতা কই টুপু!
কিন্তু আমার রক্ত কেমন ছুটতে শুরু করেছে। আগুনের স্রোত যেন পুরোনো শিরার ময়লা–গুলোকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে ঠেলে নামছে। হালকা হয়ে যাচ্ছি। টুপু, আমি ভোরের অন্ধকারের মতো হালকা হয়ে যাচ্ছি। আমার হাত কাঁপছে, শরীর কাঁপছে। হঠাৎ এ কী হল আমার! তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছি কেন! টুপু, মনে হচ্ছে আমি বাঁচব, সুস্থ হয়ে বাঁচব। আমি মরতে চাই না। ইচ্ছে করছে এখন তোমার ঠাকুমাকে দেখতে, তার গায়ে হাত রেখে কথা বলতে, হাসাতে, রাগাতে। আমার দুই ছেলেকে কোলে নিয়ে এখন বাগানে বেড়াতে চাই টুপু। দরজার কাছে খসখস শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর একদিন শুনেছিলুম, সেদিন লুলা ভেবে ভুল করেছিলুম। আঃ, এখন ওই শব্দটা যদি শান্তার চটির হয়! আমি বেঁচে যাব টুপু, আমি বেঁচে যাব।
হঠাৎ খুলে গেল দরজাটা। জ্বলজ্বলে চোখ দিয়ে লুলা গুঁড়ি মেরে ঘরের মধ্যে ঢুকল। থমকে পিছিয়ে এল। চাপা স্বরে গরগর করে উঠল। সে এবার ঝাঁপিয়ে পড়বে। চেয়ারে বসা জমাট মূর্তিটা দূলে উঠেছে। লুলা আরও এগিয়ে এল। ওর পিঠের রোঁয়া খাড়া হয়ে উঠেছে। কাঁপতে কাঁপতে দুটো হাত সামনে এগোল। ওদের ব্যবধান কমে আসছে।
হঠাৎ বিকট স্বরে দু-বার ডেকে উঠল লুলা। কুড়লের প্রচন্ড এক ঘায়ে যেন জমাট মূর্তিটা ভেঙে পড়ল চেয়ারে। লুলা এগিয়ে এসে শুকল ঝুলে-পড়া নিস্পন্দ হাতটা। শুকতে শুকতে হাত বেয়ে উঠে এল তার মুখ। গলার কাছে থমকে গেল তার দাঁত আর টুটির উপর কেঁপে উঠল নাক। লালা গড়িয়ে পড়ল কষ বেয়ে। আর টুটির ওপর থেকে চোখ বুজে তাই চাটতে চাটতে সুখে গরগর করে উঠল লুলা।
তাপের শীর্ষে
নাড়ু, তোর মা মরে গেছে।
সন্তোষ একটু নুয়ে কথাটা বলল। নাড়ু তাকিয়ে ছিল বাসটার দিকে। এইমাত্র যে ছেলেটা উঠল, একটু আগেই সে নাড়কে জিভ দেখিয়েছিল। নাড়ু দোতলা বাসটার দিকে তাই তাকিয়ে ছিল।
হাতের থলিটায় কাপড় আছে, মা আনতে বলেছিল। পেয়ারা আছে, মা খেতে ভালোবাসে। থলিটা দু-হাতে বুকের কাছে আঁকড়ে নাড়ু তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। চোখ সরিয়ে নিল সন্তোষ। আকাশটা ঘোলাটে। আজকেও বৃষ্টি হবে। ফুটপাথটা ন্যাড়া। নীলরতন সরকার হাসপাতালের দেয়াল ঘেঁষে ঘাস উঠেছে।
ঘাস মাড়িয়ে সন্তোষ হাঁটছিল। পিছনে নাড়ু আসছে। সন্তোষ ঘুরে দাঁড়াল।
তুই আর আসিসনি, এখানেই থাক। আমি ডাক্তারবাবুর সঙ্গে দেখা করে আসি।
কেন?
ব্যবস্থা করতে হবে তো। সার্টিফিকেট না দিলে কিছুই তো করা যাবে না। নাড়ু দাঁড়িয়ে থাকল। বাবা চলে যাচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় ডানদিকের ঘরের কোণের বেডে মা আছে। সিঁড়ির পাশেই খাঁচার মতো লিফট নেমে এল। কখনো সে ওঠেনি। দরজা খোলার সময় ছড়াৎ শব্দ হল। মাথায় রুমালবাঁধা মেয়েলোকটা লিফট থেকে বেরোবার সময় তাকিয়ে গেল। ও কি কমলাদির মতো বিধবা? কমলাদি মাছ খায় না, কমলাদি মা-র কাছে এসে রোজ দুপুরে গল্প করত। একদিন কাঁদছিল মা-র কোলে মুখ গুঁজে। দুটো লোক লিফটে ঢুকল। চৌকো লোহাটা দেয়াল বেয়ে নামতে নামতে থামল। তারের দড়ি কাঁপছে। ওপর থেকে লিফটের দরজা খোলার শব্দ এল।
নাড়ু হাসপাতালের গেট পার হয়ে ফুটপাথে দাঁড়াল। বাস যাচ্ছে। দোতলা থেকে একটা লোক থুথু ফেলল। রাস্তার গর্তে এখনও বৃষ্টির জল জমে। গর্তের চারপাশে খোয়া-ছড়ানো। ট্যাক্সিটা গর্ত মাড়িয়ে গেল। খোয়া ছিটকে এসে গায়ে লাগতে পারত।
