সকালে বাগানে যখন খুঁজে পেল তোমার ঠাকুমাকে তখন সবাই খোঁজ করল মৃত্যুর কারণ। অনুমান করল নানাজনে নানারকম। পুলিশ তার কর্তব্য করে গেল। শুনলুম ওরা রিপোর্টে লিখেছে—আত্মহত্যা। কিন্তু আমি জানি, এটা হত্যা। রাতে শান্তা ইচ্ছে করে দরজা খুলে রেখেছিল। বারান্দা থেকে এ-বাড়ির বাইরে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়, তাই তোমার ঠাকুমা ফাঁক পেলেই বারান্দায় এসে দাঁড়াত। সে-রাতেও ঘরের দরজা খোলা পেয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। লুলার কথা ওর মনে ছিল না। ওকে দেখতে পেয়ে ছুটে এসেছিল লুলা। তোমার ঠাকুমার সুস্থবুদ্ধি বোধ হয় কয়েক মুহূর্তের জন্যই ফিরে এসেছিল, তাই সে বাঁচার চেষ্টা করে। কিন্তু বুঝি না আজও-ঘরে গিয়ে নিজেকে না বাঁচিয়ে কেন বাগানে লাফিয়ে পড়ল। তোমার ঠাকুমা ভুল করেছিল টুপু। মৃত্যু বড়ো ভয়ংকর, এক বার যে এর মুখোমুখি হয়েছে, বেঁচে থাকলেও সে কোনোদিন এই ভয়ংকরের ভয় থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারে না। তোমার ঠাকুমা মরে গিয়ে হয়তো বেঁচে গেছে। আমিও ভয়কে দেখেছি। সেকথা আমি বলতে পারিনি। টুপু, মানুষ যেন কথা বলার ক্ষমতা না হারায়। লুলাকে তোমার বাবা মেরে ফেলতে চেয়েছিল, আমি ঘাড়টুকু নেড়েও সম্মতি জানাতে পারিনি। টুপু, মানুষ যেন পঙ্গু না হয়। ভেবেছিলুম শান্তা এরপর বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে, কিন্তু গেল না। এর একমাত্র কারণ সুপ্রিয়। হ্যাঁ টুপু, তোমার বাবা শান্তাকে চেয়েছিল বাড়িতে রাখতে।
এই দাদু।
চেয়ারের পেছন থেকে টুপু ঝুঁকে পড়ল। দু-হাতে চিবুক ধরে দাদুর মুখটা ঘুরিয়ে আনল। জ্বলজ্বল করে উঠল দাদুর চোখ।
ঘুমোচ্ছিলে? আমি তো ঘুমোচ্ছিলুম, হ্যাঁ সত্যি সত্যি ঘুম! মা বলল, টুপু দুপুর বেলা ঘর থেকে বেরিয়ো না, বাগানে রোদুরে যেয়ো না, দাদুর ঘরে যেয়ো না। তখন জান আমি চুপটি করে জেগে, তখনও ঘুমোইনি। তারপর কী হল জান?
টুপু প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল দাদুর কোলে। দু-চোখ বন্ধ করল দাদু।
টুপু এমনি করে সারাজীবন তুমি থাকো। উঠো না, সরে যেয়ো না। সকাল থেকে এখনও কিছু খাইনি। সুব্রত শান্তাকে নিয়ে বেরিয়ে গেছে, শান্তা ভুলে গেছে আমার খাওয়ার কথা। আর তো কেউ আসে না, খোঁজ করে না। টুপু তোমার মুখটা আরও কাছে আনো। দুধের গন্ধে আমার ছেলেবেলাকে মনে পড়ে, আমার মাকে মনে পড়ে, প্রথম ছেলে-কোলে তোমার ঠাকুমাকে মনে পড়ে। ছোটোবেলায় তোমার বাবাও এমনি করে আমার কোলে এসে পড়ত। সে হাসত, এখন সুপ্রিয় হাসে না। তাকে চুমু খেলেই মুখে দুধের গন্ধ লেগে থাকত। তখন মদ খেতুম, তবু মনে হত মুখ থেকে দুধের গন্ধটা উঠছে না। বিশ্রী লাগত, তাই আর কোনোদিন ছেলেদের কাছে আসতে দিইনি। কতদিন পরে পাচ্ছি সেই গন্ধ। সুপ্রিয়-সুব্রতকে সেই ছোট্টটি করে দেখতে পাচ্ছি। ওরা ছোটো, ওরা অপরিণত, বোঝে না কোন সর্বনাশ আঁকড়ে ধরছে।
এমনি করে বসে আছ কেন, বারান্দায় নিয়ে যাব?
দাদুর কোল থেকে উঠে পড়ল টুপু। দাদুর চোখের পাতা ঘন ঘন পড়ে। চেয়ারটাকে যখন ঘরের মাঝ পর্যন্ত টেনে আনল তখন ঘরে ঢুকল টুপুর মা। তাকে দেখামাত্র চেয়ার ছেড়ে জড়সড় হয়ে গেল টুপু। ওর পিছনে বড়োবউও বেরিয়ে যাচ্ছিল, কী ভেবে ফিরে এল।
মা-র নেকলেস যেটা ছোটোবউকে দিয়েছিলেন, আজ দেখলুম শান্তার গলায়। ঠাকুরপোর সঙ্গে কোথায় যেন বেরোল। যখন আমি চেয়েছিলুম দিলেন না। একটা পাজি মেয়েমানুষের গলায় মা-র গয়না দেখলে কেড়ে নেওয়া উচিত নয়?
দশাসই বড়োবউয়ের নাকের ফুটো বড়ো হয়ে উঠেছে। দাঁতে দাঁত চেপে সে আবার বলল, আপনার ছেলে আমায় শাসিয়েছে জানেন, সে আমায় চাবকাবে বলেছে যদি শান্তার গায়ে হাত দিই। জানি ছেনালটার জন্য ওর খুব দরদ, কিন্তু সতীসাধ্বীর গয়না আমি ওর গায়ে উঠতে দোব না, এই বলে রাখলুম। আপনি তো ভালো করেই জানেন, ও-গয়নায় আমার দাবি সকলের আগে। ঠিক কি না বলুন?
চোখের জল মুছল বড়োবউ। আঁচলে নাক ঝেড়ে এধার-ওধার তাকাল, তারপর চুপিচুপি বলল, ঠাকুরপো ছোটোবউয়ের সব গয়না ওকে দিয়ে দেবে, দেখবেন এই আমি বলে রাখলুম। মা-র সেকেলে ভারী ভারী গয়না, তার দাম কত আজকের দিনে! ওগুলো যদি আমায় দিতেন তাহলে নষ্ট হত না। ঠাকুরপো যদি ওঁর মতো হিসেবি হত তাহলে ছোটোবউয়ের এই সব্বোনাশ ঘটত না।
সদ্য ডিমপাড়া মুরগির মতো বড়োবউ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
টুপু বিকেল হয়ে গেল। বাগানে এখন ঠাণ্ডা ছায়া পড়েছে। তুমি কি সেই বোলতাটাকে এখনও খুঁজছ। তোমার খেলার সাথিদের নিয়ে এসো আমার কাছে। আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমার ঘুম পাচ্ছে টুপু। কখন আসবে, কখন আমায় বারান্দায় নিয়ে যাবে। বেলা পড়ে আসছে, অন্ধকার নেমে আসছে। আর যে কিছু দেখতে পাব না।
বারান্দায় সুপ্রিয় যখন পায়চারি শুরু করেছিল তখন সন্ধ্যা হয় হয়। যখন আকাশে অর্ধেক তারা দেখা গেল, সে দাদুর ঘরে ঢুকল। আলো জ্বালল না, একেবারে চেয়ারের পাশে চলে গেল সে।
আমি ওকে তাড়াব। শুনছ, আমি ওকে তাড়াব। আর সহ্য করব না। আমার বউ-মেয়ে আছে, আমার বয়স হয়েছে। যতটা ভীতু ভাবে ততটা আমি নই একথা আজ বুঝিয়ে দোব। কী বল, পারব না? তাই করা উচিত নয় কি?
সুপ্রিয় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। শান্তার ঘরের সামনে ইতস্তত করে দাঁড়িয়ে পড়ল। দরজাটা বন্ধ, পর্দা ঝুলছে দরজার সামনে। সুপ্রিয় হাত বাড়িয়ে পর্দাটা ছোঁয়। হঠাৎ দাঁত দিয়ে পর্দাটাকে ছিড়তে শুরু করে।
