রোজ সকালে শান্তা আমায় বারান্দার রোদুরে রেখে যেত। মাঝে মাঝে তোমার ঠাকুমা এসে দাঁড়াত। তাকিয়ে থাকত সে আকাশের দিকে, বাগানের দিকে। বিড়বিড় করে কী যেন বলত আর এধার-ওধার কাকে খুঁজত। একদিন শুনেছিলাম ওর কথা, লুলার খোঁজ করছে। কিন্তু ও একদম ভুলে গেছে যে দিনের বেলা লুলাকে অন্ধকার ঘরে বেঁধে রাখা হয়। টুপু, এই সময়ে বিলেত থেকে ফিরে এল তোমার কাকা সুব্রত। তোমার বাবার মতো অত হিসেবি মানুষ ও নয়। ওর ছোটোবেলা কেটেছে কার্শিয়াঙে মিশনারি বোর্ডিং-এ, কিন্তু কলকাতার অ্যাংলো পাড়ায় বেশিদিন ওর যৌবন কাটাতে দিতে ভরসা পেলুম না। অনেক সুন্দরী বাছাই করে তোমার কাকিমার সঙ্গে ওর বিয়ে দিলুম। বিয়ের এক মাস পরেই ওকে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য বিলেত পাঠিয়ে দিই।
সুব্রত ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে শান্তাকে বদলে যেতে দেখলুম। ছোটোবউমা কেঁদে পড়ল ওকে বাড়ি থেকে তাড়াবার নালিশ জানিয়ে। কিন্তু তাড়াতে পারিনি। ভালো করে কথা বলতে পারি না, চলাফেরা করতে পারি না, শরীরটা আমার মরে আসছিল। অথচ তলপেট থেকে লকলকে শিখা উঠে আসত অজস্র ছুঁচলো মাথা নিয়ে, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ঝাঁঝরা করে দিত। তাতে মনে হত আমি বেঁচে আছি আগের মতো। আর আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে শান্তা। ছোটোবউমা তারপরেও নালিশ করেছিল, হিংসে করেছিলুম নিজের ছেলেকে। শান্তাকে তাড়াবার কথা ভাবিনি, সুব্রতকে সরিয়ে দেবার জন্য ছোটোবউমাকে পরামর্শ দিলুম দিল্লিতে তার বাবাকে চিঠি দিতে। দেশে অনেক পাস করা বেকার ইঞ্জিনিয়ার আছে, কিন্তু কী জাদুমন্ত্রে জানি না সুব্রতর শ্বশুর বিলেতের ফেল-করা ইঞ্জিনিয়ার জামাইয়ের জন্য তেরোশো টাকার চাকরি ঠিক করে দিল। সুব্রত পাঞ্জাব চলে গেল বউকে নিয়ে।
খুট করে খুলে গেল বাথরুমের দরজা। সঙ্গে সঙ্গে নতুন ধরানো সিগারেটটাকে থেঁতলে সুব্রত জানলা থেকে ঘুরে দাঁড়াল। ওকে দেখেই শান্তা এক-পা পিছিয়ে মুখে অস্ফুট শব্দ করল। সুব্রত হাসল। ফর্সা চামড়া, লাল ঠোঁট, সাদা সারি দাঁত, ছিপছিপে ছ-ফুট শরীর, হাসলে ওকে সুন্দর দেখায়। এগিয়ে এসে দু-হাত রাখল শান্তার কাঁধে। শান্তা তখনও অবাক, কথা বলতে পারছে না।
কী, খুব অশ্চর্য তো?
শান্তাকে ঝাঁকুনি দিল সুব্রত। শান্তা কাঁধ থেকে হাত ঠেলে নামাবার চেষ্টা করায় সুব্রত আরও জোরে আঁকড়ে ধরল।
কখন এলে।
এইমাত্র, এখনও কারও সঙ্গে দেখা করিনি।
একা এলে?
হ্যাঁ, অনুকে সঙ্গে আনলুম না। অবশ্য তুমি এখানে যখন, বুঝতেই পারছ একা ছেড়ে দিতে চায়নি।
সুব্রত মুখ এগিয়ে আনল। শান্তা মাথা সরিয়ে নিল।
শান্তা, চলো আমার সঙ্গে।
হঠাৎ বলল সুব্রত গলার স্বরটা সর্দি ধরার মতো ঘড়ঘড়ে করে। কথা না বলে শান্তা তাকিয়ে রইল সুব্রতর চোখের দিকে। চোখের মণিটা ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায় আর তাই বেঁধে রাখতে লাল শিরাগুলো হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে। আবার বলল সুব্রত, চলো শান্তা আমার কাছে। বিশ্রী, বিশ্রী লাগছে অনুকে। একতাল কাদা রোজ যেন আমায় নোংরা করে দেয়। ওকে আমি ডিভোর্স করব, যাবে?
হাসল শান্তা। চোখ বন্ধ করে কী যেন সে ভাবতে শুরু করল। অধৈর্য হয়ে সুব্রত ওর হাত মুচড়ে ধরল।
লাগছে সুব্রত।
না, লাগছে না।
সুব্রত, তুমি এখন টায়ার্ড।
না, টায়ার্ড নই।
তুমি ক-দিন থাকবে?
ক-দিন থাকব সেটা কোনো কথা নয়। শুধু শুধুই হাজার মাইল পথ ভেঙে তোমার এই কথা শুনতে আসিনি। তা ছাড়া তোমার কাছে এলে আমি কেন, আটলান্টিক সাঁতরে-আসা মানুষও নিজেকে তাজা মনে করবে।
দপ দপ করতে থাকে সুব্রতর কপালের দু-পাশ। চোখের কোল ফুলে উঠেছে, গালের পেশি শক্ত। দূরে দাদুর দিকে তাকিয়ে শান্তা বলল, আমার এখনও অনেক কাজ বাকি আছে।
ও-বুড়োর জন্য আবার কাজ কী?
বাঃ, খাওয়াতে হবে না।
খুব দরদ দেখছি যে। খেতে একটু দেরি হলে মরে যাবে না, বুড়োর জান ভীষণ কড়া।
উনি তোমার বাবা।
সুব্রত গোটা শরীরের এমন ভঙ্গি করল যেন বলতে চায়, সে আবার কী! শান্তা মুখ টিপে হাসল। দাদুর কাছে যাবার জন্য সে এগিয়েছে, হ্যাঁচকা টানে তাকে থামিয়ে দিয়ে সুব্রত দাদুর সামনে এসে দাঁড়াল।
নড়তে পার না তাই, মেরেই ফেলতে। তাই না?
সুব্রত দাদুর থুতনির নীচে দুটো আঙুল দিয়ে মুখটা তুলে ধরল।
দাদু চোখ বন্ধ করল। শান্তা হেসে উঠল। সুব্রত ওর দিকে তাকিয়ে রইল। কুটি করে শান্তা বলল, অসভ্যের মতো দেখছ কী, দরজাটা খোলা রয়েছে না?
টুপু, টুপু, আজ সকাল থেকে লুলা ডাকছে। আজ তুমি বাগানে যেয়ো না। হয়তো লুলাকে বেঁধে রাখা হয়নি। হয়তো ওর ঘরের দরজাটা ভালো করে বন্ধ করা হয়নি। চন্দ্রমল্লিকার গাছগুলো তো ওই দিকেই। হলুদ পাপড়িগুলো যদি তোমায় লোভ দেখায় লুলার এগিয়ে আসা নখের শব্দ যেন না শুনতে হয়। শুনতে পাইনি বারান্দা থেকে ঠাকুমার পড়ে যাওয়ার শব্দ। আমার বুকের ওপর শান্তা তখন হাঁপাচ্ছে। ওর মুখ দিয়ে কেমন একটা শব্দ উঠছিল, ভীষণ ভালো লাগছিল শুনতে। পাথর হয়ে বসেছিলুম, কথা বলিনি। আমার ভালো হাতটা দিয়ে ওকে চুঁইনি পর্যন্ত। ভিজে খড়ের মতো জ্বলছিল শরীরটা, জ্বালা করছিল চোখ। আমি দেখতে পাচ্ছিলুম না বারান্দায় কী ঘটছে। শান্তা তখন চুপিচুপি আমায় বলল, ভালোবাসি। আমার অর্ধেক স্থবির শরীরটাকে ও ভালোবাসে! হাত বাড়ালুম ওকে ধরবার জন্য। শান্তা আমার নাগালের বাইরে সরে গেল। আধমরা ইঁদুরের মতো বার বার বেঁচে উঠতে চাইলাম কিন্তু শান্তা বেড়ালের থাবার থেকেও নিরাসক্ত, নিষ্ঠুর। আমার তেষ্টা পেল, ঢোঁক গিলতে পারলুম না, সে-জোরটুকুও আমার ছিল না। শুধু নড়ে উঠল গলার নলিটা, আর শান্তা আস্তে আস্তে মুখটা এগিয়ে এনে তার ঠোঁট রাখল আমার গলায়। ও যদি তখন দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ফেলত টুটিটা, বেঁচে যেতুম। তিল তিল করে এই পঙ্গু হয়ে বেঁচে থাকার থেকে, বেঁচে যেতুম। কিন্তু শান্তা তা করল না। শুধু বলল, ভালোবাসি। সেই সময়েই লুলা চিৎকার করে উঠল, ঠিক আজকের মতো। মনে পড়ল তোমার ঠাকুমা দাঁড়িয়েছিল বারান্দায়। জানলার দিকে তাকালুম। উঁচু জানলা, লুলা দাঁড়িয়ে উঠেছে গরাদের ফাঁকে থাবা রেখে। জিভ বার করে ও হাঁফাচ্ছে, মনে হল ঠাকুমার শাড়ির লালপাড় থরথর করে কাঁপছে। লুলা ঠোঁট চাটল। নোনতা গন্ধ যেন পেলুম। জানি না কেন পেলুম। কনকনে শীতের দিনে ঠাণ্ডাজলে কাউকে চান করতে দেখলে শীত লাগে, জানি না কেন লাগে। দু-হাতে আমার মুখটাকে ধরে শান্তা আবার বলল, ভালোবাসি। শিউরে উঠলুম ওর চোখ দেখে। শান্তা হাসছিল, মনে হল লুলাও বোধ হয় হাসছে। দেখবার জন্য ঘাড় ফেরাতে গেলুম, পারলুম না। শান্তার টুটি চেপে ধরার জন্য হাত তোলার চেষ্টা করলুম, হাত উঠল না। আমার শরীরের সুস্থ অংশটুকুকেও পঙ্গুতা গ্রাস করল। চিৎকার করে উঠতে চাইলুম, গলা দিয়ে স্বর বেরোল না। আমার শরীর মরে গেল টুপু।
