এরপর থেকে রোজ রাতে অপেক্ষা করতুম শান্তার জন্য। কিন্তু ওকে আর বারান্দায় দাঁড়াতে দেখতুম না। দিনের বেলায় কাছে আসত, কথা বলত, হাসত, আমার সামনে দিয়ে হেঁটে যেত তখন তাকিয়ে থাকতুম ওর শরীরের দিকে। ও বুঝত তাই বার বার আসত আমার কাছে। টুপু, আমি বিশ্বাস করি না পৃথিবীতে এমন কোনো পুরুষ তখন ছিল যে না চাইত শান্তার শরীরটাকে ছুঁতে। সাদাঘোড়ার ঊরুতে জড়ানো কালো শিরার মতো শান্তা আমাকে চাবুক মেরে খেপিয়ে তুলেছিল। যন্ত্রণায় ছটফট করেছি। রাত্রে ওর ঘরের বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে ভয়ে ফিরে এসেছি। ভয় তোমার ঠাকুমাকে নয়, লুলাকে। তছনছ করতে ইচ্ছে করত শান্তাকে। কিন্তু পারতুম না লুলার জন্য।
অ্যাই বুড়ো, এখন কেমন লাগে?
শুকনো তোয়ালে দিয়ে দাদুর গলা ঘষতে ঘষতে শান্তা নাকে টোকা দিল।
কেমন লাগে, অ্যাঁ?
আবার টোকা দিল যেন সে শাড়ি থেকে ছারপোকা ফেলে দিচ্ছে। কৌতূহলী চোখে শান্তা একটুক্ষণ তাকায়, সত্যি সত্যি নাকটা পড়েছে কি না দেখার জন্য। পড়ল না, তাই বিরক্ত হয়ে সে দাদুর পা তুলে ধরে ট্রাউজার্স পরানোর জন্য।
টুপু, সেদিন রাতে যখন বারান্দায় চোখ পেতে অপেক্ষা করছিলুম তখন সারা বাড়ি নিঝুম, আকাশটায় ইটের রং আর তোমার ঠাকুমার ঘরে আলো জ্বলছিল। অপেক্ষা করতে করতে যখন ধৈর্যের সীমায় পৌঁছেছি তখন আলো নিভল। মনে হল, হঠাৎই মনে হল শান্তা আজ বারান্দায় দাঁড়াবে। চুপিচুপি এগিয়ে গেলুম। আজও যদি পালিয়ে যায় তাহলে আমিও ঘরে ঢুকব।
দরজায় টোকা দিলুম। সঙ্গে সঙ্গে ও দরজা খুলল। যেন শব্দটার প্রতীক্ষা করছিল। বলল, ভীষণ ক্লান্ত। কিন্তু আমি তাজা ছিলুম। ওর হাত ধরলুম। বোধ হয় বুঝতে পেরেছিল কোনো আপত্তিই আমি শুনব না, হাত ছাড়িয়ে বলল, আসছি। বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলুম। নীচের বাগান থেকে গন্ধ আসছিল হাসনুহানার। গাছটা ঠিক আমার নীচেই, ঝুঁকে দেখতে চেষ্টা করলুম। ঘুটঘুটে অন্ধকার, একহাত দূরের জিনিস দেখা যায় না। টুপু, তুমি জান না, সে কী ভাষণ এক-একটা মুহূর্ত। ঠিক ঘুম আসার আগে, বন্ধ চোখের সামনে যেমন জমাট অন্ধকার গোল গোল হয়ে ফেটে পড়ে আর এক-একটা কালো স্তর আলতো হয়ে নেমে আসে চেতনায়, তার থেকেও ভয়ংকর আর সুখের ছিল অপেক্ষার সেই সময়টা।
ঝুঁকে দেখতে চেষ্টা করলুম ফুলগুলো কিংবা একটা পাতাও যদি দেখা যায়। দেখলুম মোমবাতির দুটো পোড়া সলতে যেন বাতাস পেয়ে জ্বলে জ্বলে উঠছে। বুঝলুম লুলা আমায় দিকে তাকিয়ে আছে। শুনেছ তো টুপু, লুলা একবার একটা চোরের টুটি ছিঁড়ে দিয়েছিল। ভয় করল আমার। ভুল হবে, মেরুদাঁড়া বেয়ে সাপের ছোবলের থেকেও দ্রুত একটা ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল। প্রথমেই মনে পড়ল—মৃত্যু। কী মৃত্যু, কেমন মৃত্যু তাও জানি না। মৃত্যু কথাটাই তো একটা গোটা কথা। তার ধরনধারণ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ কী। এই আমার অস্তিত্ব রয়েছে, মৃত্যু এল, তারপর আর আমি নেই। এই না-থাকার চিন্তাই তো টুপু পৃথিবীর সবথেকে বড় ভয়। এই ভয় যখন আমি পেলুম তখনই খস খস শব্দ উঠল পিছনে। লুলা সিমেন্টের ওপর হাঁটলে অমন শব্দ হয়। নীচে থেকে উঠে আসতে লুলার পাঁচ সেকেণ্ডও লাগবে না আর আমার ঘরে ছুটে যেতে ওইটুকু সময় দরকার। ছুটতে গিয়ে পড়ে গেলুম। সেই পড়াতেই শরীরের ডান দিকটায় পক্ষাঘাত ধরল। পরে জেনেছিলুম ওটা ছিল শান্তার চটির শব্দ। সে আমার কাছেই আসছিল।
দাদুর থুতনি তুলে ধরল শান্তা। ঝুনো নারকেলের মতো মাথাটা, অল্প কয়েকগাছি চুল। চিরুনি বোলাবার সময় খস খস শব্দ উঠল। বাথরুমের দরজার কাছে চেয়ারটা টেনে শান্তা বলল, এইবার বসে বসে ঝিমোও গে যাও।
চেয়ারে-বসা দাদুকে জোরে ঠেলে দিল শান্তা। সিধে ঘরের মাঝখানে এসে হঠাৎ পুরো একটা পাক খেয়ে দেয়ালের দিকে এগিয়ে গেল চেয়ারটা। ঘরের আর এক কোনায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল সুব্রত—দাদুর ছোটোছেলে। মুখ ঘুরিয়ে দাদুকে দেখে সিগারেটটা ফেলে গোড়ালি দিয়ে হেঁতলাল, তারপর তাকাল বাথরুমের বন্ধ দরজাটার দিকে। কী ভেবে এগিয়ে গেল, ইতস্তত করল, তারপর দরজায় টোকা দিল। ভিতর থেকে সাড়া এল না। সুব্রত দরজায় কান পাতল। এতক্ষণে এক বারও সে তাকায়নি দাদুর দিকে। সে যে ঘরে আছে তাও বোধ হয় মনে নেই।
টুপু, আমার চেয়ারের চাকাটা খুব আলগা। শান্তা যখন ঠেলে দিল, সিধে জানলার শার্সিতে ধাক্কা লাগার বদলে হঠাৎ ঘুরে গেল, ঠিক যেমন করে আমার জীবনটাও ঘুরে গেল। বেপরোয়া উদ্ধৃঙ্খল ছিলুম, হঠাৎ পক্ষাঘাতে ডানদিকটা যখন পড়ে গেল তখন এমনি করেই হলদে দেয়ালটার দিকে এগিয়ে আসার মতো ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলুম। কিন্তু এক দিনেই এগোলুম না; তখনও জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলতুম, অর্ধেকটা শরীর নাড়াতে পারতুম, তখনও সবাই ভয় করত, মেনে চলত।
দেখাশুনা করার জন্য তোমার বাবা সুপ্রিয়লোক রাখতে চেয়েছিল, রাখতে দিইনি। শান্তাকেই আমার সেবার ভার দিয়েছিলুম। এর জন্য অবশ্য ওকে বেশি টাকা দিতে হত। তোমার ঠাকুমা বরাবরই শান্ত প্রকৃতির, তখন আরও শান্ত হয়ে গেছিল, তার কাছে বেশিক্ষণ থাকার দরকার হত না শান্তার। আমরা কথা বলতুম। সাধারণ কথা, কিন্তু নিষ্ফল রাগে জ্বলে মরতুম। একদিন ওকে ধরার চেষ্টা করতে গিয়ে চেয়ার থেকে মুখ থুবড়ে পড়লাম। ব্যথায় কাতরে উঠব কিন্তু থেমে গেলুম শান্তার দিকে তাকিয়ে। মেঝের ওপর পড়ে ছিল আমার মুখ, নীচু থেকে শান্তাকে অদ্ভুত দেখাল। মনে হল শান্তার কাঁধ নেই, মুখটা নেমে এসেছে ওর পেটের মাঝখানে। আমি শিউরে উঠলুম, অথচ আনন্দ পেলুম। শান্তা তাড়াতাড়ি আমায় চেয়ারে বসিয়ে দিল। ধন্যবাদ দিলুম, ও কথা না বলে বেরিয়ে গেল।
