টুপু, এখানে কী?
দাদুর চেয়ারের পিছনে সরে এল টুপু। তালুর উলটোপিঠ কামড়ায় আর তাকিয়ে থাকে সে শান্তার চোখে।
এখন যাও, দাদু চান করবে।
টুপু চেয়ারের পিছন থেকে সরে দাঁড়াল। এইবার শান্তা চাকা লাগানো চেয়ারটাকে ঠেলে নিয়ে যাবে বাথরুমে।
আমি দেখব।
না দেখতে নেই।
শান্তা চলতে শুরু করল সামনে চেয়ার রেখে। কাচের মতো মসৃণ মেঝে, দরজায় চৌকাঠ নেই। তবু দুলে উঠল দাদুর শরীর। শান্তার গা ঘেঁষে চলতে চলতে টুপু দাদুর ঝুলন্ত হাতটাকে কোলের ওপর তুলে দিয়ে বলল, কেন দেখতে নেই?
ছোটোদের দেখতে নেই।
দাদু বুঝি ন্যাংটো হবে?
হেসে উঠল শান্তা। ঘাড় নামিয়ে দাদুর কানের কাছে মুখ আনল সে।
হ্যাঁগো বুড়ো, শুনলে কথাটা?
শান্তাকে হাসতে দেখে টুপু যেন বোঝে কথাটা খুব মজার বলেছে সে। বাথরুমের দরজাটা যখন শান্তা খুলছে তখন টুপু আবার বলল :
আমি দাদুকে ন্যাংটো দেখব।
না, দাদু রাগ করবে।
রাগ করবে, কেন?
হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল শান্তা। টুপুর মুখে জিজ্ঞাসা আর অবাকের চিহ্নগুলো ভয়ে সমান হয়ে গেল। নিজ থেকেই সে পায়ে পায়ে বারান্দায় বেরিয়ে এল। দরজা বন্ধ করে শান্তা তাকাল। দাদুও এতক্ষণ তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। তারপর চোখ নামিয়ে নিল, পাহাড়ি পথে সমতলের মানুষ যেমন সবাধানে থেমে থেমে নামে। দাঁতে দাঁত ঘষে শান্তা প্রায় ছুটে এসে চড় মারল দাদুর গালে।
পাজি বুড়ো কোথাকার, অমন প্যাটপ্যাট করে এখনও কী দেখিস? দেখে কী করবি, মারবি? হাত তুলতে পারিস?
দাদুর হাতটা তুলে আবার ছেড়ে দেয় শান্তা। হাতটা চেয়ারের হাতলে খট করে পড়ল। দেখলি? যা খুশি তাই করতে পারি এখন, যা খুশি।
দাদুর চোখের দিকে তাকিয়ে শান্তা চুপ করে গেল। ধক ধক করে জ্বলছে। আস্তে আস্তে সরে এল চেয়ারের পিছনে।
টুপু, টুপু, দরজা ভেঙে তুমি আমার চোখের সামনে দাঁড়াও। তোমায় আমি সব কথা বলব। কবছর আগেও শুধু আমার জুতোর শব্দে এই বাড়িটা ভয় পেত। আজ দেখে যাও আমি মার খাচ্ছি। বাড়ির সবাই-তোমার বাবা-মা-কাকা-কাকি-এমনকী মালীটা পর্যন্ত জানে শান্তা আমায় অপমান করে, তবু কেউ ওকে বারণ করে না। আমি যখন চলাফেরা করতে পারতুম তখন ওদের ভয় পাওয়া দেখে কী খুশিই-না হয়েছি। আমি কি জানতুম এমন একটা দুর্ঘটনা ওত পেতে বসে থাকবে? অসহ্য। অসহ্য, টুপু, আবার আগের জীবন চাই। তুমি দরজা ভেঙে আমার সামনে দাঁড়াও। তোমায় আমি বলব, অনেক কথা বলব। এ-বাড়িতে একটাই সুন্দর মানুষ ছিল, তোমার ঠাকুমা।
জানো টুপু, শান্তা যখন মারে আমার লাগে না। সত্যি বলছি একটুও লাগে না। ব্যথা পাওয়া ভুলে গেছি। অনেক দিন কাঁদি না, অনেক দিন। তাই কি হয়! না টুপু, মিথ্যা বলছি। তোমার কাছে আমি কিছু লুকোব না, রাত্রে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, তুমি যখন ফুলের মতো ছোট্টটি হয়ে মায়ের বুকঘেঁষে আসসা, যখন লুলা তার নখের আওয়াজ অন্ধকারে দগদগে ঘায়ের মতো ফুটিয়ে আমায় জানালা দিয়ে তাকায়, তখন কাঁদি। জল পড়ে আমার গাল বেয়ে বিছানায়, তারপর ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুমোলে সব কিছু ভুলে যাই। ঘুম তাই আমার ভালো লাগে। তারপর সকালে যখন উঠি তখন আবার এই যন্ত্রণার শুরু। এমনি করে দিনের পর দিন বাঁচা-মরার মধ্য দিয়ে চলেছি। তবু শেষ বারের মতো এক বার চলাফেরা করতে চাই। আমার হাতটা দিয়ে শান্তার টুটি চেপে ধরতে চাই। আমি ঘুম চাই না।
অ্যাই বুড়ো, চোখ বুজে কী ভাবছিস?
চোখ খুলে দাদু সামনের আয়নার দিকে তাকিয়ে রইল। ওর জামাটা খুলে নিল শান্তা। ট্রাউজার্সের বোতাম খুলতে খুলতে নাক সিঁটকে বলে উঠল :
আজও, আজও আবার! কেনা বাঁদি পেয়েছে যেন। থাকবি ননাংরা হয়ে, আমার কী।
বাঁ-হাতে জড়িয়ে দাদুকে তুলে ধরে ট্রাউজার্সটা খুলে নিল। বাথরুমের কোনায় সেটাকে ছুড়ে ফেলে দাদুকে ঠেলে দিল চেয়ার থেকে। মুখ থুবড়ে দাদু পড়ে গেল। তাকে জলের ঝারির নীচে হিঁচড়ে টেনে আনল শান্তা।
টুপু তুমি এক বার শুধু দেখে যাও, কিন্তু কিছু বোলো না। ছুটে এসে আমার গায়ে হাত বুলিয়ে আদর কোরো না। শান্তা জানে আমি কথা বলতে পারি না। লেখার জন্যে আঙুলটুকু পর্যন্ত নাড়তে পারি না, তবু ওর ভয় ঘোচে না। তাই ও আমায় মারে। অথচ আমিই ওকে এ-বাড়িতে আনি। তোমার ঠাকুমা পাগল হলে শান্তা নার্স হয়ে আসে। ওকে প্রথম থেকেই আমার ভালো লেগেছিল। তোমার ঠাকুমার অসুখের পর আমি মদ ছেড়েছিলুম। তুমি বড়ো হলে জানবে যে আমি খুব উদ্ধৃঙ্খল ছিলুম। হাতে প্রচুর টাকা ছিল আর খরচও করতুম। ঠাকুমা আমার জন্যেই সুখী হয়নি। কেন যে পারিনি ওকে সুখী করতে জানি না, বোধ হয় এইটেই ওর ভাগ্যে ছিল। কিংবা টুপু, এমনও তো হতে পারে—উদ্ধৃঙ্খলতা আমার স্বভাবে ছিল, আমার পূর্বপুরুষদের নামে গেরস্থঘরের বউ-ঝিরা কাঁপত, তাদের রক্ত তো আমার শরীরে আছে, আমি কেমন করে ভালো হব বল? কিন্তু আমার রক্ত তো তোমার শরীরেও আছে, তবে তুমি কী করে সুন্দর হলে। এ ভীষণ হেঁয়ালি। তুমি বলবে ঠাকুমা অসুখী হয়েছিল তার নিজের দোষেই। কী জানি, তার মনের খবর আমি পাইনি সেও আমায় দেয়নি। ফুল আর খোকা খুকুদের নিয়েই তার দিন কাটত। নিজের ছেলেরা বড়ো হলে পর সে প্রতিবেশীর বাচ্চাদের এনে আদর করত। টুপু, তুমি কাদের সঙ্গে এখন খেলা কর? তারা আজও আসে তো? ওদের নিয়ে এসো আমার কাছে। সুখী মুখ আমি দেখিনি টুপু।
শান্তা থাকত ঠাকুমার ঘরের লাগোয়া ছোট্ট ঘরটায়, যেটায় সে এখনও আছে। একদিন রাতে দেখলুম শান্তা বারান্দায় দাঁড়িয়ে। ভাবলুম বলি রাতে যেন ঘর থেকে না বেরোয়, রাত্রে লুলাকে ছেড়ে রাখা হয়। সাবধান করার জন্যই ওর কাছে গেছলুম। ও কিন্তু আমায় দেখে হাসল মাত্র, কথা কানেই তুলল না। যেন আমার যাবার অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়েছিল। অন্ধকার বারান্দায় ঘর থেকে একচিলতে আলো এসে পড়েছে। তাতে ওর মুখের একদিকটা দেখতে পাচ্ছিলুম আর দূরে রাস্তার আলোয় আকাশটা পোড়া ইটের মতো দেখাচ্ছিল। শান্তা দাঁড়িয়েছিল আকাশের দিকে মুখ করে, ওকে আমি জড়িয়ে ধরলুম। অন্য কেউ হলে নিশ্চয় ভয় পেত, ও কিন্তু একটা শব্দও করল না। এরকম ঘটবে যেন জানত। আর কী অশ্চর্যভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ঘরে চলে গেল। একচিলতে আলোটা বন্ধ হয়ে গেল। বেশিক্ষণ আর দাঁড়িয়ে থাকিনি কেননা লুলাকে তো জানি। সারাদিন অন্ধকার ঘরের মধ্যে থেকে আর মানুষ না দেখে ও শেখেনি মানুষ আর ইঁদুরের তফাত।
