একদিন মিঠু বলল, কোন দুটো বাচ্চা আমরা রাখব, বাবা বলল বেছে নিতে। দাদা তুই নীচে আসবি একবার?
দেবু মাথা নাড়ল।
কেন? আয়-না, এক মিনিট। জানিস দাদা, কাল প্লেটে করে দুধ দিয়েছিল মা, কেমন চুক চুক করে ওরা খেল। বাবা বলল, আর জালিকে দরকার হবে না।
কয়েক সেকেণ্ড মিঠুর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে দেবু বলল, জালিকে তো তাড়িয়ে দেওয়া হবে। ও কোথায় যাবে?
কেন, যেখানে ছিল সেখানেই যাবে। আচ্ছা দাদা, আমরা যখন আইসক্রিম কিনতে যাব। তখন ও আমাদের চিনতে পারবে? কুকুরের তো বুদ্ধি খুব, মানুষের মতোই… বাবা-মা দুজনেই বলছিল কুকুরের মায়াদয়া মানুষের মতো, মা-মরা বাচ্চাদের দেখেই জালি কীরকম যেন হয়ে গেল, তাই না?
জালির জন্য তোর কষ্ট হচ্ছে না?
হচ্ছে না আবার! আমার থেকেও বেশি কষ্ট হবে তো বাচ্চাগুলোর।
তুই যা এখন।
দেবু পাশ ফিরে চোখ বুজল। একসময় সে সিঁড়িতে কথার শব্দ শুনতে পেল, বাবা বলছে, এমন চোব্যচোষ্য খাওয়া পেলে চলে যেতে হলে কষ্ট হবে না?
মা বলল, বাড়ি তো চিনে গেছে, নিশ্চয় আবার আসবে। সুকুমারকে বলেছি, এলে যেন কিছু খেতেটেতে দেয়।
দেবু বিছানা থেকে উঠে জানলায় দাঁড়াল। মেঘ উড়ে আসছে কিন্তু জমা হচ্ছে না। আকাশটা লিজার গায়ের রঙের মতো হয়ে রয়েছে। সে গুটিগুটি বারান্দার দিকে এগিয়েই থমকে দাঁড়াল। দরজা থেকে উঁকি দিয়ে রাধাচূড়া গাছ, তাতে বসা শালিক, কাক, পাতার ফাঁক দিয়ে ধাবমান মিনিবাসের চাল দেখার পর দৃষ্টিটা আবর্জনাস্তুপের উপর পড়তেই সঙ্গে সঙ্গে মুখটা টেনে নিল। সদ্য-জন্মানো কুকুরছানার মতো টলমল করতে করতে ঝাপসা চোখে সে খাটের দিকে এগোল।
গরমের ছুটিশেষে স্কুল বাসে যাবার সময় দেবু একদিন দেখল, মিষ্টির দোকানের সামনে তিনটে কুকুরের সঙ্গে জালিও মুখ তুলে বসে। একটা বাচ্চা ছেলে শিঙাড়া খাচ্ছে। জালি ল্যাজ নাড়ছে। জানলা দিয়ে মাথা বার করে দেখতে দেখতে দেবুর মুখে আলতো একটা হাসি ফুটে ওঠে।
টুপু কখন আসবে
টুপু, টুপু, ওই শোনো লুলা আবার ডাকছে। তুমি জান না, যে-রাতে তোমার ঠাকুমা মারা যায় সেদিনও অমন করে ডেকেছিল। টুপু, তোমার ভয় করছে না? পালিয়ে এসো, আমার কাছে। এসো।
দোতলার পুব দিকের গোল বারান্দায় সকালের রোদ, চৌকো নকশার রেলিঙের ফাঁক দিয়ে লাল সিমেন্টে পড়েছে। কাঠের দোলনা ঘোড়ায় দুলতে দুলতে টুপু তাকাল দাদুর দিকে। আবার তাকাল নিজের ছায়াটার দিকে। ছায়াটা দুলছে। খুশিতে আরও জোরে টুপু নিজেকে দোলায়, ঢেউয়ের মতো ওঠা নামা করে কাঠের ঘোড়া।
দাদু, দ্যাখো দ্যাখো।
টুপুর কুচকুচে তারা দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল।
আঙুল দিয়ে ছায়াটাকে সে দেখাল। দাদু আগের মতো চাকা-লাগানো চেয়ারটায় চুপ করে বসে। হাসে না, কথা বলে না, নড়াচড়া করে না। আস্তে আস্তে দুলুনি কমে এল টুপুর।
অ্যাই দাদু, কথা বল না কেন? শান্তাদিদি তো এখন চুল আঁচড়াচ্ছে, কেউ তো বকবে।
দাদু একভাবে বসে থাকে, কথা বলে না, নড়াচড়া করে না। টুপু আবার ঘোড়াটাকে দোল দিতে শুরু করল।
দাদু ঘোড়ায় চাপবে?
কথাগুলো ঢেউয়ে-ভাসা ব্লটিং কাগজের মতো ওঠা-নামা করতে কয়তে ডুবে গেল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে টুপু নেমে বারান্দার অন্যধারে ছুটে গেল। সেখানে এইমাত্র একটা বোলতা উড়ছিল।
টুপু উঠো না রেলিঙে। বোলতা উড়ে গেছে। হয়তো এখন বুগেনভিলার খোকায় বসেছে। আছে কি গাছটা এখনও গেটের ওপর। তুমি যেখানে দাঁড়িয়েছ এখান থেকে তো গেটটা দেখা যায়। তোমার ঠাকুমা পুঁতেছিল, সে কি আর এখনও আছে। গাছ-ফুল-পাখি, রঙিন মাছ আর খোকা-খুকুদের সে বড়ো ভালোবাসত। না না, টুপু ওদিকটায় যেয়ো না, আমার চোখের আড়ালে যেয়ো না। আমি কিছু দেখতে পাই না তুমি কাছে না থাকলে। টুপু আকাশ এখন কি তোমার সোয়েটারের রঙের মতো নীল হয়েছে? এক বার দেখে আসবে লনের শিশিরে রোদুর কি তোমার চোখের থেকেও ঝিকমিকে? মাঠি খুঁড়ে ছোট্ট ছোট্ট ঢিপি করেছে কী কেঁচোরা? যদি করে থাকে তাহলে বুড়ো আঙুল দিয়ে ওগুলো ভেঙে দিয়ে এসো, দেখবে কী মজা লাগে। মাটিগুলো ঝুরঝুরে হয়ে হয়ে যায়। খানিকটা ওই মাটি এনে আমার চোখের সামনে উড়িয়ে দাও, আমি দেখব তোমার চুল না মাটি-কোনটা বেশি ঝুরো। না থাক, টুপু তুমি যেয়ো না, তাহলে ওরা তোমায় বকবে। ওরা তোমায় কেন যে আমার কাছে আসতে দেয় না! আমি কি তোমার কিছু ক্ষতি করতে পারি! টুপু এখন কেউ নেই, এই হচ্ছে সময়। তুমি এসো আমার কাছে। আর আসার সময় দেখে নিয়ে ফুরুস গাছে বুলবুলি এসেছে কি না। ওরা বছরে বছরে আসে।
খোঁজাখুঁজি করে বোলতাটাকে না পেয়ে টুপু ফিরে এল। ঘোড়ায় উঠতে যাবে—কী ভেবে উঠল না। গুটিগুটি দাদুর কাছে এসে দাঁড়াল।
তুমি কথা বল না কেন? বলতে পার না জিভ নেই বলে? কই হাঁ করো তো, করোনা। মুখের কাছে মুখ আনে টুপু, দাদুর চোখের পাতা ঘন ঘন পড়ে।
তুমি হাঁ করতে পার না? তবে খাও কী করে?
টুপুর জিজ্ঞাসার উত্তরে চোখের পাতা ফেলা ছাড়া আর কিছু করে না দাদু। টুপু রেগে ওঠে। দাদুর হাত ধরে জোরে নাড়া দেয়। চেয়ারের হাতল থেকে ঝুলে পড়ে হাতটা।
খাও কী করে বলো-না? আমি কিন্তু চাইব না। সত্যি বলছি। আমি কি অসভ্য? না বলবে তো বয়ে গেল, যখন তুমি খাবে তখন ঠিক লুকিয়ে লুকিয়ে দেখব। সত্যি সত্যি দেখব কিন্তু?
খস খস চটির শব্দ আসে। টুপু দাদুর কাছ থেকে সরে দাঁড়ায়। শান্তা এল। মাজা গায়ের রং। পেকে-ওঠা ফোড়ার মতো টসটসে শরীর। পিঠের সাদা আঁচলটাকে মনে হয় একটা কঙ্কাল যেন শ্রান্ত হাত ঝুলিয়ে দিয়েছে। কমলা রঙের অর্গাণ্ডির ব্লাউজটা ক্ষতের ওপর নতুন গজানো চামড়ার থেকেও টানটান, তাই ব্রেসিয়ারটাকে দেখায় একখন্ড হাড়। শান্তার বয়স বোঝা যায় না। ওর গলার স্বর খসখসে ঠাণ্ডা। ওর হাতের নখ সরু আর রঙিন।
