মাই গড, এটা তো ভাবিনি! বিমান কৃতজ্ঞ রইল সুকুমারের কাছে। মানসিক যন্ত্রণার গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসার পথটা সুকুমার পাইয়ে দিয়েছে।
রাতে ফিসফিস করে মিঠু পাশের খাটে দেবুর কাছে জানতে চাইল, জালির বাচ্চারা তাহলে কী খেয়ে থাকবে?
জানি না।
ওদের খেতে দেবার তো কেউ নেই।
দেবু উত্তর দিল না।
ওরা খেতে না পেয়ে মরে যাবে দাদা?
যাবে। কিছুক্ষণ পর। তুই-ই তো প্রথম খবরটা দিলি, জানো সুকুমারদা, সেই সেইটে গো, ছ-টা বাচ্চা হয়েছে, কেন বলতে গেলি?
দেবু উঠে বসে বিছানায় ঘুসি বসাল। আমি কি তখন জানতুম যে.. মিঠু ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।–লিজার বাচ্চাদের বাঁচাতে হবে না বুঝি।
আরও পরে মিঠু বিছানায় উঠে বসল। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে আবার শুয়ে পড়ল।
ভোর হতেই দেবু বারান্দায় এসে মাঠের আবর্জনার দিকে তাকিয়ে স্বস্তি বোধ করল। বাচ্চাগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কেউ বসে, কেউ হাঁটার চেষ্টা করছে। তার মনে হল, ওরা ডাকছে, বোধ হয় একা থাকতে ভয় পেয়ে।
নীচে এসে মিঠুর কানে কানে সে বলল, সব কটা বেঁচে আছে, আমি গুনলুম।
খাওয়ার টেবিল থেকে বিমান বলল, আজ অফিসে গল্প করতে হবে। লিজা থেকে জালি, নাটক লেখা যায়।..আমি বরাবরই বলেছি আজও বলছি, মিঠুই বেশি ট্যালেন্টেড দেবুর থেকে।
ওদের সামনে এভাবে বোলো না, দুজনেই তাহলে আঘাত পাবে।
বিমান অপ্রতিভ হয়ে বলল, ওরা এখন কুকুরবাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত।
দেবু দুপুরে আর এক বার বারান্দায় গিয়ে দেখে এল। গনগনে রোদ। রাস্তায় মানুষ নেই। আবর্জনার উপর ছটা ছানাই শুয়ে। বোধহয় ঘুমোচ্ছ।
সারাদিনই ওরা ব্যস্ত রইল। লিজার কলারটা জালির গলায় বেঁধে চেইনটা তাতে লাগিয়ে মিঠু ওকে রাস্তায় নিয়ে যেতে চেয়েছিল, দীপালি রাজি হল না।
যা করার ছাদে গিয়ে করে আসুক। ওকে আর রাস্তা দেখিয়ো না, তাহলে বিগড়ে যাবে।
ঠিকে ঝি হাজারি জগদীশবাবুর বাড়িতেও কাজ করে। ব্যপারটা শুনে তিনি দেখতে এলেন। জালি চার পা ছড়িয়ে পাশ ফিরে ঘুমোচ্ছে। তার পেটের কাছে দুটো আর মাথার দিকে দুটো ছানা, তারাও ঘুমোচ্ছে। টেবিল ফ্যানের হাওয়া বিলি কাটছে জালির লোমে।
বাহঃ দিব্যি পোষ মেনে গেছে তো। ভাগ্যিস ঠিক সময় পেয়ে গেছ, কোথায় ছিল এটা?
দীপালি প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, পোষ মানবে না কেন। পুরো নেড়ি তো নয়, মুখের গড়নটা দেখেছেন, ল্যাব্রাডরের ধাঁচ রয়েছে না? হয়তো ওর ঠাকুমা কি ঠাকুরদার জন্ম ক্রস ব্রিডিংয়ে… দেবু শুনছে দেখে দীপালি থেমে গেল।
পরদিন ঘুম থেকে উঠে দেবু প্রথমেই বারান্দায় গেল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। ছানাগুলোকে আর তো দেখতে পাচ্ছে না।
গ্রিলে পা দিয়ে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে মাঠের অনেকটাই তার নজরে এল। দূরে রাস্তা দিয়ে একটা বড়ো কুকুর চলে যাচ্ছে দেখল কিন্তু আবর্জনায় কোনো নড়াচড়া চোখে পড়ল না। তাহলে ওরা গেল কোথায়? খাবার জন্য সে নীচে নেমে গেল।
দুধ শেষ করে টেবিলেই সে অপেক্ষা করল। বাবা কাগজ নিয়ে বাথরুমে, মা রান্নাঘরে, মিঠু জালির কাছে। আর কেউ নেই যে তাকে লক্ষ করবে। সে নি :সাড়ে সদর দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ল।
এলিট হাউজিং-এর পাঁচিল ঘুরে সে মাঠের উপর দিয়ে এগোল। দুটো বাড়ির ফাঁক দিয়ে তাদের বারান্দাটা দেখতে পাচ্ছে, গ্রিলে-গুঁজে-রাখা বারান্দা মোছার সবুজ ন্যাতাটাও চোখে পড়ল। কিন্তু ওরা?
চারটে কাক কী যেন ঠোকরাচ্ছে। ভাঙা ইট, ভাঙা বোতল, কৌটো, তুলো, ডাবের খোলার কিনারে দেবু দাঁড়িয়ে পড়ল। চোখ সরু করে তাকিয়ে হাত নেড়ে হুশশ হুশশ বলে চেঁচিয়ে উঠল। কাকগুলো বিরক্ত হল এবং একটি মাত্র সামান্য উড়েই আবার ফিরে এসে ঠুকরে টেনে টেনে বার করে খেতে শুরু করল।
দেবু আর একটু এগিয়েই থমকে দাঁড়াল এবং যেন কারুর ধমক খেয়ে পিছিয়ে গেল দু পা। ধীরে ধীরে তার চোখ বিস্ফারিত হল, বিন বিন ঘাম কপালে ফুটল, শ্বাস-প্রশ্বাস গভীর এবং দ্রুত হতে হতে চেতনা থেকে স্বাভাবিক বোধের সংযোগগুলো ছিঁড়ে যাওয়া মাত্র সে নীচু হয়ে বার বার ইট কুড়িয়ে ছুড়তে শুরু করল। তখন গোঙানির মতো অবোধ্য একটানা শব্দ ওর মুখ থেকে বোররাতে থাকে।
নাহ নাহ নাহ।…খাবি না, ওদের খাবি না।…মেরে ফেলব, সবাইকে মেরে ফেলব…।
হাঁফাচ্ছে দেবু। দুটো হাত পাশে ঝুলছে। দরদর ঘাম গড়াচ্ছে মুখ-গলা-ঘাড় বেয়ে। চোখের পাতা প্রায় বন্ধ। দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে শনশন একটা দূর থেকে ভেসে আসা ঘূর্ণিঝড়ের মতো শব্দ হচ্ছে।
অ্যাই খোকা, সক্কাল বেলায় ইট ছুড়ছ? বিকেল বেলায় তাহলে কি বোমা ছুড়বে? অ্যা? কাক-চিল যদি খায় তো খাক-না। ভালোই তো, পচা গন্ধ বেরোবে না।..যাও বাড়ি যাও।
স্কাইলাইনের তিন-তলার জানালা থেকে একটা রোগা মুখ খেকিয়ে উঠল। দেবু মুখ তুলে। তাকাল। ঘোলাটে উন্মাদের মতো চাহনি। তারপর ছুটতে ছুটতে সে বাড়ি ফিরে একই গতিতে দোতলায় উঠে বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে।
বিকালেই দীপালিকে ডাক্তার ডাকতে হল। তিনি বাবার সময় আশ্বাস দিয়ে বললেন, এই প্রচন্ড গরমে এরকম হয়ই। ওষুধগুলো এখুনি আনিয়ে নিন, মনে হয় রাতের মধ্যেই টেম্পারেচারটা নেমে যাবে। চিন্তার কিছু নেই। কয়েক দিন রেস্টে থাকুক, ওষুধগুলো খেয়ে যাক। ঘোরাঘুরি যেন না করে।
দেবুর জ্বর একশোর নীচে নামল পাঁচ দিন পর। তারপরও কয়েক দিন তাকে বিছানায়ই থাকতে হল। বাড়ির সকলে তার কাছে এসে গল্প করেছে। মিষ্টি গলায় কথা বলেছে। তাকে খাওয়ানো, বাথরুমে নিয়ে যাওয়া, গল্পের বই এনে দেওয়ার মতো কাজগুলো তারা ব্যস্ত হয়ে করেছে। দেবুও নানা বিষয়ে ছোটো ছোটো প্রশ্ন করেছে কিন্তু জালি এবং লিজার বাচ্চাদের সম্পর্কে সে একবারও কৌতূহল প্রকাশ করেনি। এ ব্যাপারে কেউ কথা তুললে সে শুধু নীরবে মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেছে; তারপর মুখ ঘুরিয়ে জানলা দিয়ে আকাশে চোখ রেখেছে।
