তিন কৌটো আইসক্রিম তারা কিনেছিল। দুটো যখন শেষ হল তখন বাড়ির দরজায় কুকুরটা পৌঁছে গেছে। বসার ঘরের জানলার আড়ালে রুদ্ধশ্বাসে বিমান, দীপালি আর মিঠু দেখছে।
দেবু ভিতরে ঢুকে তৃতীয় কৌটোটা নীচু করে ধরে, আয় আয় চু চু…আয়, বলে ডাকল। কুকুরটা ইতস্তত করছে। লেজ নেড়ে, কান দুটো ঘাড়ের সঙ্গে মিশিয়ে সে দেবুকে তার সুখের খবর দেওয়া ছাড়া ভিতরে জন্য এগোল না। সুকুমার উৎকণ্ঠাভরে একটু দূরে দাঁড়িয়ে।
তখন মিঠু ঘর থেকে বেরিয়ে এল। দেবুর হাত থেকে আইসক্রিমের কৌটোটা নিয়ে দরজার কাছে এগিয়ে হুবহু দীপালির মতো গলা করে বলল, লক্ষ্মী মেয়ে, কিছু ভয় নেই; এসো, ভেতরে এসো…এসো তো মা।
কুকুরটা জোরে লেজ নাড়তে নাড়তে মিঠুর কাছে এল। মিঠু ওর মাথায় সতর্কভাবে ডান হাত রেখে, বাঁ-হাতে কৌটোটা মুখের কাছে ধরল। জিভ দিয়ে খানিকটা চেটে তুলে নিল।
মিঠু পিছিয়ে গেল, কুকুরটাও দরজা পেরিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকল। সুকুমার প্রায় ছুটে গিয়েই দরজা বন্ধ করে দিল, শব্দ না করে।
মিঠু গায়ে হাত দিয়ো না; কামড়ে দিতে পারে। ঘর থেকে উদবিগ্ন কন্ঠে দীপালি বলল।
ওকে ওই ঘরে নিয়ে যা মিঠু। দেবু নির্দেশ দিল।
মিঠুর সঙ্গে সঙ্গে কুকুরটা এগোল। ভেজানো দরজা ঠেলে মিঠু ঘরে ঢুকল, আলো জ্বালল। বাচ্চাগুলোর চোখে আলো লাগামাত্ৰ কুঁই কুঁই করে ডাকতে শুরু করল। কুকুরটা দরজার কাছ থেকে সচকিত হয়ে তাকাল।
এসো লক্ষ্মীমেয়ে…ওদের মা মরে গেছে কিনা তাই কাঁদছে, সারাদিন ওদের খাওয়া হয়নি, খিদে পেয়েছে…তুমি ওদের দুধ খাওয়াবে…খাওয়াবে না?
বাচ্চাদের মতো স্বরে, চোখে-মুখে গভীর দরদ নিয়ে মিঠু কথা বলছে। কুকুরটা তার মুখের দিকে তাকিয়ে। মিঠু কৌটোটা মেঝেয় রাখল। ও এগিয়ে এসে খেতে শুরু করল। ঘরের দরজাটা নিঃশব্দে বন্ধ করে দিল কেউ। টলতে টলতে বাচ্চাগুলো চেষ্টা করছে কাছে আসার। কী ভাবে যেন ওরা টের পেয়েছে, জীবনদায়ী একটা আশ্বাস তাদের কাছাকাছি এসেছে। কুকুরটা কৌতূহলী চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে। ওরা যে ভাষায় কুঁই কুঁই করছে তার অর্থ বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না।
মিঠু তখন সাহসভরে একটা বাচ্চাকে দু-হাতে তুলে ওর মুখের কাছে ধরল। মুখটা সরিয়ে নিল। মিঠু আবার ধরল। আবার সরিয়ে নিয়ে তারছা চোখে সে মিঠুর মুখের দিকে তাকাল। বাচ্চাটাকে সে মেঝেয় নামিয়ে রাখল।
ঘরের জানলায় বিমান, দীপালি, দরজা ফাঁক করে দেবু আর সুকুমারের মুখ উঁকি দিচ্ছে।
এই মিঠু, বল আর আইসক্রিম দোব। ভাত ও মাংস দুধ বিস্কুট পাঁউরুটি সব দোব।
কিন্তু মিতু কিছু বলার আগেই কুকুরটা চেটে দিল বাচ্চার মাথা। তারপর আলতোভাবে ঝোলা পেটটা মেঝেয় ছড়িয়ে কাত হয়ে বসল। স্তনের টসটসে কালো বোঁটাগুলো সাদা কোটের বোতামের মতো দেখাচ্ছে।
কী ভালো গো, তাই না মা? মিঠু জানলার দিকে তাকিয়ে বলল।
বাচ্চাটা নিজে থেকেই তার লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে গেল। মিঠু বাকি তিনটিকেও তুলে এনে বসিয়ে দিল পেটের কাছে।
নিস্তব্ধ হয়ে আছে সারা বাড়ি। জোড়া জোড়া চোখ নিবদ্ধ সারি দিয়ে উপুড় হওয়া চারটি বাচ্চার দিকে। সকালের শোক ঢেকে দিয়ে গাঢ় প্রশান্তি বিরাজ করছে। বিমানের চোখ ছলছল করে উঠল। দীপালি চোখ মুছে বলল, সত্যনারায়ণ দোব।
মাথার কাছে বাবু হয়ে দুজনে বসে। মাঝে মাঝে মিঠু মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কুকুরটা চোখ বুজে উপভোগ করছে আদর।
দাদা, এর নাম কী রে?
নাম নেই।
একটা নাম দে তাহলে।
দেবু নাম খুঁজতে ব্যস্ত হল। একটার পর একটা নাম বলে যায় আর মিঠু সেগুলো বাতিল করে দেয়। অবশেষে দেবু বলে, লিজার মতো অত ভালো নাম কি চট করে পাওয়া যায়। কাল বলব।
কেন, ওকে লিজা বলে ডাকলেই তো হয়।
পাগল, তাই কখনো হয়? রাস্তার কুকুরের নাম লিজা রাখলে লোকে হাসবে।
তাহলে লিজা উলটে জালি নাম রাখা।
লিজা, নিজালি… জালি জালি, জালিকা…ঠিক আছে, জালিই থাক। বসার ঘরে বিমান চিন্তিত, দীপালিও।
ছেড়ে দিলে আবার যে ফিরে আসবে তার কোনো গ্যারান্টি আছে কি? বিমান অনিশ্চিত, অথচ সমাধান একটা চাই-ই, এমন অবস্থায় পড়ে গেছে।
সারা দিন সারা রাত কি এভাবে থাকতে চাইবে? পোষা কুকুর তো নয় দীপালিও সমাধান চায় কিন্তু বাধাগুলো সে জানে।
না চাইলেও রাখতে হবে। অন্তত দিন সাতেক তো বটেই। একটু নিষ্ঠুরতা হয়তো…কিন্তু লিজার বাচ্চাগুলোকে বাঁচাতে হবে তো। সেটাও ভাবো? বিমান ব্যাপারটাকে এমন জায়গায় নিয়ে এল যেখানে কুকুরছানাগুলো মানুষের গলায় কথা বলতে পারে।
কিন্তু ওর নিজেরও বাচ্চা আছে, ছ-টা।
তাহলে কি ওকে ছেড়ে দেব? আমাদের বাচ্চাগুলোকে মরার পথে ঠেলে দেব?
মাথা নীচু করে অনেকক্ষণ সে ভাবল। দীপালি একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে। বিমান ধীরে মাথা তুলে সন্তর্পণে বলল, এরকম ব্যাপার যদি দেবু বা মিঠুর ভাগ্যে ঘটত?
খাবার টেবিলে মিঠু বলল, জালির খুব খিদে পেয়েছিল, অত ভাত মাংস কত তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল।
জালি কে?
দেবু বাবার মুখভাব দেখে নিয়ে মৃদু স্বরে বলল, লিজা উলটালে জালি হয়, তাই মিঠু ওই নাম দিয়েছে। ও লিজা রাখতে চেয়েছিল, আমি আপত্তি করি।
মন্দ নয়, ভালোই তো নামটা। বিমান স্ত্রীর দিকে তাকাল অনুমোদনের জন্য। দীপালি হাসল শুধু। জালিকে ছেড়ে দেওয়া হবে কি হবে না, সে-সম্পর্কে সুকুমারের মতামত চাওয়া হল।
না দাদা, ছাড়বেন না। ওকে হয়তো আবার ধরে আনা যাবে কিন্তু বুকে দুধ আর তখন অবশিষ্ট থাকবে না, ছ-টা বাচ্চা চুষে শেষ করে রাখবে।
