ঘরের এককোণে সতরঞ্চির উপর কালো বলের মতো চারটি ছানা। থরথর করে কাঁপছে। চোখে দৃষ্টি নেই। ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছে আর ডেকে যাচ্ছে। চলার চেষ্টা করলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তবু হিঁচড়ে হিঁচড়ে এগিয়ে একটা ছানা দেয়ালে বাধা পেয়ে সেখানেই বসে পড়ল।
মা ধরব? দেবু বলল।
একদম না। অত বাচ্চার গায়ে এখন হাত দিতে নেই। দেখা তো হয়েছে, এবার বাইরে এসো। আলো ওদের চোখে সহ্য হয় না, কষ্ট পায়।
মা ওরা খাবে কী? মিঠু দ্বিতীয় বার জানতে চাইল।
ড্রপারে করে মুখের মধ্যে দুধ ঢেলে দেওয়া হবে। সুকুমার ডুপার কিনতে গেছে।
বিমান বসার ঘরে সোফায় আনমনা মেঝের দিকে তাকিয়ে। ছেলে-মেয়েকে দেখে শুকনো হাসল।
কষ্ট হচ্ছে?
দেবু আর মিঠু মাথা নাড়ল শুধু। দুজনকে কাছে টেনে নিয়ে সে পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, মন খারাপ করার কী আছে। এবার দুটো বাচ্চা রেখে দেব। লিজারই তো বাচ্চা। একটার বদলে দুটো লিজা আমাদের হবে।
মা নেই বলে বাচ্চাদের কষ্ট হবে না? মিঠু করুণচোখে বাবার দিকে তাকাল।
এখন অত কিছু বোঝার মতো মন ওদের হয়নি। এখন শুধু পেটভরে দুধ খেতে পেলেই ওরা খুশি থাকবে।
যখন বড়ো হবে?
যখন হবে তখন দেখা যাবে। বড়ো হলে কি কেউ বাবা-মাকে আর চায় নাকি। তোমরাও আর আমাকে বা মাকে চাও কি?
বিমান দুজনের দিকে তাকিয়ে মিটমিটে হাসি ছড়িয়ে দিল। মিঠু তার মুখ বাবার কোলে গুঁজে দিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বলে চলল, চাই চাই চাই। দেবু অপ্রতিভ, লাজুক চোখে শুধু অনুযোগ জানাল এইভাবে তাদের বিব্রত করার জন্য।
ছেলের আর মেয়ের কাছ থেকে বিমান তো এটাই চায়। তার জীবনে এটাই এখন শ্রেষ্ঠ সম্পদ—ওদের হৃদয়, এখনও যা দূষিত হয়নি, এখনও যাতে অবিশ্বাস অবহেলা অশ্রদ্ধার থাবা আঁচড় টানেনি। সে তৃপ্ত মনটিকে তারিয়ে উপভোগ করল।
ডাইনিং-কে অপারেশন থিয়েটার বানিয়ে, ক্লোরোফর্ম করে এত বড়ো ব্যাপার কি সাকসেসফুল হয়! বিমান অসহায়ের মতো কৈফিয়ত দিল কারুর দিকে না তাকিয়ে।
দীপালি বলল, দু-দিন ধরে ব্যথা উঠেছে, আমারই বোঝা উচিত ছিল কমপ্লিকেশন দেখা দেবে। হাসপাতালে আগেই পাঠানো উচিত ছিল।
ড্রপার কিনে এনেছে সুকুমার। কিন্তু তাই দিয়ে ছানাদের দুধ-খাওয়ানো যাচ্ছে না। কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ওগরানো দুধ। কিছুটা পেটে যাচ্ছে বটে কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয়। দীপালি ছেঁড়া কাপড়ে পলতে বানিয়ে সেটা দুধে ভিজিয়ে ওদের মুখে ধরল। তাতেও কাজ হল না। এভাবে ওরা খেতে চাইছে না। বিমানও চেষ্টা করল এবং হতাশ হয়ে অবশেষে বলল, ব্রেস্ট ফিডিং ছাড়া উপায় নেই। বেশি জোরজবরদস্তি করলে হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে।
নিরুপায় চোখে দীপালি তাকিয়ে। বিমান অসহায় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। সুকুমার রান্নাঘরে ফিরে গেল। দেবু এবং মিঠু অস্থির হয়ে উঠছে।
মা, না খেলে তো ওরা মরে যাবে।
মিঠু, এসব কথা এখন বলে না। যাও, এখন ঘরের বাইরে যাও। বিমান মানসিক স্থৈর্য আর রাখতে পারছে না। মেয়েটা বিশ্রী রকমের এমন একটা সত্যিকথা বলেছে, সেটা নিয়ে কিছুই করা যাচ্ছে না। এমন একটা সমস্যায় যে পড়তে হবে কে জানত।
কী করা যায় বলো তো? বিমান বিশেষ কাউকে উদ্দেশ না করেই বলল। কেউ উত্তর দিল না। কারুর তা জানাও নেই।
দাদা একটা কথা বলব।
সবাই ফিরে তাকাল সুকুমারের দিকে।
আমার ছোটোমাসির যখন ছেলে হয় তখন ওর ননদেরও ছেলে হয়। কিন্তু ননদটা বাঁচেনি। বাচ্চাটাকে ওরা ছোটোমাসির কাছে দিয়ে যায় বুকের দুধ খাওয়াবার জন্য। চার মাস ছিল।
তা আমি এখন এগুলোর জন্য ছোটোমাসি কোথায় পাব।
সদ্য বিইয়েছে এমন কুকুর একটা খুঁজে বার করতে পারলে হত।
কোথায় এখন খুঁজবি? আর খুঁজে পেলেও এই চারটেকে নিয়ে যাওয়াও এখন সম্ভব নয়।
এই সময় মিঠু কানে কানে দেবুকে জিজ্ঞাসা করল, দাদা বিইয়েছে মানে কী রে?
মানে হয় না। চুপ কর।
সুকুমারদা, তুমি যে বললে খুঁজে বার করলে হত, কী কুকুর সেটা?
সদ্য বাচ্চা হয়েছে এমন কুকুর।
আমাদের পিছন দিকের মাঠে একটা কুকুরের…জান সুকুমারদা, সেই সেইটে গো, আমাদের সঙ্গে সঙ্গে আইসক্রিম খাবার জন্যে আসছিল, মনে আছে তোমার?…তার ছটা বাচ্চা হয়েছে। দাদা গুনেছে!
দু-মিনিটের মধ্যে বাড়ি চঞ্চল হয়ে উঠল। দেবুও জানিয়েছে সে নিজের চোখে দেখেছে, পিছনের মাঠে বাচ্চাদের সমেত মা-কে শুয়ে থাকতে।
কিন্তু ওকে তো আনতে হবে আর কীভাবে তা সম্ভব? মানুষ তো নয় যে বললাম আর চলে এল। বিমান এতক্ষণে আশার ক্ষীণ একটা আলো দেখতে পেয়েছে। কিন্তু সেটাকে উজ্জ্বল করে তুলতে হলে ফন্দি এঁটে এগোতে হবে। বুদ্ধির প্রয়োগ দরকার। বুদ্ধির চর্চার এই সুযোগটা তাকে উত্তেজিত করে তুলল।
কাছে গিয়ে চট করে দড়ির ফাঁস ছুড়ে গলায় যদি… বিমান থেমে গেল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, এভাবে টেনে আনলে খেপে যাবে, বাচ্চাগুলোকে হয়তো কামড়ে মেরে ফেলে দেবে।
রাস্তার কুকুর তো, দীপালি নিশ্চিত স্বরে বলল, কিছু খাবারটাবারের লোভ দেখাও, দেখবে সুড়সুড় করে চলে আসবে।
আসবে। দেবু টগবগিয়ে উঠে দু-হাত ঝাঁকাল। আইসক্রিম খেতে ভালোবাসে।
কিন্তু এই অন্ধকারে ধরে আনা, মানে এভাবে লোভ দেখিয়ে আনা কি সম্ভব হবে? তা ছাড়া ওটাকে এখন পাবেই-বা কোথায়?
ওষুদের দোকানের কাছে বসে থাকে। যাব বাবা, আমি আর সুকুমারদা?
অবশেষে দেবু আর সুকুমার গেল। অনুমানটা সঠিকই হয়েছে, কুকুরটা মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। একটি মেয়ে দই কিনে হাঁটা শুরু করতেই সে লেজ নাড়ল।
