সুকুমারের কাছে টাকা ছিল, সে দোকানে ফিরে গিয়ে আর এক কৌটো আইসক্রিম কিনে এনে দেবুর হাতে দেয়। মিঠু তখন আকাশের দিকে মুখ তুলে বলেছিল, দাদা তো কৌটোটা শেষ করেই ফেলেছিল, তাহলে আবার একটা নতুন কেনার কী দরকার।
মোটেই শেষ করে ফেলিনি। আদ্দেকেরও কম খেয়েছি। আচ্ছা তুই একটু নে।
মিঠু আপত্তি করেনি। দেবু লক্ষ করল তখনও কুকুরটা তাদের সঙ্গ ছাড়েনি। মিঠু বলল, এবার তুই ওকে দে।
দোবই তো।
ঝুঁকে নীচু হয়ে দেবু কৌটোটাই ওর মুখের কাছে ধরল। মুখ সরিয়ে নিল কুকুরটা, অপ্রতিভ যতটা নয় তার থেকেও বেশি অবিশ্বাসভরে।
খা খা, খেয়ে নে।
কেমন একটা লাজুক লাজুক ভঙ্গিতে সে প্রথম জিভ দিয়ে একটু চাটল, তারপর কৌটোয় জিভ ঢুকিয়ে কয়েক সেকেণ্ডেই সাফ করে দিল।
এরপরও সে ওদের পিছন পিছন চলছিল। দেবু ধমক দেয়, আর নয়, এবার এখানে থাম। কুকুরটা আর এগোয়নি।
বোধ হয় জীবনে এই প্রথম আইসক্রিম খেল। মিঠু বলে।
স্বভাবটা ভালো।
খুব লক্ষ্মী। লিজার মতোই।
না, তা কী করে হবে, দুজনের কখনো তুলনা হয়? দেবু মৃদু ভৎসনা করেছিল বোনকে।
দাদা, সুকুমারদা কী বলছে।
দেবু চমকে উঠে আবর্জনা স্তুপের থেকে মুখ ঘুরিয়ে পিছনে দরজার দিকে তাকাল। মিঠু ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রয়েছে। তার পিছনে সুকুমার। মুখ বসে গেছে। চোখের কোণে জল।
তোমাদের খাবার দিয়ে যাচ্ছি। ওপরে বসেই খেয়ে নাও। লিজাকে আর বাঁচানো গেল না। দাদা বলে দিলেন ওকে দেখলে মনে আঘাত পাবে, তাই একদম নীচে নামবে না।
ভাইবোন কিছুক্ষণ পরস্পরের চোখের দিকে অবিশ্বাসভরে তাকিয়ে জীবনের প্রথম শোকসংবাদটা থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখল। তারপর মিঠু নীচু গলায় বলল, লিজার পেটের বাচ্চারাও মরে গেছে?
ডাক্তারবাবু পেট কেটে বার করে নিয়েছেন। ছ-টার মধ্যে দুটো মরে গেছে। খুব ফুটফুটে হয়েছে।
সুকুমার সুসংবাদ দেবার মতো উত্তেজনার আমেজ আর উৎফুল্লতা মিশিয়ে ফুটফুটে শব্দটি মুখ থেকে ছড়িয়ে দিল। ভাইবোনের চোখ ঝকমক করে উঠল।
লিজার মতো দেখতে হয়েছে? দেবু জানতে চাইল।
বড়ো হলে নিশ্চয় হবে।
আর রং? মিঠু তার উচ্ছাস ধরে রাখতে পারল না।
একেবারে মায়ের মতো…পরে দেখো, এখন আমি নীচে যাচ্ছি।
সুকুমার নীচে নেমে যাবার পরই ওরা প্রায় ছুটেই সিঁড়ির কাছে এল। চার-পাঁচ ধাপ নেমে মাথা কাত করে মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করল এবং দুজনের মুখ থেকে বিহ্বল বিষণ্ণতা ধীরে ধীরে সরে গেল।
আমি শুনতে পেয়েছি।
আমিও। গিয়ে দেখে এলে বাবা কি বকবে?
বকবেই তো। আমরা মনে আঘাত পাই, বাবা কি সেটা চান?
সুকুমার দই-চিঁড়ে-আম দিয়ে তৈরি ফলার বাটিতে করে দিয়ে গেল। দেবুর খাবার ইচ্ছে নেই, মিঠুরও।
না খেলে মা বকবে। খালিপেটে থাকলে অসুখ করে।
ছাই করে, খেতে হয় তুই খা।
বাটি নিয়ে দেবু বারান্দায় এল, জগদীশবাবুর বাড়ির বারান্দা বা জানলায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে কি না দেখল। কাউকে দেখতে না পেয়ে সে বাটির ফলার বাগানে ছুড়ে ফেলল, একটা গোলাপ গাছের পাতার উপর ছিটিয়ে রইল চিড়ে-দই। দুটো কাক ঝাঁপিয়ে নামল ছাদের পাঁচিল থেকে।
দাদা আমারটাও ফেলে দোব?
আমি কী জানি। ইচ্ছে হয় খাবি নইলে খাবি না। লিজার জন্য তোর দুঃখু হচ্ছে না?
হচ্ছে।
মিঠুও ছুড়ে দিল তার বাটির ফলার। বাথরুমের কলে বাটিটা ধোবার সময় বারান্দা থেকে দেবু তাকে ডাকল।
দেখে যা মিঠু। ওই যে মাঠে, পাঁচিলের ধারে ওই যে নোংরাটোংরা উঁচু হয়ে আছে…।
দেবুর আঙুল লক্ষ করে মিঠু তাকাল।
দাদা কুকুরছানা রে।
মা-টাকে দেখছিস?
কাত হয়ে শুয়ে আছে কুকুরটা আর ছটা বাচ্চা স্তন্যপান করার জন্য নিজেদের মধ্যে হামলাহামলি করে যাচ্ছে। মায়ের পিঠের উপর দিয়ে, মাথার উপর দিয়ে, পিছনের দুই পায়ের মধ্য দিয়ে ওরা স্তন খুঁজে চলেছে আর মুখে পাওয়ামাত্র শান্ত হয়ে পা ছড়িয়ে চুষতে শুরু করছে। লাইন দিয়ে উপুড় হয়ে ছটা ছানা। কুকুরটা মাঝে মাঝে ঘাড় তুলে যে ছানাটিকে কাছে পাচ্ছে তারই গা-মাথা চেটে দিচ্ছে। আবার জঞ্জালে মাথা পেতে শুয়ে পড়ছে।
সেইটে না রে, আমাদের সঙ্গে আসছিল আইসক্রিম খাওয়ার জন্য?
দেবু মাথা নাড়ল।
কী নাম রে ওর?
রাস্তার কুকুরের আবার নাম থাকে না কি।
কবে বাচ্চা হল?
জানি না। কাল-পরশু হবে হয়তো।
দুধ খাবার পর ওরা কী করবে?
ঘুমোবে। তুইও তাই করতিস।
মা আমাকে ওইভাবে দুধ খাওয়াত? তুইও খেয়েছিস?
হ্যাঁ। সবাই খায়। বাবা খেয়েছে, মা খেয়েছে। বুকের দুধ না খেলে বাচ্চারা আর খাবে। কী? দাঁত তো নেই যে চিবিয়ে চিবিয়ে খাবে। মা দুধ না খাওয়ালে বাচ্চারা মরে যায়।
লিজার বাচ্চাদের কী হবে?
কথাটা দেবু হৃদয়ঙ্গম করতে মিনিট খানেক সময় নিল। তারপরই সে সচকিত হল।
ওরা মরে যাবে? মিঠু তার ভয়টা প্রকাশ করে ফেলল।
বাবা কিছু-একটা নিশ্চয় করবেই। দেবু জোর দিয়ে কথাটা বলল বটে, কিন্তু তার মুখে ফুটে উঠল অনিশ্চয়তা।
সন্ধ্যার মধ্যেই লিজার মৃতদেহ নিয়ে গেল। সুকুমার দুজন লোক নিয়ে আসে। তারা এই কাজই করে। চট দিয়ে মুড়ে ধরাধরি করে লোহার চাকা-লাগানো ঠেলাগাড়িতে তুলে যখন লিজাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন দোতলার ঘরে দরজা বন্ধ অবস্থায় ছিল দেবু আর মিঠু।
একসময় দীপালি দরজা খুলে দুজনকে নীচে নামিয়ে আনল। সিঁড়ির পাশের অন্ধকার ঘর থেকে কুঁই কুঁই আওয়াজ আসছে। দুজনে ছুটে গেল। দীপালি ঘরের আলোটা জ্বেলে দিল।
মা ওরা খাবে কী?
