বাচ্চা হল কি না?
হ্যাঁ।
মিঠুর সঙ্গে দেবুও সিঁড়ি পর্যন্ত গেল। পা টিপে টিপে মিঠু সিঁড়ি দিয়ে নেমে ল্যাণ্ডিংটা ঘুরেছে আর সঙ্গে সঙ্গে দাঁতচাপা গর্জন উঠল।
বলেছি না একদম নামবে না। যাও, যাও। সুকুমার, দুটোকে ঘরে বন্ধ করে দিয়ে আয় তো।
মিঠু চার লাফে দোতলায় ফিরে এসেছে। দেবুর দিকে অনুযোগের দৃষ্টি রেখে বলল, তোর জন্যই তো।
সুকুমার দোতলায় এসে ঘরের মধ্যে দুজনকে টেনে নিয়ে গিয়ে বলল, খুব খারাপ ব্যাপার। লিজার এখন যমে-মানুষে টানাটানি। এখুনি অপারেশন করতে হবে, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার টাইম নেই। ডাইনিং টেবিলের ওপর অপারেশন হবে। একদম নীচে যাবে না। দাদা–বউদির এখন মাথার ঠিক নেই, বুঝেছ? একদম শব্দটব্দ করবে না। করলে ডাক্তারবাবুর হাত নড়ে যাবে আর…
লিজা তাহলে মরে যাবে সুকুমারদা?
মিঠু ব্যাকুল চোখে তাকিয়ে। দেবু ঢোঁক গিলল।
সুকুমার মাঝবয়সি, বারো বছর এ বাড়িতে কাজ করছে। দেবুর জন্ম হয় কাজ নেবার দু মাস পর। তার কোলেপিঠেই এরা বড়ো হয়েছে। দুজনের অবস্থা দেখে সুকুমার কষ্টবোধ করল।
মরবে কেন। খুব মন দিয়ে ভগবানকে ডাকো, দেখবে লিজা ভালো হয়ে যাবে। গরম জল বসিয়ে এসেছি। তোমাদের পরে খেতে দোব। দরজাটা ভেজানো থাক, বেরিয়ে না কিন্তু।
দরজা বন্ধ হওয়ামাত্র মিঠুর চোখ জলে ভরে এল। বিছানায় আছড়ে পড়ে সে বালিশে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল।
দেবু উদভ্রান্তের মতো বলল, কাঁদছিস কেন? সুকুমারদা বলে গেল-না ভগবানকে ডাকতে?
মিঠুর কান্না আরও বেড়ে গেল। দেবু খাটে হেলান দিয়ে চুপ করে বসে রইল পা ঝুলিয়ে। কিছুক্ষণ পর সন্তর্পণে দরজা খুলে বেরিয়ে সিঁড়ির কাছে গিয়ে উৎকর্ণ হল। কোনোরকম শব্দ, এমনকী কথা বলার ফিসফাসও শুনতে পেল না। ছমছম করল তার বুকের মধ্যে। ধীরে ধীরে সে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
রাধাচূড়া গাছটার ফাঁক দিয়ে সে রাস্তার দিকে তাকিয়ে। দু-দিক থেকে দুটো ট্রাম এসে চলে গেল। গাছের ডালে বুলবুলি ফুড়ুৎ ফুড়ৎ উড়ছে। শালিক আর কাকও সে লক্ষ করল কিন্তু কোনো কিছুই তার মনের উপর বসছে না।
প্রচন্ড গরম আর রোদের ঝাঁঝের জন্য দেবু বেশিক্ষণ দূরের দিকে তাকাতে পারছে না। বাতাসে গাছের পাতা নড়লেও দরদরে ঘাম তার কনুই আর ঘাড় বেয়ে নামছে। বারান্দায় এখনও রোদ পড়েনি। ঘামে সপসপে গেঞ্জিটা খুলে দেবু পা ছড়িয়ে বসল।
লিজার অপারেশন হচ্ছে। ব্যাপারটা কতটা গুরুতর সে-সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। তবে অপারেশন শব্দটা অনেক বারই শুনেছে। ক্লাসের পুণ্যব্রত আগে বলেছিল তার মায়ের পেটে পাথর হয়েছিল, অপারেশন করে বার করে নেওয়া হয়। ছোটোপিসিমার পা ভেঙেছিল গাড়ির ধাক্কায়, হাড় সেট করতে অপারেশন করতে হয়েছিল। এখন দিব্যি চলাফেরা করে। সুকুমারদার বাবার চোখে কী হয়েছে, তার গ্রামের ডাক্তার বলেছে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে অপারেশন করালে সেরে যাবে। অনেক টাকার ধাক্কা।
দুই হাউজিং-এর সীমানা-পাঁচিলের বাইরে জমে থাকা ভাঙা ইট সিমেন্ট আর জঞ্জালের স্কুপের উপর কিলবিল করে উঠল কয়েকটা প্রাণী। দেবু গলা লম্বা করে সিধে হয়ে বসল। আরে, ওগুলো তো কুকুরছানা!
এরা কোথা থেকে এল। দেবু বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে গুনতে শুরু করল, এক দুই, তিন…চার, পাঁচ…ছয়!
রংগুলো সাদার ওপর ব্রাউন আর কালো। হয়তো ডাকছে কিন্তু এতদূর থেকে দেবু শুনতে পাচ্ছে না। ব্যস্ত চঞ্চল হয়ে ওরা চেষ্টা করছে জঞ্জাল থেকে নামতে। মনে হচ্ছে ভালো করে চোখ ফোটেনি, নিজেদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হচ্ছে। একটা তো গড়িয়ে পড়েই গেল। ওঠার জন্য চেষ্টা করছে কিন্তু পায়ে জোর নেই। এমনকী চার পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে টলছে।
আশ্চর্য তো। এগুলো এল কোথা থেকে? কালকেও তো সে বারান্দা থেকে এদিকে তাকিয়েছে, চোখে তো পড়েনি। কার ছানা? এদের মা কে? দেবু সব কিছু ভুলে, কুকুরছানাগুলোর প্রতি তার মন নিবদ্ধ করল।
কান লেজ আর পিঠের কিছু অংশ কালো, এমন একটা সাদা কুকুর ধীরে ধীরে ছানাগুলোর দিকে এগিয়ে এল। পেটটা ঝুলে রয়েছে। দেবু স্তনের বোঁটাগুলো দেখতে পাচ্ছে। কুকুরটাকে সে স্কুলে যাবার সময় রোজ দেখেছে। জুয়েল কেটারিং-এর দোকান থেকে চিত্তরঞ্জন সুইটস পর্যন্ত পাঁচ ছ-টা বাড়ির সামনের রাস্তায় যে তিন-চারটে কুকুর বসে থাকে, ঘুমোয় আর অন্য কুকুরদের সঙ্গে মারামারি করে, তাদের মধ্যে দেবু একেও দেখেছে। একে সে চেনে।
একদিন লিজার ভিটামিন ট্যাবলেট ফুরিয়ে যাওয়ায় সুকুমার কিনতে যাচ্ছিল। দোকানে ওষুধ ছাড়াও অনেকরকম জিনিস বিক্রি হয়। একধারে আছে সিন্দুকের মতো একটা ডিপ ফ্রিজের বাক্স। সফট ড্রিঙ্কসের বোতল আর আইসক্রিম তাতে রাখা আছে। মা-র কাছ থেকে টাকা নিয়ে দেবু আর মিঠু সুকুমারের সঙ্গে যায়।
ওরা কাঠের চামচ দিয়ে খেতে খেতে বাড়ি ফিরছিল। পাশে পাশে হাঁটছিল একটা কুকুর। মজা করার জন্য মিঠু একটু আইসক্রিম চামচ থেকে উঁচু করে ফেলল। কুকুরটা তৈরি ছিল না, তাই রাস্তায় পড়ল কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই চেটে নিল। এরপর আরও পাবার আশায় চলতে চলতে মুখ তুলে বার বার সে মিঠুর দিকে তাকাতে লাগল। কিন্তু মিঠু আর ওকে খাওয়াতে রাজি নয়।
দে-না ওকে। দেবু বলেছিল।
আহাহা, তুমি দাও-না। এইটুকু তো কৌটো। একটা খেয়ে কি কিছু হয়?
ঠিক এই সময়ই দেবু হোঁচট খেল একটা ইটে আর পড়তে পড়তে নিজেকে সামলালেও আইসক্রিমের প্লাস্টিকের কৌটোটা হাত থেকে ছিটকে রাস্তায় পড়ল। সবাই দাঁড়িয়ে গেছে। কুকুরটাও। কিন্তু তাড়াতাড়ি চেটে খেয়ে নেবার বদলে সে দেবুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। সেই সময় দেবু কুকুরটার চোখে কেমন একটা দুঃখ পাওয়ার মতো ভাব যেন দেখতে পায়। তখন ছুটে এসে আর একটা কুকুর জিভ দিয়ে আইসক্রিমটা চেটে নিতে নিতেই গোঁ গোঁ শব্দ করে ভয় দেখাল। কেউ যেন, এমনকী অন্য কুকুরটাও যেন তার খাবারে ভাগ না বসায়।
