না না, অফিস যাওয়ার কথাই ওঠে না। ইসস কী কষ্ট পাচ্ছে দ্যাখো তো!
আমরাই-বা আর কী করতে পারি।
সুকুমার চুপ করে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। বিমান তাকে বলল, দেবু আর মিঠু যেন নীচে নামে দেখিস। আর রান্নাবান্না আজ আর করে দরকার নেই। তুই বরং— বিমান তাকাল দীপালির দিকে।
যা গরম পড়েছে, দই-চিঁড়ে আর আম নিয়ে আসুক। দীপালি বলল।
আমিও তাই বলতে যাচ্ছিলুম। কাল ম্যাক্সিমাম ছিল, থার্টি এইট পয়েন্ট ফোর, হিউমিডিটি নাইনটি থ্রি পারসেন্ট। অসহনীয়, অসহ্য…রিচ রান্নাবান্না এখন থাক।
বিমান ঘর থেকে বেরিয়ে দেখল, ভাইবোন সিঁড়িতে বিষণ্ণ মুখে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে।
দেবু মিঠু, তোমরা কিন্তু এক-তলায় একদম নামবে না, সিঁড়ি থেকে উঁকিঝুঁকিও নয়। যাও, ওপরে যাও। লিজার বাচ্চা হওয়ার পর নামবে, তার আগে নয়।
বাবা, কখন হবে? দেবু বলল।
ডাক্তারবাবুকে আনতে যাচ্ছি।
ঘর থেকে কাতরানি ভেসে এল। সঙ্গে সঙ্গে দীপালির উদবিগ্ন অনুরোধ, তুমি আর দেরি কোরো না। কী রকম যেন করছে।
যাচ্ছি। বিমান তাকাল ছেলে মেয়ের দিকে। তারা গুটিগুটি দোতলায় উঠে গেল। দোতলার বাথরুমের পাশ দিয়ে গেলে পশ্চিমের বারান্দা। সেখানে দাঁড়ালে, রাধাচূড়া গাছের ডাল-পাতার ফাঁক দিয়ে বাস, মোটর, অটোরিকশার চলাচল দেখা যায়। আরও দূরে দেখা যায় ট্রেন। বাড়িটার পিছনে এলিট আর স্কাইলাইন নামে দুটো হাউজিং-এর সীমানা পাঁচিলের সংযোগ যেখানে হয়েছে তার পাশেই প্রায় বিঘা পাঁচেক সরকারি জমি। কিছু-একটা ইমারত হয়তো সেখানে একদিন উঠবে। আপাতত পাঁচিলের ধারে দুই হাউজিং-এর ভাঙা ইট, সিমেন্টের চাঙড় আর যাবতীয় আবর্জনার কয়েকটা ঢিপি তৈরি হয়ে গেছে।
সরকারি চাকুরি থেকে অবসর নেওয়া পাশের বাড়ির জগদীশবাবু রবারের নল দিয়ে তাঁর ছোটো বাগানটিতে জল ছিটোচ্ছেন। গোলাপের শখ। মুখ তুলে বারান্দার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী গো দেবুবাবু, লিজার বাচ্চা হল?
দেবুর আগেই মিঠু বলে উঠল বাবা ডাক্তারবাবুকে আনতে গেছে। লিজার খুব কষ্ট হচ্ছে তো।
তাই নাকি? আহা, বেচারা।
জগদীশবাবু আবার জল দেওয়ার কাজে ব্যস্ত হলেন। ওরা তা দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ পর দেবু বলল, কাল-পরশুই তো বৃষ্টি নামবে, তাহলে আর জল দিচ্ছেন কেন?
কে বলল বৃষ্টি নামবে?
বাবা। কাগজে লিখেছে আর আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যেই এসে যাবে।
আসুক তো আগে। জগদীশবাবু কাজে মন দিলেন তবে বিব্রত মুখে।
দাদা এবারও যদি গতবারের মতো তেমন বৃষ্টি হয়? মাছ ধরবি?
গত বছর টানা তিন দিন প্রায় না থেমে বৃষ্টি হয়েছিল। চারদিকের রাস্তায় কোথাও কোথাও জল বয়স্কদের কোমরেরও উপর উঠে যায়। কাছেই একটা গোরস্থান, তার মধ্যে ছোটো ছোটো ছেলেরা গামছা আর একটু বোরা মশারি দিয়ে মাছ ধরতে শুরু করে। দুপুরে দেবু আর মিঠু বারান্দা থেকে তাই দেখছিল। অবশেষে এই দুর্লভ মজা থেকে নিজেদের বঞ্চিত করে রাখার যথাসাধ্য চেষ্টায় আর নিযুক্ত না থেকে, দুজনে বাথরুমে কাচার জন্য রেখে দেওয়া মায়ের হাউসকোটটা হাতে নিয়ে চুপি চুপি নীচে নেমে আসে।
একটি মাছও তারা ধরতে পারেনি। তবে কিছু আদুড় গায়ে ছেলে-মেয়ের সঙ্গে অনেকক্ষণ হইচই করে তারা বুঝতে পেরেছিল বাড়ির বাইরে আলাদা ধরনের একটা জগৎ অপেক্ষা করছে, বেশ কঠিন আর মজাদার। দেবুর হাত থেকে হাউসকোটটা ছিনিয়ে নিয়ে দুটি ছেলে মাছ ধরতে শুরু করে। খুদে খুদে পাঁচ-ছটা ট্যাংরা আর বেলে পেয়েছিল। একটা টিনের মধ্যে সেগুলো রেখে তারা হাউসকোটটা ছুড়ে দিয়ে বলেছিল, যা ভাগ এবার, আর এগোলে ডুবে যাবি।
যেমনভাবে গেছল, তেমনি চুপি চুপি ওরা বাড়ি ফিরে আসে। মিঠু ভিজে হাউসকোটটা মুখের কাছে ধরে বলেছিল, দাদা এঁকে দ্যাখ, মাছের গন্ধ! দেবু নাকে চেপে ধরে বড়ো বড়ো শ্বাস নিয়ে বলেছিল, মনে হচ্ছে।
দুজনে অবাক চোখে মেঝেয় পড়ে থাকা বস্ত্রটির দিকে তাকিয়ে থাকে আর লিজা তখন দরজার বাইরে থেকে দেখছিল ওদের মুখ। লিজাটা ভাগ্যিস মানুষ না। তাহলে মাকে বলে দিত। মিঠু বলেছিল।
এবার মাছ ধরব না।
কেন রে?
এমনিই।
মাছধরা খুব শক্ত। মিঠু তার সিদ্ধান্ত জানায়।
জগদীশবাবু চেঁচিয়ে জানতে চাইলেন, সামার ভেকেশন কবে শেষ হবে?
ছাব্বিশে জুন, দেবু জবাব দিয়েই মিঠুকে বলল, বাবা আসছে।
দুজনে বারান্দার গ্রিল থেকে যতটা সম্ভব ঝুঁকে দেখল, বিমান এবং সঙ্গে আর একজন ব্যস্ত হয়ে গাড়ি থেকে নামল।
লিজার এবার কটা বাচ্চা হবে বল তো দাদা?
আটটা।
এমনি, আন্দাজে, আগের বারও আটটা হয়েছিল না?
সব বিক্রি করে দিল। এবার বাবাকে বলবি একটা বাচ্চা রেখে দিতে?
তুই বলিস বাবাকে।
না।
দেবু বোনের মুখের ভাব লক্ষ করে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলল, এক-একটা বাচ্চার দাম কত জানিস? দেড় হাজার, দু-হাজার টাকা। লিজার পেডিগ্রি আছে-না?
পেডিগ্রি কী রে দাদা?
ফাঁপরে পড়ে যাওয়াটা লুকোবার জন্য দেবু বলল, এসব কথা একদম বলাবলি করবি না। সেদিন বটুকদাকে বাবা বলল-না, তোমাদের এই উঁচুজাত, বড়ো বংশ, বড়ো ঘরের, গল্পোগুলো এবার বন্ধ করো। বড়োলোকি কথাবার্তা বাবা খুব অপছন্দ করে।
লিজা খুব বড়োলোক?
জানি না, আমি তো আর জার্মানিতে গিয়ে লিজার বাড়ি দেখে আসিনি।
আচ্ছা, জার্মানি থেকে প্লেনে এল কী করে বল তো, যদি কাউকে কামড়ে দিত?
কত বার তো শুনেছিস একটা ফাইবার গ্লাসের বাক্সের মধ্যে করে মদনকাকু এনেছিল। অ্যাই, এক বার সিঁড়িতে গিয়ে দেখে আসবি?
