আশপাশের বাড়িতেও জেনে গেছে। কিছুদিন হাসাহাসি করে তারা ভুলে গেল। প্রতিদিনই কল থেকে জল বেরিয়ে আসছে, পূর্ণিমা তাই দেখে দেখে এখন বিরক্ত। বিশ্বনাথকে বলল, জল কি আর বন্ধ হবে না?
তোমার তাই নিয়ে ভাবনা করার কী? তিন-চার মাসের তো স্টক হয়েই গেছে।
স্তিমিত ক্লান্ত কণ্ঠে সে বলল, কাজে না লাগলে জমানোর কোনো মানেই হয় না।
এই কথার দু-দিন পরেই ভোরে কাগজ দেখতে দেখতে পূর্ণিমা চিৎকার করে উঠল, হয়েছে হয়েছে, ওগো, শুনছ, ওরে বাসু…সোমবার সকালে জল আসবে না।
কাগজ হাতে সে ছুটে উঠোনে এল। সুপ্রিয়া কলে মুখ ধুচ্ছে। পূর্ণিমা চেঁচিয়ে প্রায় সারা বাড়িকে শুনিয়ে বলল, সোমবার সকালে জল আসবে না গো।।
অদ্ভুত এক সুখ পূর্ণিমাকে গ্রাস করেছে। তিন দিন পর সোমবার। তিনটে দিন সে তীব্রভাবে অপেক্ষা করল। তার ঘর ভরে আছে জলে, সে নিজেও ভরে যাচ্ছে কানায় কানায়। এতদিন ধরে ধিকিধিকি যে দুঃখ তাকে পোড়াচ্ছে এইবার তা নিভবে। উদাসীন চোখে সে দেখল অন্যান্যদের ব্যস্ততা, ক্ষোভ, উৎকণ্ঠা, ভাবনা। অলসভাবে সংসারের কাজ করে গেল এবং মাঝে মাঝেই উজ্জ্বল হয়ে মৃদু হাসিতে তার মুখ ভরে যাচ্ছিল। বহুদিন ধরে সে অপেক্ষা করেছে এই দিনটির জন্য।
জল তুলে রাখবে না বউদি?
দরকার নেই।
সোমবার সকাল থেকে কলকাতায় কলের জল নেই। বড়ো জালা থেকে পূর্ণিমা সংসারের জন্য জল ব্যবহার শুরু করল। স্নান বন্ধ, কলাপাতায় খাওয়া। বাসু চাপাকলের জলও আনল। অস্বাচ্ছন্দ্য রয়েছে কিন্তু যেন বিরাট নিরুদবিগ্নতাকে আরও উপভোগ্য করার জন্য। বার বার সে জলের পাত্রগুলোর গায়ে হাত বোলাল, বার বার তাকিয়ে দেখল। এইবার সে তৈরি হয়ে রয়েছে।
দুপুর থেকে সে উৎকণ্ঠার সঙ্গে তাকিয়ে রইল কলের দিকে। জল আসার সময় পেরিয়ে যেতে সে সুখবোধ করল। জল আসেনি। যেন তার মুখ চেয়েই মসৃণভাবে প্রহর গড়িয়ে চলেছে।
এক বেলার জন্য বলেছিল, কথার কোনো দাম নেই গো, কত বেলা যে লেগে যাবে জল আসতে তার কি ঠিক আছে?
সুপ্রিয়া সন্ধ্যায় সময় সদরে ধুনো দিতে এসে বিমর্ষ কণ্ঠে পূর্ণিমাকে বলল, তোমার আর কী, ঘরে টালার ট্যাঙ্ক নিয়ে দিব্যি তো কাটিয়ে যাবে।
রাত্রে সে বিশ্বনাথকে বলল, তোমার কী মনে হয়, এবার কত দিন চলবে?
বিশ্বনাথ দু-চার দিনের বেশি নয় বলায় পূর্ণিমা ক্ষুব্ধ হল। পাশ ফিরতে ফিরতে সে শুধু বলল, দেখা যাক।
মঙ্গলবার সকালে ঘুম ভাঙার পর আধা জাগরণ, আধা অচেতন অবস্থায় পূর্ণিমা ক্ষীণভাবে একটানা একটা শব্দ শুনতে পেল। শব্দটা বেড়ে উঠতে উঠতে তার মাথার মধ্যে ঝম ঝম কড়া নাড়ার মতো আওয়াজ করে উঠল। ধড়মড়িয়ে সে উঠে বসল।
কলে জল এসে গেছে।
বাব্বাঃ বাঁচালে…ধরেই রেখেছিলুম এবারও ভোগাবে!
তবু কিছুটা কথা রেখেছে…ওরে নিমাই বালতিটা নিয়ে এবার নাম বাবা।
পূর্ণিমা পাথরের মতো বিছানায় বসে রইল। ঘরের বাইরের পৃথিবীটা প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিকভাবেই শুরু হয়ে গেছে, কিন্তু তার নিজের জগৎ চুরমার হয়ে ভেঙে ভেঙে পড়েছে।
ঘরের দরজা খুলে সে বাইরে এল। ভরা বালতি হাতে নিমাই দোতলার সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছে, সুপ্রিয়া উবু হয়ে উনুন সাজাচ্ছে, কলে বালতি পেতে মিনু ঘাড় হেঁটে করে দাঁড়িয়ে, দোতলা থেকে বাড়িওয়ালার জিবছোলার শব্দ আসছে। পূর্ণিমার মনে হল তার অভ্যস্ত এই দৃশ্য থেকে সে ছিটকে বেরিয়ে গেছে। এখন যেন সে ছেড়া ব্লাউজের উপর শার্ট আর শায়া পরে সারা মুখে মাটিলেপা অবস্থায় অনুভবহীন শূন্যতার মধ্যে। এইভাবেই কি তাকে দিনযাপন করতে হবে?
পূর্ণিমা দ্রুত সরে এল। ওরা তাকে দেখতে পায়নি। রান্নাঘরে ঢুকে সন্তর্পণে দরজা বন্ধ করে খিল তুলে দিল। বাটনবাটার নোড়া দিয়ে ঠুকে ঠুকে জালার তলায় ঘা দিতেই ফুটো থেকে ছিটকে জল বেরিয়ে তার পা ভিজিয়ে দিল।
ঘরের নর্দমার মুখে জলের ঘূর্ণি আর বক বক শব্দটা তাকে অসম্ভব অবাক করে দিল।
জালি
ভোর থেকেই বাড়িতে উদবিগ্ন ব্যস্ততা। ফিসফাস কথা, বিষণ্ণ চাহনি, পা টিপে টিপে চলাফেরা। এক-তলায় সিঁড়ির পাশের ঘর থেকে একটা কাতর একটানা গোঙানি ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে সেটা তীক্ষ্ণ হয়ে সিঁড়ির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকা ভাইবোন, দেবু আর মিঠুকে কান্নার কিনারে ঠেলে দিচ্ছে। মিঠু তার দাদার গা ঘেঁষে সরে এসে কিছু-একটা বলতে যাচ্ছিল, দেবু নিজের ঠোঁটে একটা আঙুল চেপে হিস-হিস করে উঠল। তা সত্ত্বেও মিঠু বলে ফেলল, ঠিক মানুষের গলায় চ্যাঁচাচ্ছে, নারে? আমার কেমন যেন কষ্ট হচ্ছে শুনতে।
নীচের ঘরে তখন ওদের মা দীপালি, বাবা বিমান আর চাকর সুকুমার। ঘরে পাখা নেই তাই দোতলা থেকে টেবিল-ফ্যানটা আনা হয়েছে। সেটা একটানা ভোমরা ডেকে যাচ্ছে। মেঝেয় সতরঞ্চিতে শুয়ে আছে একটি অ্যালসেশিয়ান কুকুর। পাখার হাওয়া তার ধূসর মেশানো কালো লোমে কাঁপুনি তুলছে। গত তিন দিন ধরে সে প্রসবযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। লিজা, লিজা..লক্ষ্মীমেয়ে, সব ঠিক হয়ে যাবে। ডাক্তারবাবু আসছেন তোমার কিছু ভয় নেই। সোনা আমার…আর একটু কষ্ট সহ্য করো তো মা। লিজার গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে দীপালির স্বর বেদনায় রুদ্ধ হয়ে এল।
পরশুদিনই ডাক্তারকে খবর দিলে ভালো হত। বিমান আফশোস করল।
তুমি গাড়িটা নিয়ে যাও-না, একেবারে সঙ্গে করেই তাহলে আনতে পারবে।
তাই যাই।
আজ আর অফিস যেয়ো না।
