প্রতিবাদ প্রকাশ করতে পারল না।
বিশ্বনাথ এতক্ষণ সেই রাস্তার বাঁকেই অপেক্ষা করছিল। পূর্ণিমা সঙ্গে সঙ্গে ফিরে না আসায় সে ধরে নেয় দুটো বালতি ভরার জন্যই সময় লাগছে। স্বস্তি বোধ হতেই সে সিগারেট কিনল সামনের দোকান থেকে। দড়ির আগুন সিগারেটে যখন লাগাচ্ছে তখন কানে এল—বস্তিতে একটা মেয়েলোক জল নিতে এসেছে তাকে ধরে সবাই যা ঝাড় দিচ্ছে-না–শোনামাত্র সে ছুটে গেছে।
শাড়িটা দিন।
বিশ্বনাথ ভিড়ের মুখের দিকে তাকাল। শাড়ির জন্য কেউ ব্যস্ততা দেখাল না। বালতি দুটোরও হদিস নেই। ভিড় ক্রমশ পাতলা হয়ে যাচ্ছে।
শাড়িটা ফিরিয়ে দিন।
বিশ্বনাথ প্রার্থনার মতো দু-হাত মুঠো করে মেয়েদের দিকে তাকাল।
শাড়ি না হলে ও যাবে কী করে?
কেন শায়া তো রয়েছে।
বিভ্রান্ত চোখে বিশ্বনাথ তাকিয়ে রইল মাটিতে উবুড় হয়ে থাকা তার স্ত্রীর দেহের দিকে। নিজের শার্টটা খুলে পূর্ণিমার পিঠের উপর রেখে বলল, চলো বাড়ি যাই।
পূর্ণিমার ঘাড় আর গাল থেকে রক্ত ঝরছে। ফালা দেওয়া ব্লাউজের ফাঁক দিয়ে চামড়ায় রক্তের ছড় দেখা যাচ্ছে। চোখের জল আর মাটিতে মুখ লেপা। বিশ্বনাথ রুমাল দিয়ে মুখটা মুছে দিল। তখনও সে ঠকঠক করে কাঁপছে।
ওরা বাড়ি ফিরে এল। শার্ট আর শায়াপরা পূর্ণিমাকে রাস্তার দু-ধারের কৌতূহলী চোখ দেখছিল, কিন্তু তাই নিয়ে বিব্রত বা লজ্জিত হবার মতো বোধক্ষমতা তাদের ছিল না। অপমান, রাগ, দুঃখ কিছুর দ্বারাই ওরা পীড়িত হয়নি। অনুভবহীন, শব্দহীন শূন্যতার মধ্য দিয়ে দুজনে ফিরে এল।
সেই রাত্রেই কলে জল এল। বালতি বসাবার জন্য যখন হুড়োহুড়ি চলছে পূর্ণিমা তখন বিছানায় কাঁপছে জ্বরের তাড়সে।
দিন দশেক পর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে বিশ্বনাথ দেখল রান্নাঘরের প্রায় সিকিভাগ জুড়ে রয়েছে দুটো জালা, যার মধ্যে একটা মানুষ উবু হয়ে থাকতে পারে।
দুপুরে বাজারে গিয়ে কিনে আনলুম। তিরিশ টাকা পড়ল, এক টাকা মুটে। এবার জল জমাব।
জলের ক্রাইসিস কি ঘন ঘন হয় যে চাল বা কেরোসিনের মতো জমিয়ে রাখবে।
যদি দু-বছর, চার বছর, দশ বছর পরও হয় তবুও… রাগটা যন্ত্রণার চাপে পূর্ণিমার গলায় আটকে গেল। বিশ্বনাথ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল।
পূর্ণিমা প্রতিদিন এক বালতি করে জল দুটি জালায় ঢালতে লাগল। সকালের প্রথম বালতির এবং বিকালের প্রথম বালতির জল। এজন্য সংসারে ব্যবহারের জন্য জলের পরিমাণ তাকে কমাতে হল। চায়ের জন্য বাসু একদিন দু-বাটি জল জালা থেকে নেওয়ায় চড় খেল। দিনে তিন চার বার সে সরা তুলে দেখে কতটা ভরল।
একদিন জালা দুটি ভরে গেল। পূর্ণিমা দুটি ছোটো ছোটো জালা কিনে বড়ো দুটির মুখের উপর বসিয়ে দিল।
এতে ক-দিন চলবে? একদিন বিশ্বনাথ জিজ্ঞাসা করল।
পূর্ণিমা মনে মনে হিসেব করে বলল, দু-সপ্তাহ চলবে শুধু খাওয়া আর রান্নার জন্য, তবে নির্ভর করছে কীভাবে খরচ করবে। বাসনমাজা, কাচাকাচি, ঘরমোছা চলবে না।
তোমার টার্গেট কত?
আমার টার্গেট নেই।
অবশেষে ছোটো জালা দুটোও ভরে গেল। রান্নাঘরে আর জায়গা নেই। দালানটা অরক্ষিত। শোবার ঘরে রাখা যায় কি না, পূর্ণিমা তাই নিয়ে কয়েক দিন চিন্তা করল। একদিন সে বিশ্বনাথের কাছে জানতে চাইল, বড়ো বড়ো ঘিয়ের টিন কোথায় পাওয়া যায়?
কেন জল রাখবে বলে? টিনে মরচে পড়ে তো ফুটো হয়ে যাবে।
ছাদে কয়েকটা ইট পড়েছিল। কয়েকটা আঁচলের আড়াল দিয়ে নামিয়ে এনে পূর্ণিমা শোবার খাটটাকে উঁচু করল। এরপর মাটির কলসি কিনে জল ভরে খাটের নীচে রাখতে লাগল।
শুধু জল আর জল রাখার পাত্র ছাড়া পূর্ণিমার আর কিছু কথা বলার নেই। বাড়ির বাইরে গেলে ছটফট করে ফেরার জন্য। তার ভয় জালা বা কলসি যদি কেউ ভেঙে ফেলে। খড়ি দিয়ে ওগুলোর গায়ে কেনার তারিখ লিখে রেখেছে। কোনটি থেকে প্রথম খরচ করবে, তারপর কোনটি, তারপর কোনটি, মনে মনে সে পাত্রগুলিকে সাজিয়ে ফেলেছে। কোন কাজের জন্য কোনটি থেকে জল খরচ করবে তাও সে ঠিক করে রেখেছে। দু-তিনটি পাত্রের তলা থেকে জল চুইয়েছিল। দোকান থেকে পুডিং এনে লাগিয়েছে। কী এক ঘোরের মধ্যে তার দিন এবং রাত কেটে যায় এই জল নিয়ে। এক-এক সময় সে বিড়বিড় করে হিসেব করে। বাসুকে বলে, চানটানের কথাই ওঠে না। হাতধােয়া আর কুলকুচোর জন্য এক বাটি তার মানে তিন জনের জন্য তিন বাটি, দু-বেলায় ছ-বাটি। বুবুনের কাঁথা প্রথম দু-তিন দিন রোদে শুকিয়ে নিতে হবে…গন্ধ হবে তো কী আর করা যাবে। বাজারের আনাজ ধােয়ার জন্য এক গামলা…হবে না রে?
এখন সে সকালে খবরের কাগজের জন্য অপেক্ষা করে। বিশ্বনাথের হাতে দেবার আগে খুঁটিয়ে দেখে, জল সরবরাহ বন্ধের খবরের জন্য।
বাড়ির সকলে জেনে গেছে তার জল-জমানোর ব্যাপারটা। উপরের মাসিমা একদিন এসে তার জলভান্ডার দেখে গেল।
তাকগুলো খালি কেন? বোতলে ভরে ভরে রেখে দাও। ঠাট্টা করেই কথাগুলো বলা, কিন্তু পূর্ণিমার কানে সেটা বিচক্ষণ পরামর্শ মনে হল। শিশি-বোতলওলার দোকান থেকে সে দশটি বোতল কিনে জল ভরে তাকে রাখল।
সুপ্রিয়া মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে যায়। একদিন বলল, তুমি তো বাপু ছোটোখাটো টালার ট্যাঙ্ক করে ফেলেছ। এবার জল বন্ধ হলে তোমার কাছেই হাত পাতব, দেবে তো? অবশ্য পয়সা দিয়েই নোব।।
পয়সা শব্দটা পূর্ণিমার মাথায় ভারী হাতুড়ির মতো পড়ল এবং অবশ করে দিল। সারা দিন সে কথা বলল না, থালায় ভাত ফেলে রেখে উঠে পড়ল। অকারণে বার বার তার কান্না পেল।
