বিশ্বনাথ রান্নায় ব্যস্ত, পূর্ণিমাকে বলল, জল ধরে রেখেছ তো?
খাবার জল দু-বালতি রেখেছি, হবে না ওতে? কাল সকাল পর্যন্ত তো। রাস্তার টিউবয়েল থেকে দরকার হলে বাসু এনে দেবে।
সেটা তো কতদিন ধরে খারাপ হয়ে রয়েছে, ওদিকে চৌবাচ্চা খালি করে ওরা জল নিয়ে গেল।
তাহলে চটপট তুমি কলঘরে ঢুকে পড়ো, চানটা করে নাও। দেখলে তো কেমন স্বার্থপরের মতো নিজেরা চৌবাচ্চার সব জল নিল? যেন ওরা ছাড়া এ বাড়িতে আর কেউ নেই।
বুধবার বিকেলে কলে জল এল না। চৌবাচ্চা শুকনো। রাতে সকড়ি বাসন জলে ভিজিয়ে রাখা পূর্ণিমার অভ্যাস। তুলে রাখা দু-বালতি জলের একটি থেকে অর্ধেক খরচ হয়ে গেছে। তাই থেকে দু-গ্লাস জলে গামছা ভিজিয়ে গা মুছল। ভ্যাপসা গরমের জন্য বিশ্বনাথ পাখার নীচে মেঝেয় শোয়। ন্যাতা ভিজিয়ে মেঝে মুছতেও এক গ্লাস খরচ হল। প্রতিদিনের মতো দাঁত ব্রাশ করার জন্য বিশ্বনাথের দু-গ্লাস জল দরকার হল। বালতিটায় তারপর আর কিছু রইল না।
আর এক বালতি তো রইল।
পূর্ণিমার নিশ্চিন্ত মুখে বিশ্বনাথ অনিশ্চিত চাহনি রেখে বলল, কিন্তু সকালে যদি জল না আসে?
পরদিন সকালে জল এল না।
পূর্ণিমার হতভম্ব অবস্থাটা কেটে যেতেই কথার খেলাপ করার জন্য কর্পোরেশনের উপর রেগে উঠল। সংসারের নিত্যকর্মগুলো শুরু করতে গিয়ে ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। এক বালতি জল কোন কর্মে লাগবে।
বিশ্বনাথ একটা বালতি নিয়ে কোনো কথা না বলে বেরিয়ে গেল। আধ ঘণ্টা পর আধ বালতি জল নিয়ে ফিরল।
কী লাইন আর কী ঝগড়া রে বাবা!
কোথায় গেছলে?
এই পিছনে বাজার যাবার পথে যে-বস্তিটা। ওরা নিতে দিচ্ছিল না, অনেক বলে-কয়ে আধ বালতি নিতে দিল।
চান তো হবে না, তুমি বরং এটা নিয়ে পায়খানায় যাও।
আর তুমি, বাসু?
সে যাহোক করে হয়ে যাবে, তোমাকে তো এখন বেরোতে হবে।
তাহলে থাক, আমি হোটেলেই সব সেরে নেব। ওখানে নিজেদের জলের ব্যবস্থা আছে।
বাজার থেকে কলাপাতা এনো।
বুবুনকে কোলে নিয়ে বাসু শুনছিল, বলল, বউদি চাপাকল থেকে জল আনব?
রাস্তার ওই নোংরা জল, ম্যাগা!
গঙ্গার জল তো, কত লোক নিচ্ছে।
নিক গে, বিকেলেই জল এসে যাবে।
বিকেলে জল এল না। কলের নীচে বালতি রেখে পূর্ণিমা দুপুর থেকে অপেক্ষা করেছে, সেঁকুর তুলে সর্দি ঝাড়ার মতো শব্দ কখনো বেরিয়ে আসে।
বালতি পেতে কোনো লাভ নেই গো৷ উঠোনের ওধার থেকে সুপ্রিয়া বলল, এরকম আগেও তো হয়েছে, এক বেলা বলে চার বেলা, একদিন বলে তিন দিন। এবার কতদিন চলবে তার কি ঠিক আছে। আমি বাবা কাল সকালটা দেখব, এল তো ভালোই নইলে শিবপুরে দিদির বাড়ি চলে যাব।
পূর্ণিমা শুনেই গেল। কলকাতার ত্রিশ-চল্লিশ মাইলের মধ্যে তার কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। এখন তার শরীরে টোকো গন্ধ। জষ্টি মাসের গরম, বাতাসও বইছে না। এক-তলার ঘরে দরদর ঘামের সঙ্গে ধুলো মিশে চামড়ার উপর কাদার পরত ফেলেছে। সারাদেহে চিটচিটে অস্বস্তি। পায়খানায় যেতে পারেনি, তলপেটে একটা গুমোট ক্রমান্বয়ে চাপ দিচ্ছে।
বুবুনের জন্য দুধ তৈরি করতে হবে কিন্তু জল রয়েছে বড়জোর এক গ্লাস। তেষ্টায় পূর্ণিমার ছাতি ফেটে যাবার মতো অবস্থা অথচ জলটুকু সে খেতে পারছে না, বুবুনের বেবিফুড গুলতে দরকার। সুপ্রিয়ার কাছে এক গ্লাস চাইতেই সে পরিষ্কার বলে দিল, না ভাই, জল এখন চাওয়াচাওয়ি কোরো না। দুপুরে মিনুর বাবা মারামারি করে টিউকল থেকে এক বালতি এনে দিয়েছে…আমাদেরও তো দরকার লাগবে।
গেলাস নিয়ে সে দোতলায় গেছল। মাসিমা বিষগ্ন কণ্ঠে বললে, পোড়া কপাল, দুপুর থেকে গলা ভেজাবার মতো জলও নেই। নিমাই একটা ভারীকে ধরেছিল এক টিন জলের জন্য, ব্যাটা বলে দিল দিতে পারব না। তিন গুণ চার গুণ দাম দিয়ে দোকানদাররা যে নিচ্ছে!
পূর্ণিমা মুখ কালো করে নীচে নেমে এসে দেখল বাসু চাপাকল থেকে বালতি ভরে জল এনে পায়খানার দিকে যাচ্ছে। তাকে দেখেই কুঁকড়ে গেল। তারপর করুণ স্বরে বলল, বউদি আমি আর পারছি না।
দুর্বল স্বরে পূর্ণিমা বলল, সবটা খরচ করিসনি, আমার লাগবে।
সন্ধ্যায় বিশ্বনাথ ফিরল বেশ উদবেগ নিয়েই। শুনছি জল নাকি অনেক দিন পাওয়া যাবে না। পাইপ না ভালভ কী যেন বদলাতে গিয়ে সব ভেঙে পড়েছে, আবার নতুন করে বসাতে হবে।
পূর্ণিমা ফ্যালফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে। সে আবার বলল, হোটেলে নোটিশ দিয়েছে এমপ্লয়িরা চান করতে পারবে না। আমি অবশ্য একটা খালি রুমে ঢুকে ম্যানেজ করে নিয়েছি।।
বাসু বলল, আমাদের এক ফোঁটা জলও নেই। বউদি খাবার জন্য এক গ্লাস জল চাইতে গেছল, নীচে ওপরে কেউ দিল না, আমি পাশের বাড়ি থেকে দু-গ্লাস জল আনলুম, ওরা লোক খুব ভালো!
বিশ্বনাথ ঈষৎ অপ্রতিভ হয়ে সে কী! বলে এক ঝটকায় দুটো প্লাস্টিকের বালতি তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল এবং মিনিট পনেরো পর ফিরে এল খালি বালতি নিয়েই।
চলো তো আমার সঙ্গে, ওরা নিতে দেবে না। মেয়েছেলে দেখলে হয়তো ছেড়ে দেবে…বেশি দূর তো নয়, বস্তিতে ঢুকে সোজা কুড়ি-পঁচিশ পা এগোলেই টিউবওয়েলটা।
গলির তিনটি বাঁক ঘুরেই ডান দিকে পড়ে কয়েকটা টালি। টিন আর খোলার চালের দোকান ঘর, উলটোদিকে ডালখোলা। মুদি আর তেলেভাজা দোকানের মাঝে বট গাছের ধার দিয়ে সাত-আট হাত চওড়া কাঁচা রাস্তা বস্তির মধ্যে ঢুকে গেছে। সবে সন্ধে হয়েছে, রাস্তাটার মুখে এবং ভিতরে কর্পোরেশনের আলো জ্বলছে।
