সযত্নে তৈরি উত্তরটাকে রেখা সাজিয়ে তুলল, লিখেছে পছন্দ হয়েছে; কিন্তু ছেলে এখন মত করছে না। বােনের বিয়ে না দিয়ে বিয়ে করবে না বলেছে। আস্তে আস্তে পড়ন্ত আলাের মতাে থেমে গেল রেখার কথাগুলাে। শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে ইতিদের ছাদের দিকে।
মঞ্জুও চুপ করে রইল কিছুক্ষণ, তারপর বলল, দুটো বছর তাে, তারপর বােনের বিয়ে হয়ে যাবে। তাই না?
কোনাে কথা বলল না রেখা। মুঠোয় চিবুক রেখে আকাশে তীক্ষ্ণ চোখ মেলল সে। কনে দেখা আলােকে পিষে গুঁড়িয়ে দেবার জন্য আকাশে আকাশে ষড়যন্ত্রী অন্ধকারের ব্যস্ততা। আর এক ছাদে সাদা গেঞ্জিটায় ঘামে-ভেজা রং ধরেছে। আত্মীয় রং চেনা যায়। কিন্তু দিব্যেন্দু, বড়াে দূরের। মঙ তাে পরে সবই জানতে পারবে। তখন নিভে যাবে রূপকথার প্রদীপ। দমচাপা অন্ধকারের থেকে নিজেকে বাঁচার আকুলতায় টেনে টেনে হেসে বলে উঠল রেখা, না, ভাবছিলুম এই লােকটার কথা। আচ্ছা ধর, যার সঙ্গে ওর বিয়ে হবে, সেও তাে অনেক…
জলের ঘূর্ণি ও বকবক শব্দ
বিয়ের পর ঘরের অকুলান এবং ডেইলি প্যাসেঞ্জারির ধকল, এই দুই ঝকমারি সামলাতে, বিশ্বনাথ কলকাতার উত্তরে বাসা পেয়ে গোবরডাঙার পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে উঠে এসেছে। সে চাকরি করে বিরাট এক হোটেলে। প্রায় সাড়ে সাতশো কর্মচারির ছুটির হিসাব রাখা তার কাজ। বউ পূর্ণিমা, সাত মাসের পুত্র বুবুন আর বাসু নামে বছর বারোর একটি কাজের মেয়েকে নিয়ে তার সংসার। হাজার টাকা সেলামি দিয়ে দেড়শো টাকা ভাড়ায় দেড়খানি ঘর, ছোট্ট রান্নাঘর আর সরু একটি দালান নিয়ে তার সংসার। টানাটানি নেই আবার সচ্ছলও নয়, যেমন পূর্ণিমা সাদামাটা নয় আবার সুন্দরীও নয়।
বিশ্বনাথ জন্মরুগ্ন। শরীর কমজোরি হওয়ায় ছোটো থেকেই সে ভীরু প্রকৃতির। পূর্ণিমা কিছুটা বিপরীত। সে চটপটে, পরিশ্রমী এবং কিঞ্চিৎ রাগী। কলকাতায় ভাড়াবাড়িতে বসবাস পদ্ধতির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে তার অসুবিধা হয়নি শুধু জলের ব্যাপারটা বাদে। সে অস্বাচ্ছন্দ্যে পড়ে সকাল বেলাটায়।
এই বাড়ির তিনটি পরিবারের জন্য উঠোনে এজমালি একটি জলের কল। স্নানের ঘরেও একটি কল আছে চৌবাচ্চার উপরে। পূর্ণিমাদের মুখোমুখি উঠোনের ওধারে একটি ঘরে থাকে স্যাকরা কানাই দত্ত, তার দ্বিতীয় পক্ষের বউ সুপ্রিয়া এবং দুই পক্ষের মোট তিনটি ছেলে মেয়ে। বাড়িওয়ালা রূপেন পাল কাঠের ব্যবসায়ী। তার সংসারে স্ত্রী, এমএ পাঠরতা কন্যা আর নিমাই নামে একটি চাকর মাত্র। জনা বারো প্রাণী নির্ভর করে একটি কলের উপর। প্রতিদিন দু-বেলা কে আগে কলের নীচে কলসি বা বালতি বসাবে, এই নিয়ে তিন পরিবারের লোকেদের মধ্যে মিউজিক্যাল চেয়ারের মতো জলধরার প্রতিযোগিতা চলে। মছলন্দপুরের বাপের বাড়িতে টিউবওয়েল, পাতকুয়া এবং পুকুর পূর্ণিমাকে যথেচ্ছ জল খরচ করার অভ্যাস তৈরি করে দেওয়ায় এখন চার বালতি জলের সঙ্গে সে কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারে না। স্বামীকে সে প্রায়ই অনুযোগ করে, বাড়িওলাকে বলো আর একটা কল বসাতে, এভাবে রোজ পারা যায় না। উঠোন ধুতে দু-বালতি জল ঢেলেছি অমনি ওপর থেকে মাসিমার চিৎকার, চৌবাচ্চা খালি করে দিয়ো না গো। চান করছি আর তখন দরজার কাছে এসে সুপ্রিয়া বলবে, উনি চান করবেন, একটু জল রেখো। বাড়িওলাকে এবার বলো আর একটা কল বসাক।
বললেই কি কল বসানো যায়। কলকাতার জলের অবস্থাটা আগে বোঝো। কল দিয়ে বেরোবার জন্য জলটা কোথায়? জল দেবে কর্পোরেশন, বাড়িওলা তো নয়।।
বিশ্বনাথ সর্বদাই বিরোধ বিসংবাদ এড়িয়ে চলতে চায়, সে জানে চিৎকার ঝগড়া হাতাহাতি করে সামান্য কিছু আদায় করা গেলেও মানসিক উৎপীড়নে অশান্তিতে ভুগতে হবে। পূর্ণিমাকে সে বোঝায়, সব কিছু কি আর করে দেওয়া যায়, মানিয়ে নিয়ে চলতে হয়, কিছুটা ছেড়ে দিয়ে অ্যাডজাস্ট করতে হয়। যখন যেরকম অবস্থা পড়ে তখন তেমনভাবে চলা।
মানিয়ে চলারই তো চেষ্টা করি। যখন কেরোসিন পাওয়া যাচ্ছিল না, মাসিমা বোতল হাতে এলেন তখন কি আমি আধ বোতল দিইনি? হঠাৎ যেদিন দুধের ধর্মঘট হল, মিন্টু এসে বলল বাবা চা খেতে পাচ্ছে না একটুখানি দেবে কাকিমা? বুবুনের বেবিফুড থেকে তো দু-চামচ দিলুম। মানিয়ে চলতে একা আমি চাইলেই তো হবে না। লোডশেডিং হলে হারিকেনটা রান্নাঘরের দরজার বাইরে রেখে কাজ করি, তাতে আমার অসুবিধে হলেও কিছুটা আলো তো সদরে পড়ে। এসব কেন করি, মানিয়ে চলার জন্যই তো।
অন্যে আমার জন্য কী করল বা না করল তাই নিয়ে মন খারাপ করে লাভ কী, তোমার কর্তব্য তুমি করে যাও।
সংসার চালাতে গেলে অত ভালোমানুষ হলে চলে না।
বিশ্বনাথ তখন ট্রানজিস্টারের চাবি ঘোরাল ছায়াছবির গান শোনার জন্য।
কয়েক দিন পর সকালে খবরের কাগজ পড়ার মধ্যেই বিশ্বনাথ এক বার রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে উঁচুস্বরে বলল, পলতায় জলের পাইপ বদলানো হবে, বুধবার বিকেল থেকে বারো ঘণ্টা জল আসবে না, জল ধরে রেখো।
কথাটা পূর্ণিমার কানে পৌঁছোল কিন্তু গভীরে নয়। দু-দিন পরে বুধবার এল। প্রতিদিনের মতোই সে সংসারের জন্য জল তুলল। শুধু বিকেল আর রাতে জল বন্ধ, বৃহস্পতিবার সকালেই পাওয়া যাবে এই নিশ্চিন্তিতে সে বাড়তি জল ধরেনি। কিন্তু বিশ্বনাথের নজরে পড়ল কানাই দত্তর বউ আর বড়োমেয়ে অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি, ডেকচি, গামলা করে চৌবাচ্চা থেকে জল নিয়ে গেল প্রায় চোরের মতো। এভাবে জল নেওয়ার কোনো কথা নয়। এখনও বাড়ির কারুরই স্নান হয়নি। ঠিক তখনই দোতলা থেকে নিমাইও দুটো ঢাউস প্লাস্টিকের বালতি হাতে নামল।
