হঠাৎ, বিয়ে-থা হবে নাকি?
হ্যাঁ।
মঞ্জুর গা ঘেঁষে সরে এল ইতিদের ঝি। ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কোথায় গাে?
দিল্লিতে। আমাদের দিদিমণিরও বিয়ে, এই শ্রাবণে। ছেলে খুব পন্ডিত, কলেজে পড়ায়। ভাব করে বিয়ে হচ্ছে।
মঞ্জু যেন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুর খুঁজে পেলে ঝিয়ের কথাতে। ভাব করে বিয়ে যেন একমাত্র ওর দিদিমণিই করতে পারে। আর পন্ডিত ছেলে ভূভারতে ওই একটিই আছে। হালকা, কিছু-না সুরে মঞ্জুও বলল, রেখুরও বিয়ে এই শ্রাবণে। ছেলের গাড়ি আছে। দিল্লিতে বিরাট চাকরি করে। রেখাকে পছন্দ করে বিয়ে করছে।
ওমা! তবে আর ফোটো তােলাতে গেল কেন?
সত্যিই তাে। না দেখে পছন্দই-বা হয় কী করে। ঝি মুখে বুঝে ফেলেছি হাসি এনে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রয়েছে।
যাই, এখনও সন্ধ্যে দেখানাে হয়নি। প্রায় ছুটে পালিয়ে গেল মঞ্জু।
ফোটো পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন শুধু অপেক্ষা করা। ছাদে সেই গল্পই করে মঞ্জু আর রেখা। দূরের ছাদ থেকে আড়চোখে তাকিয়ে থাকে সেই লােকটা। বই হাতে পায়চারি করে আর চুলে হাত বুলােয়। মঞ্জু বা রেখা তাকে দেখেও দেখে না। সেদিন ছাদে উঠেছিল ইতি। কথা থামিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলল রেখা, দেখেছিস কেমন সুন্দর হয়েছে।
হবেই তাে, এখন তুইও তাে হয়েছিল।
যাঃ, ওর তাে বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আর আমার কোথায় কী!
রেখার কথায় কান না দিয়ে মঞ্জু আবার বলল, টুলুদির মতাে ইতিও ভাব করে বিয়ে করছে। আচ্ছা, বিয়ের পর ইতিও চাকরি করাবে তাে?
কী জানি! ওর বর যদি চাকরি করতে দেয় তাে করবে।
আচ্ছা, বরের সঙ্গে এ তাে বেড়াতে বেরুবে—সিনেমায় কিংবা পার্কে। ফুল কিনে আনবে, বন্ধুরা এলে চা দেবে, গান গাইবে, তাই না? ঝুকে পড়ল মঞ্জু রেখার চোখের নীচে।
সবাই যে একরকমই করবে, তার কী মানে আছে।
তুই হলে কী করতিস?
আমি! দম বন্ধ হয়ে এল রেখার। এমন করে দম বন্ধ হওয়া তার এই প্রথম।
হ্যাঁ, তুই হলে কী করতিস? আবার ফিরে বলল মঞ্জু। আগ্রহে জ্বলজ্বল করছে ওর চোখ।
মুখ ফেরাল রেখা। এত সহজে কি বলা যায়। কুড়ি বছর বয়সের যেকোনাে মেয়েই শুধুমাত্র এই একটি কথার ওপরেই মহাভারত লিখতে পারে। কৈশাের থেকে আজ পর্যন্ত দেখা, শােনা এবং পড়ার মধ্য দিয়ে এক রূপকথার প্রদীপ জ্বালিয়েছে রেখা। বাসন মাজা, রান্না আর ছােটো ভাই-বােনদের পরিচর্যার মধ্যে সময় করে টুকরাে টুকরাে মুহূর্তগুলােকে সেই প্রদীপের আলােয় রঙিন করেছে। বয়স বাড়ছে, যথেষ্ট টাকা খরচ করে বিয়ে দেবার ক্ষমতা বাবার নেই, তবু এতটুকু স্তিমিত হয়নি সে-আলাে। সে ভেবেছে তার নিজের একটা সছিল সংসারের কথা, একটি স্বামী স্বেচ্ছায় যার খুশিতে নিজেকে সঁপে দেওয়া যায়। দিনরাতের একটা অনুভূতি—যাকে সে লালন করবে তাদের যৌথ ভালােবাসা দিয়ে ঘিরে।
কী দেখছিস অমন করে?
মঞ্জুর নাড়া খেয়ে চমকে উঠল রেখা। কিছু-একটা বলার জন্যেই বলে উঠল, না, ওই লােকটাকে দেখছি।
বিরক্ত হল মঞ্জু রেখার কথায়। আর প্রকাশ্যেই সে তা জানিয়ে দিল, এধার ঘুরে দাঁড়া, নইলে এক্ষুনি হাঁ করে তাকাবে।
মঞ্জুর দিকে ঘুরে দাঁড়াল রেখা। অল্প হাসল ওকে প্রশ্রয় দিয়ে।
হ্যাঁ রে, ওদের গাড়ি আছে?
কাদের! অবাক হল রেখা।
কাদের আবার, তাের বরেদের। ধ্যাত, তুই এখন থেকেই যা-তা বলতে শুরু করেছিস। মুখ তুলে পশ্চিম আকাশ থেকে আসা আলাের মুখােমুখি হল রেখা। হালকা হলুদের গুঁড়ােয় নরম হয়ে গেছে আলাের তাপ। কনে-দেখা আলাে। সারাদিনের শেষে একুটখানির জন্য ফুটে ওঠে, তারপরই অন্ধকার এসে নি:শেষ করে দেয়। চোখের পাতা কাঁপছে রেখার। দু-চোখ ভরে দেখে নিচ্ছে সে কেমন করে একটা দিন তার স্বপ্নের সঞ্চয় নিয়ে এগিয়ে চলেছে রাত্রির আয়ােজনে।
খুনুপিসি বলছিল গাড়ি কিনবে। সত্যি! তাহলে তাে রােজ বেড়াতে পারবি। আকাশ থেকে সবটুকু খুশি কুড়িয়ে নিল মঞ্জু তার দু-চোখে। মিষ্টি হেসে ওর দিকে তাকাল রেখা।
বেড়িয়ে এসে তারপর কী করবি? গল্প?
ধুর, তাের বুদ্ধিসুদ্ধি কোনােদিন হবে না। মা বােন এদের সামনে কেউ বউয়ের সঙ্গে গল্প করতে পারে? লােকে বলবে কী!
তাহলে গল্প করবি কখন?
উত্তর না দিয়ে চোখে রহস্য এনে মুচকি হাসল রেখা।
রাত্তিরে বিছানায় শুয়ে? রেখার কানে কথাটাকে মিশিয়ে দিল মঞ্জু।
সেইরকম আস্তেই মঞ্জুকে ধাক্কা দিয়ে বলল রেখা, সব কথা কি বলতে আছে?
আমাকেও বলতে নেই?
মঞ্জু রাগ করল না, বরং দু-হাতে জড়িয়ে ধরল রেখাকে—বাদসাদ দিয়েও বলবি না?
আচ্ছা, বলব ক্ষণ।
সারাদিনের শেষে কখন বিকেল আসবে, কখন দুজনে মুখােমুখি হয়ে আর এক জগতে পাড়ি জমাবে তারই প্রত্যাশায় ছটফট করে মঞ্জু আর রেখা। কথা আর কথা। জ্যৈষ্ঠ শেষ হয়ে আষাঢ় পড়ল, তবু ওদের ক্লান্তি নেই। আষাঢ়ও শেষ হয়ে শ্রাবণ ধরল। দিল্লি থেকে চিঠি এসে গেল। মেয়ে পছন্দ হয়নি। কোনাে কারণ তারা জানায়নি। থমথমে মুখ নিয়ে ওরা দাঁড়াল ছাদে। ইতিদের ছাদে ম্যারাপ বাঁধার আয়ােজন শুরু হয়ে গেছে। বাঁশের কঙ্কালের থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মঞ্জু শুধােল, কী লিখল ওরা?
উত্তরের জন্য সারা দুপুর নিজেকে তৈরি করেছে রেখা। একতলার স্যাঁতসেঁতে ঘর। ঘামে জবজবে ছটফটে দুপুর। তারপরেই বিকেলের ছাদ। কিছু আকাশ আর কিশােরী লজ্জা রােদ। কথায় কথায় তৈরি আর এক পৃথিবীর চেনা সংসার। ভয়ে কেঁপে উঠেছিল রেখা। এ সবই হারাতে হবে। ফুরিয়ে যাবে সব কথা, মরে যাবে এই আকাশ, রােদুর আর ছাদের প্রত্যক্ষমান স্পন্দন। শুধু শুনতে হবে হাঁপটানা ক্লান্তিকর দিনরাতের নিশ্বাস…
