এখনও দাঁড়িয়ে আছে রে! হালকা সুরে বলে উঠল রেখা।
থাকুক গে। তাের তাে ফোটো নেই, তাহলে পাঠাবি কী? রেখার পেছনে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই জিজ্ঞাসা করল মঞ্জু।
কালকে বাবা অফিস থেকে ফিরে নিয়ে যাবে দোকানে।
পরের দিন দুপুরেই রেখা ডেকে নিয়ে গেল মঞ্জুকে তাদের ঘরে। দুখানি ঘর। একখানিতে সুধা তখন ঘুমােচ্ছে, অন্য ঘরখানিতে ওরা দুজন এসে ঢুকল। তার ওপর দুখানি শাড়ি আর ব্লাউজ। শাড়িতে ইতস্তত ভাঁজ আর ন্যাপথলিনের গন্ধ। দুটি শাড়িই তুলে নিয়ে দেখতে শুরু করল মঞ্জু।
এটা তাে জেঠিমার, না?
ঘাড় নাড়ল রেখা।
আর এটা? তাের?
তবে নাতাে কার?
পরতে দেখিনি তাে।
বিরক্ত বােধ করতে শুরু করল রেখা। মঞ্জুটা বড় বােকা; এমন খুটিয়ে জিজ্ঞেস করে। বল, কোনটা পরব।
চট করে জবাব দিতে পারল না মঞ্জু। মনে মনে সে ভেবে নিয়েছে, অদ্ভুত এইবার সে নিজেকে বুদ্ধিমতী প্রতিপন্ন করবে। মঞ্জুর মুখ চোখের অবস্থা দেখে মনে হয় তার সামনে ছড়ানাে গুটি পঞ্চাশেক শাড়ির মধ্য থেকে একটিকে বেছে নিতে বলা হয়েছে। রেখাও চুপ করে আছে। মঞ্জুর মতামতের ওপর তার যে খুব আস্থা আছে তা নয়, শাড়ি বাছাই তার কাছে সত্যিই গুরুতর সমস্যা, বিশেষ করে আজকে সে ঘাবড়ে গেছে। তার নিজের মত হালকা বেগুনি রঙের জর্জেটটাই পছন্দ। ওটা তার রঙের সঙ্গে খুলবে ভালাে। এখন মঞ্জুর
কাছ থেকে যাহােক একটা সমর্থন পেলেই সে আশ্বস্ত হতে পারে।
ফোটো তা রাত্তিরে তােলা হবে? নখ খুঁটতে খুটতে গম্ভীর সুরে প্রশ্ন করল মঞ্জু।
হুঁ।
মঞ্জু আপাদমস্তক দেখে নিল রেখাকে। বুঝতে পারল রেখা তার গায়ের রং দেখছে মঞ্জু। গােড়ালি থেকে শাড়িটাকে অল্প তুলে একটা ঘামাচি মারল সে। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল, মঞ্জুর সামনে সে অনেক দিন হাঁটু পর্যন্তও কাপড় তুলেছে। শাড়িটা নামিয়ে দিল রেখা। মঞ্জুর মুখে বিশেষ কোনাে ভাবান্তর ঘটেছে বলে মনে হল না। রেখার গােড়ালি থেকে মাথার দিকে তাকাল সে। চুল খােলাই আছে। তুব এক বার মাথা ঝাঁকিয়ে চুলগুলাে দুলিয়ে দিল রেখা। ঘন কোঁকড়ানাে, কোমর পর্যন্ত এলানাে চুল।
চুলে তেল দিসনি কেন?
মঞ্জুকে শাড়ি বাছাতে বলা হয়েছে, আর সে কিনা এখন চুল নিয়ে পড়ল। বিরক্ত হলেও জবাবটা কোনােরকমে দিল রেখা, বডড মাটি পড়েছিল, তাই মাথাটা ঘষলুম।
কী-একটা বলতে যাচ্ছিল মঞ্জু, থামিয়ে দিয়ে ধমকে উঠল রেখা, যা জিজ্ঞেস করেছি তাই বল। কলে জল এসে গেছে; তিনু, লেখা ওরা এক্ষুনি ইশকুল থেকে ফিরে হইচই লাগবে।
এত তাড়াতাড়ি বলা যায় নাকি! একি তাড়াহুড়াের ব্যাপার। ভেবেচিন্তে ঠিক না করলে যদি…
মঞ্জু কথাটা শেষ করল না বলেই রেখা কৃতজ্ঞ হল ওর ওপর। শেষ করলে কী বিশ্রীই না শােনাত। বােকা মেয়েদের জিভের আড় বলে কিছু থাকে না। দুখানা শাড়ি নিয়ে প্রায় ঘেমে উঠেছে মঞ্জু। রেখার ভবিষ্যতের ভালাে মন্দ সব কিছুই এখন নির্ভর করছে শাড়ি বাজার ওপর! নিজের শুভাশুভের দায়িত্বের ভার তার ওপর তুলে দিয়ে রেখা নিশ্চিন্ত হয়ে রয়েছে, এই চিন্তায় দিশাহারা হয়ে পড়তে লাগল মঞ্জু।
তাহলে এইটেই পরি, কী বল? শেষপর্যন্ত সম্মতির অপেক্ষা না রেখেই জর্জেটটা তুলে নিল রেখা।
দাঁড়া, পরিয়ে দিই।
এখন পরল ময়লা হয়ে যাবে না!
তাহলে চুলটা বেঁধে দিই একটা সমস্যার হাত থেকে রেহাই পেয়ে খুশি হয়ে উঠেছে মঞ্জু।
কিন্তু চুল বাঁধতে গিয়েও আর একটা পরিস্থিতির উদ্ভব হল। মঞ্জুর ইচ্ছে, বিড়ে খোঁপা; রেখা চায় চুলটা খােলাই থাক।
আমি কি পেছন ফিরে ছবি তুলব যে, খোঁপার কায়দা দেখাতে হবে?
আসলে রেখা জানে, চুলই হচ্ছে তার একমাত্র গর্বের জিনিস। কিন্তু মঞ্জু সেরকম বােকা, হয়তো খোঁপা না বাঁধিয়ে ছাড়বে না। সরু গলার ওপর মুখটাকে অনাবশ্যক বড়াে মনে হয়, তারপর একটা বিরাট খোঁপা যদি বাড়তি হয়ে আটকে থাকে তাহলে মােটেই সুশ্রী দেখাবে না। নিজের সম্বন্ধে এত রূঢ় সমালােচক আর কোনােদিন হয়নি রেখা। বেশ, তাহলে বিনুনি করে দিই। সামনে ঝুলিয়ে দিবিক্ষণ।
আপত্তি করার মতাে কিছু খুঁজে না পেয়ে রাজি হয়ে গেল রেখা। দুগাছি বিনুনি কাঁধের দু দিক দিয়ে বুকের ওপর ঝুলিয়ে দিল মঞ্জু। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে দেখতে রেখা লাজুক হাসল, বডড খুকি খুকি দেখাচ্ছে।
আহা, খুকি দেখাবে না তাে কী! কুড়ি বছরের মেয়েকে কি বুড়ি দেখাবে?
—দুটো রিবন ফুলের মতাে বেঁধে দিলে কেমন দেখাবে রে? রেখার সুরে সংশয় ছিল, তাই খুব জোর দিয়ে সমর্থন করতে পারল না মঞ্জু। তা ভালােই দেখাবে। তাের তাে রিবন নেই; লেখা আসুক ইশকুল থেকে, ওরটাই নয় বেঁধে নিস।
তাের সাবানটা দিবি? আমারটা ফুরিয়ে গেছে।
কথা না বলে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মঞ্জু। শুধু সাবান নয়, পাউডারের কৌটো আর। স্নাে-র শিশিটাকেও নামিয়ে আনল।
এখন যেন গা ধূসনি, ঠিক যাবার আগে গা ধুয়ে মাখবি।
বেশিক্ষণ আর বসতে পারল না মঞ্জু। রেখার সংসারের কাজগুলােকে আজ তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতে হবে। আজ দুজনের কেউই ছাদে উঠল না। ঘর মুছে, উনুন ধরিয়ে, বাসন মেজে সাজগােজ শেষ করতে করতেই সন্ধ্যা উতরে গেল। বাবার সঙ্গে যখন রেখা বেরিয়ে গেল, মঞ্জু সদর দরজা পর্যন্ত তাকে এগিয়ে দিল।
ইতিদের ঝি রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল। মাকে দেখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল, সেজেগুজে কোথায় গেল গা?
ফোটো তােলাতে।
