নীচু ছাদগুলাের পরেই প্রথম তিনতলার ছাদটায় দাঁড়িয়েছিল একটা লােক। গেঞ্জিটা যত পরিষ্কার, গায়ের রং ততই কালাে। পাঁচিলের ওপর থেকে শুধু দেখা যায় সরু বুক, গলার কণ্ঠা, কনুইয়ের হাড় আর ভুরুর ওপরের খানিকটা। সযত্নে পাট-করা চুলে মাঝে মাঝে আঙুল ছুইয়ে আদর করে। যদিও হাতে একটি বই আছে, তবু চোখ দুটো অন্যদিকে নিবদ্ধ। মঞ্জু আর রেখাকে তার দিকেই তাকাতে দেখে চোখ ঘুরিয়ে নিল।
ছাদে ওঠারও জো নেই। এমন ছাগলের মতাে তাকিয়ে থাকে—ইচ্ছে করে চোখ দুটো গেলে দিই রাগে গরগর করে উঠল মঞ্জু। রেখা শুধু কৌতূহলী চোখে তাকিয়েই রইল।
পুরুষমানুষের আবার ছাদে ওঠা কী? তাও আবার বিকেলে। মঞ্জু কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারছে না লােকটার উপস্থিতি।
কী আর করবে বেচারি, বল! যা চেহারা, কেউ বােধ হয় বিয়ে করতে চায় না। তাই মনের দুঃখে…
দুজনেই হেসে উঠল। বােধ হয় শুনতে পেয়েছে লােকটা। কেমন ছটফটিয়ে উঠল। বার কয়েক এদিকে তাকিয়ে পায়চারি শুরু করে দিল।
মনের দুঃখ না আর-কিছু। পরশু দিনই তাে এদিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছিল।
কই বলিসনি তাে আমায়! বিস্মিত হল রেখা। এমন একটা ব্যাপার এখনও মঞ্জু তাকে না বলে মনের মধ্যে জমিয়ে রেখেছে কী করে? রেখার বিস্মিত হওয়ার কারণটা তাই।
হ্যাঁ ভারি তাে একটা বলার মতাে কথা। কৈফিয়তের সুরে কথাটা বললে মঞ্জু।
পায়চারি থামিয়ে লােকটা ওদের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছে। শরীরটা কাঁপছে, বােধ হয় পী নাচাচ্ছে।
ওদিকে তাকিয়ে থাকিনি, আশকারা পেয়ে যাবে।
যেজন্যে রেখার কথাটা বলা, তাই হল। লােকটার দিকে পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়াল মঞ্জু। গাল দুটো ফুলে রয়েছে। অনেকক্ষণের চেপে রাখা নিশ্বাসটা বেরিয়ে এল। কথা বলছে না রেখা। চুলের কাঁটাগুলাে টিপে বসিয়ে দিতে ব্যস্ত সে। মঞ্জুরও হাতটা তার অজান্তেই খোঁপায় উঠে এল। রেখা বুঝতে পারছে, মঞ্জু সত্যি সত্যিই রােগেছে। আর তার চুপ করে থাকাতে রাগটা ক্রমশই বাড়ছে।
খুনপিসি কেন এসেছিল জানিস?
মঞ্জুর জানবার কথা নয়। তাই উশখুশ করল সে।
খুনুপিসির ননদরা তাে দিল্লিতে থাকে। প্রায় পনেরাে বছর আছে।
মঞ্জু শুধু তাকালই না, রেখার গা ঘেঁষে সরে এল।
ছেলেরা সব ওখানেই লেখাপড়া করে চাকরিবাকরি করছে। বড়াে ছেলে, খুনুপিসির ননদের বড়ােছেলে দিব্যেন্দু, বেশ নামটা, না রে? সতর্ক চোখে রেখা তাকাল মঞ্জুর দিকে। খুশিখুশি ভাব ফুটে উঠেছে।
সুন্দর নামটা।
আশ্বস্ত হয়ে রেখা আবার বলতে শুরু করল, দিল্লিতেই ভালাে চাকরি করছে। বিএ পাস, গরমেনট চাকরি…। কথা বলায় ছেদ দিল রেখা। মঞ্জুর মুখে প্রশ্ন জমে উঠেছে।
খুনুপিসির ননদের মেয়ে নেই? ছেলেই বুঝি বড়াে?
হ্যাঁ দিব্যেন্দুই বড়াে। এক বােন দীপিকা, সামনের বছর কলেজে ঢুকবে। বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। ছেলে বিলেত থেকে ফিরলেই বিয়ে হবে। ওদের আর ভাই-বােন নেই।
রেখাকে থামিয়ে আবার প্রশ্ন করলে মঞ্জু, বাবা নেই? খুনুপিসির নন্দাই?
ও মা, সে তাে কবে মরে গেছে। আজ দেড় বছর। ছেলেই তাে এখন সংসারের কড়া।
মা তাে বামুন চাকরের হাতে সংসার ছেড়ে দিয়ে দিনরাত ঠাকুর নিয়ে পড়ে আছে। আর লােকজনের হাতে সংসার পড়লে যা হয়। চুরিচামারি, নষ্ট, ব্যবস্থা বলে যদি একটা জিনিস থাকে!
কেন, মেয়ে তাে রয়েছে।
হ্যাঁ, সে তাে মেমসাহেব। দিল্লির ব্যাপারস্যাপার অন্যরকম। এ আর কলকাতা নয়, মেয়েরা সেখানে সাইকেল চেপে বেড়ায়।
ওমা, লজ্জা করে না! পারে কী করে!
দিল্লির মেয়ে হলে তুইও পারতিস।
মা গাে, মরে গেলেও না। মঞ্জু হেসে উঠল খিলখিল করে। দিল্লিতে তাে চেনা লােক আছে। যা-না, বেড়িয়ে আয়-না। হাসি থামলে মঞ্জু বললে।
হঠাৎ মুখ নামিয়ে হাতের নখ দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল রেখা। বিকেলের শেষ আলােটা বিভ্রান্তিকর। মনে হয় যেন লাল হয়ে উঠেছে রেখার মুখ।
খুনুপিসি বলেছিল, দিব্যেন্দুর মা চিঠি দিয়েছে দিব্যেন্দুর জন্যে মেয়ে দেখতে। তাই খুনুপিসি এসেছিল। বাধােবাবাে স্বরে বললে রেখা।
ওমা, বােনের বিয়ে না দিয়েই ভাই বিয়ে করবে?
আহা-হা, বােনের বিয়ে তাে ঠিক হয়েই আছে। এদিকে সংসার ভেসে যাচ্ছে, দেখাশােনার লােক নেই বলে। তখন অত নিয়ম মেনে চলার কোনাে মানে হয়?
খামােকা রেখা রােগে উঠল কেন তার কারণ বুঝতে না পেরে মঞ্জু আমতা আমতা করে বলল, তবু অদ্দিন যা হয়ে আসছে…
হয়ে আসছে বলে চিরদিনই হবে তার কী মানে আছে। বােনের বিয়ের এখনও দু-তিন বছর দেরি। তাই বলে ভাই বিয়ে করবে না? দিন-কে-দিন তুই বােকা হয়ে যাচ্ছিস।
রেখাকে বিরক্ত করে নিজেকে আরও বােকা প্রতিপন্ন করতে চাইল না মঞ্জু। সে চুপ করে রইল।
বিরক্তিবােধটা কাটিয়ে উঠতে বেশি সময় নিল না রেখা। স্বাভাবিক স্বরে আবার কথা শুরু করল সে, এরই মধ্যে ছ-সাতটা সম্বন্ধ এসেছে। সব ওখানকার মেয়ে। একটাও পছন্দ হয়নি ছেলের। তাইতাে খুনুপিসিকে চিঠি দিয়েছে ছেলের মা।
সেইজন্যেই বুঝি খুনুপিসি এসেছিল? ফিসফিস করে কথাটা বললে মঞ্জু। মাথা নুইয়ে ছােট্ট করে ঘাড় নাড়ল রেখা।
কী কথা হল?
এখন আর কী কথা হবে। ফোটো আর পরিচয় লিখে আগে পাঠাতে হবে। পছন্দ হলে অন্য কথাবার্তা হাব।
সন্ধ্যা অনেকখানি নেমে এসেছে। শাঁখ অনেক বাড়ি থেকে বেজে উঠল। ওরা দুজন নীচে নামার জন্য সিঁড়ির দিকে এগােল। সিঁড়িতে নামার আগেই দুজনেই মুখ ফিরিয়ে থাকল। সাদা গেঞ্জিটাই শুধু দেখা গেল।
