চুল বাঁধা শেষ হলে গা ধুয়ে দোতলায় উঠে আসে রেখা। আজ দুপুরে ঘুমিয়ে ফুলাে ফুলাে গাল আর চোখ নিয়ে হয়তো তখন চায়ের বাটিতে চুমুক দিচ্ছে মঞ্জু। রেখাকে দেখে এটো। বাটিটাই এগিয়ে দেবে। চায়ে চুমুক দিতে দিতে রেখা বলবে, তার হল না এখনও!
বাবারে বাবা, এইতাে বিকেল পড়ল, তাের আর তর সয় না।
গামছা আর সাবানের বাক্স নিয়ে গা ধুতে চলে গেল মঞ্জু। রেখা গল্প শুরু করে মঞ্জুর পিসিমার সঙ্গে। ফিরে এসে মঞ্জু জিজ্ঞেস করে, কী কথা হচ্ছিল রে তােদের?
ছাদে চ বলছি।
প্রতিদিন নয়, যেকোনাে একদিনের ঘটনা। দোতলা আর একতলার সমবয়সি দুটি ভাড়াটে পরিবারের মেয়ে। বিকেল হলেই সাজগােজ করে উঠে আসে ছাদে। শাঁখ বাজলেই নেমে যায়। দিনের পর দিন আজ পাঁচ বছর ধরে।
আজকে রেখার আসতে দেরি হয়ে গেল। মঞ্জু তখন আয়নার সামনে শেষ বারের মতাে নিজের মুখটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিচ্ছিল। পাউডার পাফটা ডুবিয়ে নিল রেখা কৌটোর মধ্যে। মঞ্জুর ভুরু দুটি টঙ্কার দিল। দেখেও দেখল না রেখা। মঞ্জুকে সরিয়ে দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াল।
তাের বড়াে বদস্বভাব রেখা। না বলে-কয়ে পরের জিনিসে হাত দিস।
পাফটা রেখে দিল রেখা আহত ভঙ্গিতে।
অপ্রস্তুত হল মঞ্জু, এ মাসটা তাে ওই দিয়েই চালাতে হবে। কতটুকুই-বা আর আছে। তা মাখবি তাে মাখ-না।
থাক। গরিব মানুষ গরিবের মতােই থাকব।
অনুতাপ জানাবার জন্যে আঁকুপাঁকু করে উঠল মঞ্জু, আহা-হা, আমরাই যে কত বড়ােলােক! খুব ঠেস দিয়ে কথা বলতে শিখেছিস বাপু। গল্পের বই পড়লে এই হয়। নে মাখ! পাউডার পাফটা তুলে ধরল মঞ্জু।
হাতটা সরিয়ে দিয়ে দূরে দাঁড়াল রেখা। পাউডার মাখলেই কী আর না মাখলেই কী, যেমন দেখতে তেমনিই থাকব। তুই বরং মাখ তােকে দেখায় ভালাে। মিছিমিছি নষ্ট হবে আমার মুখে। চোখের পাতা আর গলা ভারী হয়ে আসে রেখার।
মন খারাপ শুরু হয়ে যায় মঞ্জুর। দু-হাতে জড়িয়ে ধরে সে রেখাকে। তাের মনটা বড়াে কুচুটে। আমি কি তাই ভেবে বলেছি? তােকে কুচ্ছিত দেখতে কে বলেছে? নিজে নিজেই যত কথা বানাবি আর মন খারাপ করবি। জোর করে পাউডার-পাফটা বুলিয়ে দিল সারা মুখে। রেখার ভুরু আর চোখের পাতা পর্যন্ত সাদা হয়ে গেল। তারপরই আচমকা ওর গালে চুমু দিল মঞ্জু।
ধ্যাৎ, কী করলি বল তাে। মঞ্জুর হাত ছাড়িয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল রেখা। সযত্নে বাড়তি গুড়ােগুলােকে মিলিয়ে দিতে লাগল চামড়ার সঙ্গে। মঞ্জু পাশেই দাঁড়িয়েছিল। ওর দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল রেখা, তাের সবটাতেই বাড়াবাড়ি। অতখানি মাখিয়ে দিলি কেন?
ছাদে উঠে এল ওরা দুজন। ছােট্ট ছাদ। বুক-সমান উঁচু পাঁচিল। ভাঙা কুঁজোর টবে তুলসী আর গাঁদা। চিড়-খাওয়া ছাদের মেঝেয় কালাে কালাে ছাপ। গুল দেওয়া হয়। তিন দিক চাপা তিন বাড়ির দেওয়ালে। ছাদের উত্তর দিকটায় এসে দাঁড়াল ওরা। রাস্তার একটা টুকরাে বুকে পড়লে দেখা যায় এখান থেকে। তা ছাড়া সামনের কয়েকটা বাড়ি দোতলা। চোখ অনেকখানি খােলা জায়গা দেখতে পায়।
পাঁচিলে কনুই রেখে ওরা দাঁড়াল। একই ভঙ্গিতে। আলতাে আঙুলগুলাে ঝুলে পড়ল। শরীরের ভর একপায়ে রেখে আর একটাকে তুলে দিল পাঁচিলের নীচের ঘুলঘুলিতে। চোখ দুটোকে আকাশ থেকে নামিয়ে ওরা দুজনে একসঙ্গেই সিধে হয়ে মুখােমুখি দাঁড়াল।
কথা বলছিস না যে। ভয়ে ভয়ে বললে যেন মঞ্জু।
এমনি। রেখা চোখদুটো আবার ফিরিয়ে নিল আকাশে।
এখনও বুঝি রাগ পড়েনি? তুই বড়াে গালফুলােনি মেয়ে।
হেসে ফেলল রেখা। একটু থেমে বললে, আজ খুনুপিসি এসেছিল।
খুনু পিসি! অবাক হওয়া আর জিজ্ঞাসা দুটোই ফুটে উঠল মঞ্জুর গলায়।
বাবার পিসতুতাে বােন, ভবানীপুরে থাকে। বা রে, তােকে বলিনি খুনুপিসির বডােমেয়ে টুলুদি প্রেম করে বিয়ে করেছে। রেখাকে মর্মাহত দেখাল।
তুই তাে টুলুদির কথা বলেছিস, খুলুপিসির কথা তাে বলিসনি। মঞ্জুও ক্ষুব্ধ হল।
নিশ্চয়ই বলেছিলুম, তাের মনে নেই তাহলে। জানিস, টুলুদি চাকরি করছে! রেখা হঠাৎ বললে।
সেকী, এইতাে বিয়ে হল, এখন তাে কনেবউ!
মঞ্জুর সরল বিস্ময়ে খুশি হল রেখা। আর একটু সরে এল মঞ্জুর কাছে। —টুলুদির বর— মেয়েরা ঘরের মধ্যে বসে থাকবে, একদম পছন্দ করে না। টুলুর্দিকে নিয়ে রােজ সন্ধ্যের সময় বেড়াতে বােরােয়। আর যেদিন বন্ধুরা আসে, টুলুদি তাদের চা দেয়। নিজে হাতে চা এনে দেয় গান পর্যন্ত গেয়েছে। টুলুদির তাে খুব ভালাে গলা।
টুলুদির বন্ধুরা আসে না? উত্তেজনায় থমথমে মুখে জিজ্ঞাসা করল মঞ্জু।
কী জানি? খুনুপিসিকে জিজ্ঞাসা করিনি। আর জানিস, টুলুদির বর রােজ অফিস থেকে ফেরার সময় ফুল কিনে আনে।
সত্যি! নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল মঞ্জুর, রােজ আনে?
হ্যাঁ।
আর কী আনে রে?
কী জানি।
টুলুদিকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। একদিন দেখাবি?
হঠাৎ বিরক্ত হয়ে উঠল রেখা, দেখে কী করবি, চারটে হাত গজাবে?
মঞ্জু লজ্জা পেল। তাই তাড়াতাড়ি বলল, না, এমনি বলছিলাম। তারও দেখতে ইচ্ছে করে না?
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না রেখা। অন্যমনস্কর মতাে দোতলার ছাদগুলাের দিকে তাকিয়ে রইল। প্রায় আধ মিনিট পর নিজের মনেই বললে, ভালাে বর পেয়েছে, পয়সাওলা ঘরে পড়েছে। এ আর দেখবার কী আছে!
মঞ্জু ও তাকিয়েছিল সামনের দিকে। রেখার কথাগুলাে বােধ হয় শুনতে পায়নি। হঠাৎ কনুই দিয়ে ধাক্কা দিল সে রেখাকে, ওই দ্যাখ, আবার এসেছে।
