”রেখেছি।”
আশ্বস্ত হয়ে রুবি বলল,”মন্টুকে কিছু খেতে দেওয়া উচিত।”
নিখিল উঠে পড়ল। পাঞ্জাবীটা হাতে নিতেই রুবি বলল,”খাবার আনতে চললে?”
”হ্যা।”
”তাহলে মার জন্যেও কিছু এনো।”
মন্টুর সামনে দিয়েই বেরোতে হবে। নিখিল বেরোতে গিয়ে ওর সামনে দাঁড়াল। ”কাকিমা এখন কেমন আছে?”
উঠে দাড়াল মন্টু। ”ভাল আছে।”
ভ্রু কোঁচকাল নিখিল, ”ভাল আছে?”
মন্টু থতমত হল। ঢোক গিলে বলল,”কাল রক্ত পড়ে নি।”
”কদিন এমন হয়েছে?”
”দু-তিন মাস। কাউকে বলেনি, লুকিয়েছিল।”
”জানার পর কি হল?”
মাথা নামিয়ে মন্টু চেয়ারের হাতল আঁচড়াতে শুরু করল।
”খোকা শোনো।”
মার ডাকে নিখিল ভিতরে এল।
”ওকে এখন আর কিছু জিজ্ঞেস করিস নি। মুখটা শুকিয়ে আছে কিরকম। ছোট ছেলে চিন্তা ওরও হয়। খাওয়া-দাওয়া বোধ হয় হয় নি।”
কথা না বলে নিখিল হন হন করে বেরিয়ে পড়ল। গলি দিয়ে যাচ্ছে এমন সময় কে ওকে চিৎকার করে ডাকল। ফিরে দেখে অমিয়। পাড়ারই ছেলে, পেশায় ড্রাফটসম্যান।
”আপনার প্ল্যানটা আজই শেষ হল। পারলাম না, হাজার চল্লিশ লাগবেই।”
”কেন, আমি যে ভাবে বললুম তাতে তো অত লাগার কথা না।”
অমিয় ছোট্ট করে হাসল। ”আপনি তো বলেই খালাস, দোতলা বাড়ির ভিৎ, জমি তিন কাঠা, মেটিরিয়ালস কি রকম দেবেন তা আপনিই ঠিক করবেন। তবে যাই দিন না কেন, আমার তো মনে হয় না ওর কমে হবে। দুবছর আগে হলে হত। আইডিয়া আছে বটে আপনার। অফিসে একজনকে আপনার করা প্ল্যানটা দেখিয়েছিলাম, খুব তারিফ করলেন।”
”অনেক ভেবেচিন্তে করা।” অস্ফুটে প্রায় আপন মনেই বলল, নিখিল।
”কবে শুরু করবেন?”
”কি জানি।”
”সেকি এই তো সেদিন বললেন, তাড়াতাড়ি চাই, ইমিডিয়েট স্টার্ট করবেন।”
”টাকা তো চাই। ত্রিশ হাজার পর্যন্ত লোন পেতে পারি গবরমেন্টের কাছ থেকে। ভেবেছিলাম ধার নেব না কিন্তু…….”
অধৈর্যের ভঙ্গিতে নিখিল যাবার জন্য ব্যাকুল। অমিয় সহানুভুতি জানানোর মতো করে বলল,” আসল প্ল্যানটাই হল টাকা জোগাড়। প্ল্যান হলে তখন স্যাংশন করাতেই প্রাণান্ত। নানান বায়ানাক্কা, একে ঘুষ তাকে ঘুষ। দিতে দিতে ফতুর।”
বেশ বড় করে অমিয় হাসল। তারপর বলল, ”দাঁড়ান আপনার প্ল্যানটা নিয়ে আসি।”
অমিয় প্ল্যান আনতে চলে গেল।
তখন নিখিলের সামনে থেকে গলিটা এবং বাড়িগুলো অদৃশ্য হতে শুরু করল। হু হু হাওয়া বইতে লাগল, সমুদ্রের গর্জন অস্ফুট হয়ে ভেসে আসছে। প্রবল অন্ধকার চুতর্দিকে আর সে তার তিনকাঠা জমির মাঝে দাঁড়িয়ে। জমির তিনকোণে তিনটে পিলারের মাথা উচু হচ্ছে ক্রমশ। চতুর্থটির দিকে তাকাতেই দেখল ছোটকাকী পিলার হয়ে দাড়িয়ে হাসছে। তারপর কাঁদতে শুরু করল: ” বড় কষ্টরে নিখিল, আমাকে সারিয়ে তুলবি?” নিখিল অস্ফুটে বলল, ”ছোটকাকী এইটে আমার জমি এখানে আমি বাড়ি করব। আমি সুখে থাকতে চাই।” শোনামাত্র চুতর্থ পিলারটি মাটির মধ্যে আগাছার মাঝে বসে যেতে শুরু করল। তাই দেখতে দেখতে ভয়ে আঁতকে উঠল নিখিল: ”না না, ছোটকাকী যেও না, আমার জমির সীমানা তাহলে হারিয়ে যাবে।”
নিখিলকে হাত বাড়িয়ে থাকতে দেখে অমিয় প্ল্যানটা এনে দেবার সময় বলল, ” খুব চিন্তার পড়ে গেছেন মনে হচ্ছে। যদি বলেন তাহলে যাতে আরও কমে হয় এমন প্ল্যানও করে দেওয়া যায়।”
ক্লান্ত কন্ঠে নিখিল বলল, ”বোধহয নতুন প্ল্যানই করতে হবে। বাড়ি করা খুব শক্ত কাজ।”
ছাদ
রােদ্দুরের ঝাঁঝ কমে আসার সঙ্গে সঙ্গেই রেখার মন আনচান করে ওঠে। কলটা খােলাই থাকে। বকবক শব্দ হলেই কড়ি বাসনগুলােকে টেনে আনে উঠোনে। প্রত্যহের অভ্যাসে হাত দুটো যেন যন্ত্র হয়ে পড়েছে। বাসনমাজা শেষ করেই ঘর মুছতে বসে যায়। রান্নাঘরটা তবু দুপুরে খাওয়ার শেষেই ধুয়ে রাখে। ঘরমােছা শেষ হবে আর লেখা স্কুল থেকে ফিরবে। এক দিনও নড়চড় হয় না সময়ের। ওদের খাবার দিয়ে চুল বাঁধতে বসবে সে সুধার কাছে। টুকটাক কথা হয় তখন। পাউডার ফুরিয়ে গেছে আজ দেড় হপ্তা, বাবাকে কিনে আনতে বলার জন্য মাকে চাপ দেয়। সুধা প্রতিবাদের মতােই বলে, অত পাউডার মেখে কী হবে, কোথাও তাে আর যাচ্ছিস না।
কোথাও না গেলে বুঝি মাখতে নেই! মুখ গোঁজ করে থাকে রেখা। ছেড়া ব্লাউজের কথা আর বলে না। তারপর কথা হয় ইতিকে নিয়ে।
ইতি এবারে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ কিনেছে। এই নিয়ে তিনটে হল ওর।
সুধা বলে, যাস-না ওদের বাড়িতে, ছােটোবেলায় তাে খুব ভাব ছিল তাদের। ঠোঁট দুটোকে মুচড়িয়ে বলে রেখা, আগে তবু ছাদে উঠত, দু-একটা কথা বলত-টলত; এখন তাে ওর যত ভাব ছেলেদের সঙ্গে। কলেজে পড়ে। চুপ করে শুনে যায় সুধা; তারপর একসময় বলে, লেখাপড়া জানা মেয়ে, ও কি আর যেচে কথা বলতে আসবে। তুই যাবি, গপ্পোটাপ্পা করবি। শিক্ষিত মেয়ে আলাপ-সালাপটা থাকা ভালাে।
হ্যাঁ, এই ছেড়া জামাকাপড় পরে যাই আর কি ওদের বাড়ি। রেখা জবাব দেয়।
এরপর সুধা ও-প্রসঙ্গ এড়িয়ে যায়। ইচ্ছে থাকলেও রেখা যেচে আলাপ জমাতে চায় না ইতির সঙ্গে। মনের মধ্যে কোথাও একটা আড়ষ্টতা অনুভব করে। ছােটবেলায় একসঙ্গে খেলাধুলা করেছে, স্কুলে পড়েছে। রেখাকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে সংসারের কাজে ভরতি করে দেওয়া হল। ইতি স্কুলেই রয়ে গেল। তারপর থেকেই দুজনে সরে গেল দু-দিকে। খিড়কির ডােবা, আবর্জনা আর ছাদ। বাইরের বাতাসে ঢেউ ওঠে না, শুকনাে পাতা উড়ে পড়ে। লালচে হয়ে যায় জল। পাঁক থেকে গ্যাঁজলা উঠে আসে। বাসন-ধােয়া জলে একঘেয়ে দিনগুলােকে দেখে দেখে ক্লান্ত রেখা। বাতাস লাগা, ঢেউতােলা সরােবর কৌতূহল জাগায়। সূর্যের আলােয় বিচিত্র হয়ে ওঠা জলের রং বিস্মিত করে রেখাকে। তবু কোথায় যেন ব্যবধান। ইতিকে আর ছেলেবেলার মতাে ইতু বলে ডাকা যায় না। ইতু যেন আর এক জগতের নাগরিকত্ব নিয়েছে।
