বাস থেকে নেমে মিনিট চারেক হাঁটতেই কলকাতার মধ্যে চলে এল। এবার ট্রামে উঠল। নেমে দু’মিনিট হেঁটে বাড়ি। বাড়ির পথে রুবি বলল, ”বাবুলের বিস্কুট ফুরিয়েছে কিনবে?”
”অভ্যেসটা ছাড়াও, এক বছরের ছেলেকে ওসব না খাওয়ানোই ভাল।”
”তোমার গেঞ্জি ছিড়েছে।”
”এখানো কটা দিন চলবে।”
”মার কাল একাদশী।”
”আঃ এই তো তোমার দোষ। একটু আগে বললে না কেন, তাহলে আসার পথে নেমে কিনে নিতুম। এখন কে আবার যাবে? কালকে বরং কাউকে দিয়ে আনিয়ে নিও।”
একতলা ভাড়াটেদের বৌ-এর সঙ্গে সিড়িতেই রুবির দেখা হল। দাঁড়িয়ে পড়ল।
”তোমার ছেলে কি দুরন্ত না হয়েছে। এসেছিল আমাদের ঘরে । এটা টানে, ওটা হাঁটকায়। এই মাত্তর ঘুমোল, তা কেমন দেখতে?’’
”বিরাট কলোনি, আর কি ফাঁকার উপর। হুহু করছে হাওয়া, মনে হয় যেন সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে আছি। ফিরতেই ইচ্ছে করে না।”
”এখনই এতখানি, বাড়ি হলে না জানি কি হবে।”
”তাই তো ভাবছি, না জানি কি হবে। বিরাট বিরাট বাড়ি, কেউ ম্যাজিস্ট্রেট, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ প্রফেসর ওর মধ্যে আমাদের মত মানুষ গিয়ে কি করে বাস করবে, তাই ভেবে এখনই তো বুক কাঁপছে। পাশের জমিটাই এক জজের।”
ঝকমক করছে রুবির মুখ। কথায় আধো আধো ভাব।
”তোমার ছেলে একপাটি জুতো ফেলে গেছে নিয়ে যাও।”
জুতো নিয়ে রুবি দোতলায় এল। দু’খানি ঘর। বাইরের লোক এলে সামনের ঘরে বসে। রাত্রে নিখিলের বুড়ি মা শোয়। ভিতরেরটি বড়। খাট, আলমারি আছে। রান্নাঘর, বারান্দার ধারে টিনের চালাটা।
বছর পনেরোর একটি ছেলে বাইরের ঘরের চেয়ারে বসে। শীর্ণ হাত-পা, ড্যাব ড্যাবে চোখ। চেয়ারের হাতল ধরে পা বেকিয়ে মাথা নিচু করে রয়েছে। রুবি ভিতরের ঘরে গেল। নিখিল জামা ছেড়ে লুঙ্গি খুজছে।
”মন্টু, ছোট কাকার ছেলে, ওকে বোধ হয় তুমি দেখনি।”
”কি জানি ওরা তো অনেক ভাইবোন। কি জন্যে এসেছ?”
”একটা চিঠি এনেছে, দেখ তো কি লেখা।”
থুতনি নেড়ে টেবিল দেখাল নিখিল। রুবি চিঠিটা তুলে পড়তে শুরু করল।
” কি লিখেছে?”
লুঙ্গিটা মাথার উপর দিয়ে গলিয়ে দাঁতে চেপে সাবধানে, কাপড়ের পাট রক্ষায় নিখিল ব্যস্ত ছিল হঠাৎ চমকে উঠল,”কি বললে? ছোটকাকীর কি হয়েছে?”
”খুব অসুখ, বাড়াবাড়ি যাচ্ছে।”
”তা আমি কি করব?”
রুবি চিঠি থেকে আবৃত্তি করল-
”এদিকে আমি তো অকর্মণ্য, পঙ্গু।”
”মাতলামি করে গাড়ি চাপা পড়েছিল।”
”সুবোধ মাসে ষাট টাকার বেশি সংসারে দিতে পারে না।”
”ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়ে বখামি শুরু করে, এখন বুঝি মোটর কারখানায় ঢুকেছে।”
”প্রবোধ ঈশ্বরের দয়ায় স্কুল ফাইন্যাল পাশ করিয়া নাইট কলেজে পড়িতেছে। দুইটা টিউশানিও করে।”
”এছেলেটা ওদের মধ্যে খুব ভাল।”
”সোনা এবং মোনার জন্য পাত্র খুজিতেছি কিন্তু উহারা লেখাপড়া জানে না, দেখিতেও ভাল নয়। বুঝিতেই পারিতেছ আজকালকার বিবাহের বাজারে উহাদের পার করিবার মত সঙ্গতিও আমার নেই। তাহার উপর তোমার কাকীমার ভীষণ অসুখ, বোধহয় বাঁচিবে না।”
”ও বাড়িতে ওই একটি মাত্র মানুষ, সারা জীবন দুঃখে দুঃখে কাটাল, তবু মুখ ফুটে একটা কথা বলে নি। মুখ সর্বদাই হাসি। আমায় খুব ভালবাসত।”
”ডাক্তার একরূপ জবাবই দিয়েছে। বাঁচাইতে হইলে যে অর্থের প্রয়োজন তা আমার নাই। তোমার কাকিমা সর্বদাই তোমার কথা বলে। তুমি তাহাকে যেরূপ ভালবাস, তাহার গর্ভের সন্তানও সেরূপ ভালবাসে না। একথা সে প্রায়ই বলে। তোমার পিতা মারা যাওয়ার পর যে মনোমালিন্য দেখা দেয়, তা তোমার কাকিমার চেষ্টাতেই বেশি দূর গড়াইতে পারে নাই। তোমার হয়তো এখনো ধারণা থাকিতে পারে, সম্পত্তি ঠকাইয়া লইয়াছি, কিন্তু রাধারমনের নামে দিব্যি করিয়া বলিতে পারি, এক কানাকড়িও ঠকাই নাই। বসত বাড়িটিও বাঁধা পড়িয়াছে এতগুলি সন্তানের মুখে অন্ন যোগাইবার জন্য। কিন্তু আজ বাঁধা দিবার মতও আর কিছু নাই। তুমি বংশের মুখোজ্জ্বলকারী সন্তান। ভাল চাকরী কর, আয়ও শুনিয়াছি ভালই হয়। তোমার কাকিমাকে সুস্থ করিয়া তোলার জন্য আামাদের থেকে তোমার দুশ্চিন্তাই বেশি হওয়া স্বাভাবিক। তাই সুনীলকে পাঠাইতেছি যদি-”
”টাকা।”
রুবি একবার তাকিয়ে নিঃশব্দে চিঠির বাকি অংশটুকু পড়ে নিয়ে ঘাড় নাড়ল।
”সেই রকমই বোধ হচ্ছে।”
লুঙ্গিটা পরা হয়ে গেছে। নিখিল গম্ভীর হয়ে খাটে বসে পড়ল। ওঘর থেকে কথার শব্দ আসছে। মন্টুর সঙ্গে মা কথা বলছে।
চিঠিটা ভাঁজ করে রেখে রুবিও নিখিলের পাশে বসল। দুজনে পাশাপাশি সামনের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকল। ঘাড় ফিরিয়ে আলমারির আয়নার দুজনের চোখাচোখি হল। তারপর দুজনেই ঘাড় শক্ত করে বসে থাকল। দরজার কাছে গলা খাকারির শব্দে রুবি উঠে দাঁড়াল, শ্বাশুড়ি।
”অনেকক্ষণ এসেছে, প্রায় ঘন্টা দুই।” অস্ফুটে নিখিলের মা বললেন। মেঝের দিকে তাকিয়ে নিখিল বলল, ”তা কি করব?”
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি আবার বললেন, ”দুদিন ধরে নানা জায়গায় ঘুরেছে, মামার বাড়ি গিয়ে পায় নি। পিসীর বাড়িতেও না, শেষে এখানে এসেছে।”
”তাতো বুঝলুম, কিন্তু আমি কি করতে পারি।”
অসহায়োর মতো নিখিল অগত্যা রুবির দিকে তাকাল। সেও তারই দিকে তাকিয়ে। দরজার কাছ থেকে আবার অস্ফুটে উনি বললেন, ”মুখ দিয়ে রক্ত উঠছে, থাইসিস হয়েছে। অনেকদিনই তো না খেয়ে থাকত।”
”মা বাবুলের দুধ গরম করে রেখেছেন?” ধড়মড় করে রুবি বলে উঠল। নিখিলও সচকিতে তাকাল।
