”এইটে আমাদের জমি।”
”কই?”
”এইতো।”
সন্তর্পণে শূন্যে হাত বুলোল নিখিল।
”পিলার কই?”
হঠাৎ রুবি আর্তনাদ করে উঠল।
”পিলার!”
চমকে উঠে বুনোগাছ আর লম্বা ঘাস মাড়িয়ে নিখিল ছুটে গেল। উবু হয়ে গুপ্তধন পাওয়ার মত জমি আঁচড়াতে থাকল। নেই। হামা দিয়ে কিছুটা এগোল। নেই। দুহাতে ঘাসের চাপড়া টেনে তুলতে শুরু করল। নেই। উঠে ছুটে গেল আর এককোণে।
রুবিও পা চেপে চেপে খুজতে শুরু করল। কাদা লাগছে শাড়িতে। হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে তুলল। ঝুকতেই আঁচলটা মাটিতে পড়ল। বুকের কাছে দুহাতে জড়ো করে আরও নিচু হল।
”কোথায় জমি?”
মুখ তুলে ফ্যালফ্যালে চোখে নিখিল তাকাল। চারপাশে চোখ বুলিয়ে বিড়বিড় করে কি বলল।
”কোথায় জমি?”
চীৎকার করল রুবি। নিখিল আরও একটু সরে গিয়ে খুঁজতে শুরু করল। কাটাগাছ ওপড়ানোয় আঙুল মুখে দিয়ে নিখিল দাড়াল।
”ওরা তো বলেছিল করে দেবে।”
রুবি শুনেত পেল না। প্রায় মাটি শুকতে শুকতে সে এগোচ্ছে। হঠাৎ থমকালো। দুহাতে ঘাস সরিয়ে অস্ফুটে বলল, ”এইতো।”
”পেয়েছ?” ছুটে এল নিখিল। রুবির পাশে বসে মুখটা মাটির কাছা-কাছি এনে বলল, ”পশ্চিমে! আমাদের প্লট নম্বর পচিশই তো, না চব্বিশ?”
”পচিশ।”
”ঠিক মনে আছে?”
ঘাড় নেড়ে রুবি বলল, ”রেজিস্ট্রির দিনই তো তুমি বললে, পচিশে ডিসেম্বর যীশুর জন্মদিন। পচিশে আগস্ট প্রমোশনের চিঠে পেয়েছি, পচিশে মে বাবুল জন্মেছে। মনে নেই?”
”বাকি তিনটেও তাহলে আছে।”
প্রথমটির থেকেও কম সময় লাগল বাকি পিলার খুজে বার করতে। তার মধ্যে একটি ভাঙা, ইটগুলে চুরি হয়ে গেছে। নিখিল অস্বস্থি বোধ করল। চারদিকে চারটে না থাকলেও জমির মালিকানা স্বত্ব নষ্ট হবে না, তবুও সাবধান হওয়া ভাল, কালই ব্যবস্থা করব এই ভেবে তিন পিলারের মাঝে দাঁড়িয়ে নিখিল হাসল। বলল, ”এই হল জমি।” বুকে ভরে নিশ্বাস নিল। উদ্ধত ভঙ্গিতে গ্রীবা তুলে চারধারে তাকাল। পাশের স্ত্রীলোকটিকে লক্ষ্য করে হাসল।
”এতক্ষলে স্বস্তি পাওয়া গেল।” চারপাশের পৃথিবীতে চোখ ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে রুবি আচল রাখল কাঁধে, ”যা ভয় ধরেছিল।”
”ভয়, ভয় কিসের? টাকা দিয়েছি, দলিলও আছে। জিনিসটা লোপাট হবার মত নয়। জমি হচ্ছে আবহমান কালের, থাকবেও চিরকাল। তবে একটা ভয় রয়েছে পাশের জমির মালিক হয়তো খানিকটা ওই ভাঙা পিলারের দিক থেকে চুরি করে দখল করতে পারে। এ পাশের জমিটা কিনেছে এক আই.এ.এস আর এইটে ব্যারাকপুর কোর্টের মুন্সেফের। পেছনেরটা বায়না করে রেখেছে এক সাব-এডিটর। সব খোজ নিয়ে রেখেছি।”
”তবু নজর রাখা ভাল।”
”নিশ্চয় মাঝে মাঝে এসে দেখে যেতে হবে।”
দূরে কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে বোধ হয় জমি দেখতে এসেছে। কয়েকজন যুবক বেড়াতে বেড়াতে এক জায়গায় বসল। একটা লরী এসে থামল, ইটে বোঝাই। লাউডস্পীকারে কোথাও রেকর্ড বাজছে, অস্পষ্ট শোনা যায়। একটা চিল মাটিতে ছোঁ মেরে কি তুলে নিয়ে গেল। কুকুরটা যেতে যেতে থমকে চিলটাকে দেখল। তারপর সবুজ ধান চারার মাঠ লক্ষ্য করে দুলকি চালে এগিয়ে গেল।
”এখানে সাপ থাকতে পারে, সরে এস।”
নিখিল সরে এল। ”কোথাও যদি বসার মত একটা জায়গাও থাকত।”
দুজনে চারধারে তাকিয়ে খুজে পেল না। তাই উবু হয়ে বসল জমির কিনার ঘেষে।
”এখন মাটি আলগা, জলে কিছুটা বসবে, রোদ খেয়ে শক্ত হবে।”
”তখন ভিৎ খোড়া হবে?”
স্মিত হাসল নিখিল। বাতাসের বিরুদ্ধে চোখ রেখে নিমীলিত করল। পাঞ্জাবীটা বুকের সঙ্গে লেপটে গেছে। উচু হয়ে উঠেছে মানিব্যাগ।
”দোতলায় ভিৎ করে প্রথমে একতলা তুলতে হবে। কেন জান? পরে দরকার হলে দোতলা তুলে একতলাটা ভাড়া দেওয়া যাবে। ধর আমি মরে গেলুম, তখন তুমি ভাড়ার টাকায়–”
”আহা, কথার কি ছিরি।”
স্মিত হাসি, নিমীলিত চোখে নিখিল আবার বলল, ”ইন্সিওরের টাকাতেই দোতলা তুলতে পারবে।”
”থাক খুব হয়েছে।”
”প্ল্যানটা সেই ভাবেই করব। সিড়িটা এমনভাবে হবে যাতে একতলার সঙ্গে দোতলার কোন সম্পর্ক না থাকে তাহলে বাড়াটেদের সঙ্গে গোলমাল হবার চান্স থাকবে না।”
”এখানে বাড়ি ভাড়া কেমন?”
”তা পুরো একতলা, অবম্য আমাদের মত ছোট বাড়ির, দুশো টাকা তো হবেই।”
শুনে রুবিও বাতাসের বিরুদ্ধে চোখ রাখল। কিছুক্ষণ পরে বলল, ”হাওয়ায় কি রকম সোঁ সোঁ আওয়াজ হয় দেখেছে। ঠিক কানের গোড়াতেই।”
”বলেছিলাম না, মনে হয় সমুদ্রে এসেছি। কি খোলামেলা, যতদূর ইচ্ছে তাকাও, যত বড় ইচ্ছে নিশ্বাস নাও, মনে হয় যেন দ্বিগুণ হয়ে গেছি।”
”রান্নাঘরে যাতে হাওয়া আসে সে ব্যবস্থা কিন্তু রাখতেই হবে।”
খড় খড় করে উঠল ঘাস। কিছু একটা চলে যাচ্ছে।
ওরা ভয় পেল। নিখিল বলল,” এবার যাওয়া যাক।”
”পিলারের কাছের ঘাসগুলো পরিষ্কার করে দিলে হত।”
”পরে হবে, আর একদিন রোদ থাকতে থাকতে আসা যাবেখন।”
আসার সময় ওরা একটা খালি ট্যাক্সি দেখতে পেয়ে তাকাল। ট্যাক্সিটা তাই দেখে আস্তে হয়ে পড়ল। নিখিল হাত নেড়ে না করে দিল।
”এক পয়সা, দু’পয়সা করেই টাকা জমে। কষ্ট হবে হোক। পরে দেখবে সেই কষ্টের ফল ভোগ করতে কেমন লাগে। অন্তত তিরিশ হাজার টাকা না হলে বাড়ি তৈরিতে নামা চলে না। মাল মশলার দাম যা বেড়েছে দিন দিন।”
”এমনিই তো কত খরচ কমিয়ে দিয়েছি।”
জোরে হেঁটে এসে ওরা বাসে উঠল। সন্ধ্যা উতরে গেছে। ছুটির দিন বলেই শহরতলীর বাসে ভিড়। নিখিল বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুকে পড়ে কলোনিটার দিকে তাকাল।
