তোমায় আমি বরং মাসে মাসে কিছু দিয়ে সাহায্য করব, মামলা করে দরকার নেই।
অমলার মনে হল প্রভাস যেন প্রায়শ্চিত্ত করতেই কথাটা বলল। ওর ভঙ্গিতেও অপরাধী অনুকরণ। দেখে মায়া হয়, সংসার নিয়ে যেমন আছে থাকুক।
তার দরকার নেই। মনে হবে তোমায় ভয় দেখিয়ে আদায় করেছি।
অমলা আর দাঁড়াল না। বোকামি করেছি কি? আনমনে ভাবতে ভাবতে সে বাড়ির দিকে চলল। মায়া হয়। প্রভাস এখনও বুকে মোচড় দেয়, ও এখনও অমানুষ হয়ে যায়নি। এর থেকে বেশি আর কী চাইবার আছে? এ বয়সে এ জেনেই সুখ। কিন্তু আমি কী করব এখন? শেষে কি ভিখিরির মতো হাত পেতে খোরপোশ নিতে হবে। বয়স প্রায় পঞ্চাশ হতে যাচ্ছে, এখন আর কোনোরকমে বোকামি করা চলবে না। প্রভাসের প্রস্তাবটা এক কথায় নাকচ করাটা বোধ হয় ঠিক হল না।
রাস্তা পার হবার জন্যে সে দাঁড়িয়েছে, পিছন থেকে দিদিমণি বলে সরস্বতীবালা ডাক দিল! অমলাদের বাড়িতে কাজ করত, মেজোবউ মাস তিনেক আগে হঠাৎ ছাড়িয়ে দেয়।
দিদিমণি বাড়ি যাচ্ছ নাকি, চলো আমিও যাব।
কেন গো?
হেস্তনেস্ত করব একটা, নয়তো আত্মঘাতী হব। দ্যাখো ছোটোবাবু কী সর্বনাশ করেছে আমার। সরস্বতীবালা দেহের সামনে থেকে আঁচল সরাল।
কদ্দিন! অমলা আঁতকে উঠল।
চার মাস। এখন আমি কী করব বললা তো, ললাকে সন্দেহ শুরু করেছে। ছোটোবাবু বলেছিল আলাদা ঘর ভাড়া নিয়ে আমায় রাখবে।
চোখে জল নিয়ে কথা শুরু করে গনগনে রাগে শেষ করল সে। অমলা সিঁটিয়ে গেল কেলেঙ্কারির কথা ভেবে।
আমার একটু কাজ আছে সরস্বতী, আমি যাই।
বলেই অমলা হাঁটতে শুরু করল। ব্যাপারটা জানাজানি হলে অবস্থাটা কী দাঁড়াবে? কমল যদি বুদ্ধিমান হয় তাহলে টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করুক ওর। এসব মেয়েমানুষরা তো টাকা পেলেই খুশি। তবে কমল টাকা পাবে কোত্থেকে? তা যদি থাকত আলাদা বাসা করে বিয়েই করতে পারত। এখন যদি এই ঝিটাকেই বিয়ে করে বসে!
হাঁটতে হাঁটতে অমলা বাগবাজারের দিকে চলে এসেছে। আর কিছুটা গেলেই প্রফুল্লর দোকান। আজকেই কথা বলে দেখি, মানসম্মান নিয়ে বসে থাকলে এ বয়সে চলে না। তেজ দেখাবার বয়স চলে গেছে, লজ্জা কীসের, বিয়ে তো হয়েছিল, এই ভেবে অমলা দোকানের সামনে দাঁড়াল।
খদ্দের ভেবে এগিয়ে এসে প্রফুল্ল কাউন্টারে ঝুঁকে বলল, বলুন।
বাইশ বছর দেখেনি, সুতরাং পরিচয় না দিলে চিনতে পারবে না। নিজের নাম বলতে অমলার সংকোচ হল।
কিছু কিনতে আসিনি। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে সে বলল।
চশমার পুরু কাচের পিছনে প্রফুল্লের দুটি চোখ বিস্ময় প্রকাশ করতে করতে, হঠাৎ সংবিৎ পেয়ে তীক্ষ্ণ হয়ে গেল। দোকানের আলো মলিন। সামগ্রীগুলোও মলিন। এর মধ্যে দাঁড়িয়ে অমলার যাবতীয় উত্তেজনা স্বাভাবিক হয়ে গেল।
তাহলে কী চাই?
স্বরে গাম্ভীর্য পরিমাপ করে অমলা বুঝল, চিনতে পেরেছে।
কথা ছিল।
প্রফুল্ল একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। ডান গালের আঁচিলটার হ্রাসবৃদ্ধি ঘটেনি, গোঁফটা আগের থেকেও মোটা, জামার কলারে ময়লা, নখগুলো বড়ো, চামড়া খসখসে। এইসব জিনিস অমলাকে একদা বিরক্ত করেছিল। এখন সে তাই বোধ করল।
আমার সম্বন্ধে কী ভেবেছ? স্পষ্ট করে উচ্চারণের জন্য অমলা কেটে কেটে বলল।
আমার তো ভাবার কথা নয়।
স্ত্রীর সম্পর্কে স্বামী ভাববে, এটাই তো নিয়ম।
স্ত্রীরও তো নিয়ম মানার অনেক কিছু আছে। তা ছাড়া তুমি যে আমার স্ত্রী, কে বলল?
আইন।
ওঃ, আইন দেখাতে এসেছ! বোধ হয় তার কাছ থেকেই তালিম পেয়েছ?
ঝগড়া করার জন্য প্রফুল্লর অবয়ব প্রস্তুত হয়ে উঠেছে। অমলা ধীরকণ্ঠে বলল, তার কাছ থেকে তালিম পেলে এখানে না এসে কোর্টেই যেতাম।
প্রফুল্ল থতমতো খেল। বিচলিত হয়েছে বোঝা গেল হঠাৎ ঝাড়ন নিয়ে প্লাসটিক ব্যাগগুলো ঝাড়ার বহর দেখে। এই সময় এক খদ্দের এল পাঁউরুটি কিনতে। অমলা একধারে। সরে দাঁড়াল। যাবার সময় লোকটি অভিযোগ করল, কালকের রুটি শক্ত বাসি ছিল।
কোম্পানি যেমন দেয়, আমি কী করব বলুন?
কোম্পানিকে জানান।
লোকটি চলে যেতেই অমলা বলল, তাহলে কী? ভাইদের সংসারে আছি। তাদের অবস্থা এমন কিছু ভালো নয়। এই বয়সে রোজগারই-বা কী করব? শাড়ি-গয়না চাই না, খাইখরচের টাকাটা তো দেবে।
কেন, আর কেউ কি দেবার নেই?
আর কেউ মানে?
প্রফুল্ল চুপ করে রইল। অমলা কাউন্টারে চাপড় দিয়ে বলল, তোমাকে দিতে হবে।
যদি না দিই?
তাহলে মামলা করে আদায় করব।
যদি বলি তুমি স্বেচ্ছায় গেছ, আমি বরাবরই তোমাকে কাছে রাখতে রাজি ছিলাম, এখনও আছি।
বলব মিথ্যাকথা। বলব প্রমাণ করো যে আমি স্বেচ্ছায় চলে গেছি। বলব, আর একটা বিয়ে করার জন্য আমায় তাড়িয়ে দিয়েছ; বলব, এখনও আমি তোমার কাছে যেতে চাই।
এ সবই তো মিথ্যাকথা। তোমাকে নিয়ে যাবার জন্য কি তোমাদের বাড়ি আমি যাইনি? কী বলেছিলে মনে আছে কি? —যখন দরকার বুঝব যাব। দু-বছর অপেক্ষা করে তবেই বিয়ে করি। সেই চিঠিগুলো যদি তোমায় ফেরত না দিতাম, তাহলে কি বলতে পারতে প্রমাণ করার কথা?
চিঠিগুলো রাখনি কেন?
বোকামি করেছি।
খদ্দের ঢুকতেই প্রফুল্ল থেমে গেল। জুতোর ক্রিম চাইছে। সঙ্গে সঙ্গে নেই বলে দিয়ে কাউন্টারের ডালা খুলে সে বেরোল। দোকানের দরজার পাল্লা বন্ধ করে মাত্র একটুখানি খুলে রাখল।
দাঁড়িয়ে কেন, এই টুলটায় বসো।
অমলা বসল, কী কাজে লাগবে ভেবেছিলে?
প্রফুল্ল কাউন্টারে কনুই ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, অন্তত ওগুলো দিয়ে বাধ্য করতে পারতে তোমাকে বিয়ে করতে।
