সিঁড়িতে পিছলে পড়ে মা যেদিন মাথায় চোট পেল সেদিন থেকেই অমলার ভাবনামা তো আর বাঁচবে না, তাহলে কী হবে? একদিন পনেরো টাকার টিউশনিতে যাবার পথে এই কথা ভাবতে ভাবতেই সে হাজির হল প্রভাসের বাড়ি।
প্রভাস মক্কেলের সঙ্গে কথা বলছিল, অমলাকে দেখে অবাক হল; কেননা গত চব্বিশ বছরের মধ্যে অর্থাৎ প্রভাসের বিয়ে হওয়ার পর পাঁচ-ছ বারের বেশি তাদের সাক্ষাৎ ঘটেনি। মক্কেলটি বিদায় নিতেই অমলা গম্ভীর হয়ে বলল, একটা ব্যাপারে পরামর্শ নিতে এলুম।
প্রভাস তার পেশাগত গাম্ভীর্য মুখে ছড়িয়ে তাকিয়ে রইল।
মা-র অবস্থা তো গত কয়েক মাস থেকেই সুবিধের নয়। মারা গেলে আমি কী করব?
কী করব মানে?
আমার ভাইদের তো জান, তখন আমি কোথায় দাঁড়াব? ঘর জুড়ে থেকে কমলের বিয়ে বন্ধ করে আছি, ওর বিয়ের বয়স তো পেরিয়ে যাচ্ছে। মেজো বউ আমাকে দেখতে পারে না, অথচ মেজদাই সংসারের বড়ো খুঁটি। বড়দা আর সুবল কোনোক্রমে দিন চালায়। মা আছে। তাই আমিও আছি, কিন্তু মা বেশিদিন আর বাঁচবে না।
মোটা পেনসিলটা টেবলে ঠুকতে ঠুকতে প্রভাস পেশাদারি পরামর্শ দিল–তোমার উচিত খোরপোশ দাবি করে মামলা করা, বহুদিন আগেই অবশ্য করা উচিত ছিল।
কিন্তু স্বামী তো আমায় ত্যাগ করেনি, আমিই চলে এসেছিলাম।
শুনেছি আবার বিয়ে করেছে। তোমায় যখন ডিভোর্স করেনি তাহলে আইনের চোখে সে বিয়ে অবৈধ, তুমিই তার বৈধ স্ত্রী। আর কে কাকে ত্যাগ করেছে সে নয় উঁকি লে বুঝবে, মোটকথা তোমার ভরণপোষণে সে এখনও বাধ্য।
অমলা ঘাড় হেঁট করে চিন্তা শুরু করল। প্রভাস নাগাড়ে ঠক ঠক করে যাচ্ছে। দেমাক দেখিয়ে যার কাছ থেকে চলে এসেছে এই বাইশ বছর পর তার কাছেই হাত পাততে হবে এটা ভাবতে অমলার অস্বস্তি হচ্ছে। অন্য কিছু উপায়ে যদি একটা ব্যবস্থা করা যায়…
কী, রাজি নও? ভারী গলায় প্রভাস জানতে চাইল।
তাই তো ভাবছি।
পরিহাস করে প্রভাস বলল, মামলা-টামলা না হলে উকিলদেরই-বা চলে কী করে? দু চারটে ফি তো খাব।
অমলা হেসে বলল, মামলা করার টাকা কোথায়? ওটা তোমাকেই দিতে হবে।
গম্ভীর হল প্রভাস, পেশাগত গাম্ভীর্যটা আবার মুখে লাগিয়ে বলল, আগে তুমি বরং দেখা করো। কী বলে শোনো, যদি কিছু করতে রাজি না হয় তখন মামলার কথা ভাবা যাবে। ও কোথায় থাকে তা জান তো?
বাড়ি জানি না, ভাড়াবাড়িতে থাকে। তবে দোকানটা জানি। মনোহারী দোকান
বাগবাজারে।
তাহলে আগে সেখানে গিয়েই দেখা করে কথা বলল।
অমলার মনে হল তার থেকে বরং মামলা করাই ভালো। সামনাসামনি দাঁড়িয়ে আমাকে খেতে-পরতে দাও বলার মতো লজ্জা আর কী থাকতে পারে। কিন্তু মামলার খরচ কে দেবে?
মামলার খরচ তুমিই দাও-না। অমলার অজান্তে স্বরটা কাকুতির মতো শোনাল।
আমার ফি নয় ছেড়ে দিলুম, কিন্তু কোর্ট খরচ তো আছে।
আশ্চর্য! হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠল অমলা, আমার এই অবস্থার জন্য দায়ী কে? আর কয়েকটা টাকার জন্য সাহায্য করবে না?
প্রভাস এমনভাবে তাকাল যেন শেখানো সাক্ষীটি বক্সে উঠে উলটো কথা বলছে। কে দায়ী, আমি?
তোমার চিঠিগুলোই তো সর্বনাশ করে ওর হাতে পড়ে।
সে তো আর তোমায় তাড়িয়ে দেয়নি। এই তো বললে—নিজেই চলে এসেছি।
হ্যাঁ, তোমার ওপর ভরসা করেই চলে এসেছিলুম।
আমি তো তোমায় চলে আসতে বলিনি, কোনো চিঠিতে কি সেরকম কথা ছিল? বোকামি করেছ যেমন তার ফল তো ভোগ করবেই।
অমলা থিতিয়ে গেল। প্রভাসের মুখে বিরক্তি, অস্বস্তি। শীতকালেও কপালে ঘাম ফুটল, দুটো কাঠি ভেঙে সিগারেট ধরাল।
চিঠিগুলো কি তোমার স্বামী রেখে দিয়েছে?
না।
কী বলেছিল? শুধু বলেছিল, একেই কেন বিয়ে করলে না। ওকে বলিনি যে তুমি আগেই বিয়ে করেছ, বড়োলোকের একমাত্র মেয়েকে।
তাতে কী হয়েছে, প্রভাস জবরদস্ত সাক্ষীর মতো রোখা সুরে বলল, তোমার কি হিংসে হচ্ছে? লীলার বাবা না হলে কি ওকালতিতে দাঁড়াতে পারতাম?
আমি ওসব ভেবে বলিনি, তুমি চটছ কেন? অমলা টেবলে কনুই রেখে ঝুঁকে পড়ল।
গলার স্বর দ্রুত নামিয়ে প্রভাস সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে বলল, চটেছি কে বলল? বয়েস পঞ্চাশ পেরোল, এসব ব্যাপার নিয়ে চটাচটি করার ইচ্ছেও হয় না। অল্প বয়সে ছেলে মেয়েতে মেলামেশা হয়, বিয়ে-থা করে সেসব ভুলে যায়। তুমিই-বা ভুলে যাওনি কেন?
আমি পারিনি প্রভাস, আমি পারিনি।
হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠল অমলা।
থামো। প্রবাস রূঢ় ধমক দিল, কান্নাকাটি কোরো না। মনে রেখো, আমার স্ত্রী, ছেলে মেয়েরা এ বাড়িতে রয়েছে। তোমার মামলা আমি করে দেব, একটি পয়সাও লাগবে না, এখন এসো।
কান্নার যে-ইচ্ছেটা অমলাকে পেয়ে বসেছিল, তা প্রভাসের দ্রুত একটানা কথাতে মুছে গেল। ক্ষীণ স্বরে বলল, যা সব লিখেছিলে তার সব মিথ্যে ছিল?
কী যেন বলতে গিয়ে প্রভাস থেমে গেল। টেবলে গ্লাসভরা জল রয়েছে। এক চুমুকে শেষ করে গ্লাস হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, মুখে মাথায় জল দিয়ে ফিরল।
আমি যাচ্ছি, অমলা উঠে দাঁড়াল। প্রভাস স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, আমার কাজকর্ম, ভাবনাচিন্তা সব কিছুরই একটা ছক তৈরি হয়ে গেছে অমু, তা ভেঙে বেরোনোর সাধ্য এখন আর আমার নেই। আমি সুখে আছি, আমায় তাই থাকতে দাও, আমায় কিছু মনে করতে বোলো না।
অমলা নিরুত্তরে দাঁড়িয়ে থেকে দেখল, প্রভাসের কেশবিরল মাথাটা নুয়ে পড়ল টেবিলের উপর। ঘর থেকে বেরিয়ে যখন সে সদর দরজায় পৌঁছেছে, তখন ছুটে এল প্রভাস।
