আমার তো বিয়ে হয়ে গেছল। ওরও হয়ে গেছল। ওসব চিন্তা আমি করিনি, করে লাভ হত না।
তোমার না হোক আমার তো হত। তাহলে খোরপোশের কথা আজ উঠত না। এই তো দোকান দেখছ, মাসে কতই-বা রোজগার, বড়োজোর শ-দুই টাকা। এর থেকে চল্লিশ কা করে যদি দিতে হয়, তাহলে আমার সংসার অচল হয়ে পড়বে। তা ছাড়া এখন যদি বলি তোমাকে নিতে রাজি আছি, আসবে তুমি? পারবে আমার সংসারে থাকতে?
প্রফুল্ল চোখ সরিয়ে গণেশমূর্তিটার উপর রাখল। অমলা ইতস্তত করে কোনোক্রমে বলল, ছেলে-মেয়ে ক-টি?
বড়োটি মেয়ে, আঠারোয় পড়ল। সম্বন্ধ করছি, তবে সকলেরই খাঁই বেশি। পরে চার ছেলে, সবাই পড়ছে। এই আয়ে চালাতে পারি না অমলা। ভিখিরিরও অধম হয়ে থাকি। করুণভাবে প্রফুল্ল তাকিয়ে রইল। অমলা বাধ্য হল অন্যত্র তাকাতে।
ওরা কি আমার কথা জানে?
জানে।
কী বলে?
তোমায় নিয়ে কোনো আলোচনাই হয় না।
আর কেউ কিছু বলে না?
গীতা তোমায় শুধু এক বার দেখতে চেয়েছিল। আমি বলেছিলুম কিনা তুমি ওর থেকেও সুন্দরী।
অমলা উঠে দাঁড়াল। প্রফুল্ল ধড়মড়িয়ে সিধে হয়ে বলল, চললে?
হ্যাঁ।
তুমি কী করবে?
কী আর করব, আমাকে তো বাঁচতে হবে। তোমরা সবাই বলছ বোকামি করেছি। এখন মনে হচ্ছে সত্যি তাই করেছি।
তুমি দাবি করবে? তা অবশ্য পারো। কিন্তু সেটা ফাঁকি দিয়ে ঠকিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কিছু হবে না। কী করেছ স্ত্রী হিসাবে, যেজন্য দাবি জানাতে পার?
ফ্যাকাশে মুখে শুনে যাচ্ছিল অমলা, প্রফুল্লের ভাবভঙ্গিতে ভয় পেল। হয়তো ঝাঁপিয়ে গলা টিপে ধরতে পারে। দরজার দিকে এগোতেই প্রফুল্ল দরজা আগলে দাঁড়াল।
যেতে দাও। নইলে চেঁচিয়ে লোক জড়ো করব।
অমলা, আমার সংসারের এই সামান্য আয়ে ভাগ বসিয়ো না। জোড়হাতে মিনতি করছি, ছা-পোষা মানুষ আমি!
তাহলে আমি কী করে বাঁচব! এই বলে ধাক্কা দিয়ে প্রফুল্লকে সরিয়ে অমলা রাস্তায় নেমে এল। ওর সঙ্গে যাবার জন্য কয়েক পা এগিয়ে, দোকান খোলা আছে খেয়াল হতেই প্রফুল্ল দাঁড়িয়ে পড়ল। অমলা ঊর্ধ্বশ্বাসে হেঁটে শীঘ্র দূরে চলে যেতে যেতে ভাবল, এমন একটা জায়গা কি কোথাও নেই, যেখানে মাথা কুটে রক্তারক্তি করা যায়।
বাড়ি ফিরে অমলা নিঃসাড়ে দোতলায় উঠল। মেজোবউয়ের ঘরের দরজায় তালা, বোধ হয় সিনেমা দেখতে গেছে। বড়োবউ দালানে বাচ্চার দুধ গরম করছে। ফিসফিস করে অমলা জিজ্ঞাসা করল, কেউ এসেছিল?
কে আবার আসবে। বড়োবউ কাজে মন দিল। অমলা তিন-তলার সিঁড়ি ধরল। যেখানে বাঁক নিয়েছে সিঁড়িটা, একফালি চাতাল বেরিয়ে গেছে। কমল তার ক্যাম্প-খাটে শুয়ে আছে দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে। ওর পাশ দিয়ে পা টিপে অমলা উপরে উঠে গেল।
মাঝরাতে অমলার মনে হল সিঁড়িতে কী-যেন একটা হচ্ছে। বিছানা থেকে উঠে পা টিপে সিঁড়ির মাথায় এসে উঁকি দিল। অন্ধকারটা চোখে সয়ে যাবার পর বুঝল, উঁচুমতো কিছু একটার উপর দাঁড়িয়ে একটা ছায়ামূৰ্তি কড়িকাঠে কিছু-একটা বাঁধছে। কমলকে ধমক দেবার জন্য নিশ্বাস টেনে এবং ওকে ব্যাঘাত না করে বিছানায় ফিরে এসে অমলা সেই নিশ্বাস ত্যাগ করল।
চতুর্থ সীমানা
”তাকিয়ে দেখ, সমুদ্র তাই না? মনে হচ্ছে যেন আকাশটা গড়িয়ে পড়েছে।”
রুবি স্বামীর কথা অনুসরণ করে চোখটাকে আকাশ বরাবর উত্তর-দক্ষিণ করিয়ে ঘাড় নাড়ল। রাস্তা সোজা চলে গেছে। মাঝখানে খানিকটা উঁচু হয়ে থাকায় এবং তার ওপারে গাছপালা বাড়ি ইত্যাদি না থাকায় সত্যিই মনে হয় আকাশটা মাটির দিকে নেমেছে।
”যেখানে আকাশটা মাটি ছুচ্ছে ওখানেই জমিটা।” বেসরকারী বাস ওদের নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে। ওরা রাস্তা পার হবার আগে এই নতুন কলোনিটার দিকে তাকিয়ে এই সব মুগ্ধ হয়ে রাস্তা পার হল।
কাঁচা ড্রেনের উপর সিমেন্টের সেতু। পার হয়ে কলোনির সদর। সোজা রাস্তাটাই রাজপথ, কলোনিকে দুভাগ করে ‘এ’ এবং ‘বি’ ব্লক তৈরি করেছে। বাস চলাচলের রাস্তার ধার থেকেই বাড়িগুলো তৈরি হতে হতে পিছু হটেছে। প্রায় আধাআধি বাড়িতে ভরে গেছে। পিছন দিকে এখনো মাঠ। মাটি পড়ছে জমি ভরাট হচ্ছে। দুচার বর্ষা না গেলে আর বাড়ি উঠবে না।
বাঁ হাতে কোঁচাটা একটু তুলে নিখিল ছোট্ট একতলা বাড়িটাকে থুতনি দিয়ে দেখিয়ে বলল,”ইউনিভার্সিটির প্রফেসারের বাড়ি। ওর মত ইকনমিস্ট ইন্ডিয়াতে খুব কম আছে।”
রুবি বাড়িটার দিকে তাকিয়ে সমীহভরে বলল, ”বড়লোক?”
”খুব নয়, তবে দিল্লীতে প্রায়ই ডাক পড়ে।”
ওরা পাশাপাশি হাঁটতে থাকল। রুবির জুতোটা নতুন। এখনো খাপ খায় নি। নিখিল সিগারেট ধরাতে দাঁড়াল। রুবি বাড়িগুলো দেখতে দেখতে বলল,”ফাঁকা ফাঁকা ঘেষাষেঘি নয়।” দুটো কাঠি নিভেছে, তৃতীয়টা জ্বালাতে অপেক্ষা করছে বাতাস পড়ে যাওয়ার সুতরা্ং নিখিল জবাব দিল না।
কয়েকজন গৃহিণী গল্প করতে করতে বড় রাস্তায় নামল কাছেরই একটা বাড়ি থেকে। তারা একবার পিছু ফিরে তাকালও। গৃহিণীদের পিছনে রুবি এবং নিখিল হাঁটতে শুরু করল।
”এরা সব এখানকারই?”
”নয়তো কোথাকার হবে!”
রুবি হোঁচট খেল। ভ্রু কুচকে নিখিল দেখল রাস্তার খোয়াটাকে। গৃহিণীরা কি কথায় যেন খুব হাসছে।
‘‘ওরা রোজ বেরোয় বোধহয়।’’
‘‘বেরোবে না কেন, বেড়াবার এমন রাস্তা রয়েছে, বেশি গাড়ি চলে না, ভিড়ও নেই।’’
‘‘দোকানপাঠও তো কম।’’
‘‘নতুন জায়গা, একি কলকাতার মত পুরানো? সবই হবে, আস্তে আস্তে সব হবে। লোকজন আরও আসুক।’’
বড় রাস্তাটা থেকে দুধারে ছোট ছোট সমান্তরাল রাস্তা বের হয়ে গেছে। রাস্তার ধারে সিমেন্ট বাঁধান খোলা ড্রেন, ইলেকট্রিকের খুটি। লঙ্গীপরা এক মাঝবয়সী লোক বাড়ির সামরেন ড্রেন খোঁচাচ্ছে বাখারি দিয়ে। ছাতে বাচ্চা কোলে বৌ। বাজারের থলি হাতে একজন পাশের রাস্তা থেকে বেরোল, একটু ব্যস্ত। গৃহিণীরা তাকে কি জিজ্ঞাসা করতেই লোকটি বলল, নিখিল রুবি তখন তাদের অতিক্রম করে যেতে শুনল, ‘‘হঠাৎ এসে পড়েছে, আজকেই গৌরীকে নিয়ে যাবে।’’
