ওমা, তাহলে তো বেশ কালো।
আপনি কালো হলে আমরা তো বেশ কালো।
নিখিল হাস্যমুখে শশাঙ্কের দিকে তাকিয়ে সমর্থন চাইল। শশাঙ্ক বড় করে ঘাড় নাড়ল। রঙের প্রশংসায় পুলকিত সন্ধ্যা বলল, দেখেছেন চা দিতেই ভুলে গেছি।
সন্ধ্যা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই নিখিল বলল, শশাঙ্ক, একটা খুব অসুবিধায় পড়ে গেছি। জিজ্ঞাসু নেত্রে শশাঙ্ক তাকিয়ে রইল। তখন নিখিল আদ্যোপান্ত ব্যাপারটা বলে টেবলের ওপর রাখা কাগজের থলিটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ওর মধ্যেই সেটা রয়েছে।
শশাঙ্ক চড়াং করে সিধে হয়ে বসল। তার মানে, তুমি ওই কুৎসিত জিনিসটা আমার টেবিলের উপর রেখেছ? নামাও নামাও, বলছি। দাঁত চেপে হিসহিস করে শশাঙ্ক আঙুল দিয়ে মেঝে দেখাল। নিখিল নামিয়ে রাখল।
কী করতে এখানে এনেছ? চাপাস্বরেই শশাঙ্ক বলল, ভিতরের দিকে চোখ রেখে।
এটাকে নিয়ে কী করব ভেবে পাচ্ছি না।
ফেলে দেবে, আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দেবে।
বলাটা তো খুবই সোজা, ফেলতে গেলেই লোকে দেখে ফেলবে। তখন চিৎকার হবে, একগাদা লোক জমবে, টানতে টানতে হাজার হাজার লোকের মধ্য দিয়ে থানায় নিয়ে যাবে। অশ্লীল কথা বলাবলি করবে।
তা আমার কী করতে হবে?
এটার একটা বন্দোবস্ত করে দে, শশাঙ্ক, প্লিজ। তোর কথাতেই বিয়ে করেছিলুম। এবার তুই আমার কথা রাখ। নিখিল হাত বাড়াল শশাঙ্কের হাত চেপে ধরার জন্য। হাত দুটো তার আগেই শশাঙ্ক তুলে নিয়েছে। টেবলে নিখিলের দুটো হাত থলিটার পাশে পড়ে রইল।
আমার কথাতেই কি শুধু বিয়ে করেছিলি? সুমিত্রাকে তোর পছন্দ হয়নি?
নিশ্চয়, ওকে নিশ্চয় ভালোবেসেছিলুম, আজও বাসি। কিন্তু তোর সঙ্গে ওর একটা সম্পর্ক ছিল তাও জানি।
তাই এক্সচেঞ্জ করতে এসেছিস এই জিনিসটার বদলে। শশাঙ্ক থলিটার দিকে আঙুল তুলেছে তখন চায়ের কাপ হাতে সন্ধ্যা ঢুকল।
কীসের এক্সচেঞ্জ? হাসিমুখে সন্ধ্যা একটা চেয়ারে বসল।
নিখিল বলছিল তুমি যদি গোটা কতক গান শোনাও। তাইতে বললুম বউয়ের শাড়িটা তার বদলে দিতে হবে।
আহা, পছন্দ করে উনি কিনেছেন। আর গান যা গাই সে এমন কিছু নয়।
সন্ধ্যা মেয়েটি ভালো। এরপর খুব বেশি সাধাসাধি করতে হয়নি। খালি গলায় তিনটি গান করল। শশাঙ্ক উঠে দাঁড়িয়ে বলল, নিখিলকে একটু এগিয়ে দিয়ে আসি। পাঞ্জাবিটা দাও।
ওরা দুজন চুপচাপ পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। রাত হয়েছে। রাস্তায় লোকজন কম। দোকান গুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আলোর পরিমাণ খুবই অল্প। নিখিলের মনে হল, রাস্তার যেকোনো জায়গায় থলিটা রেখে নির্বিবাদে চলে যাওয়া যায়।
ওটা দে। শশাঙ্ক দাঁড়িয়ে পড়ল।
কেন!
ওই ডাস্টবিনটায় ফেলে দি।
সে তো আমিও পারতুম, তাহলে তোর কাছে এলুম কেন?
তবে কী মতলব তোর? হঠাৎ শশাঙ্ক গলার স্বর ও দাঁড়াবার ভঙ্গি পালটে ফেলল। নিখিল পা-পা করে পিছোল। দূরে পানের দোকানটা মাত্র খোলা। এখন থলি হাতে ছুটতে শুরু করলে চোর বলে ধরা পড়তেই হবে। নিখিল দাঁড়িয়ে রইল।
তুমি এখন সুমিত্রার বিয়ে করা স্বামী। শশাঙ্ক ওর বুকের জামা মুঠো করে ধরল, তুমি এই জিনিসটার বৈধ অভিভাবক, তার সার্টিফিকেটও পকেটে আছে। অতএব এর সম্পূর্ণ দায়িত্ব তোমার। আমার দায়িত্ব বহুদিন আগে শেষ হয়েছে। তবুও আমার কাছে কেন এসেছ? নিখিলকে ঝাঁকাতে শুরু করল শশাঙ্ক।
তুই আমার ঘাড়ে দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছিস। তুই কাওয়ার্ড, তুই ইররেসপনন্সিবল। নিখিল মরিয়া হয়ে উঠল শূন্য প্রয়ান্ধকার রাজপথে। শশাঙ্কর হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য ধাক্কা দিল। বদলে জোর চড় মারল শশাঙ্ক। এইবার ক্রোধে দিশেহারা হয়ে মারবার জন্য নিখিল ঝাঁপিয়ে পড়ল।
হঠাৎ জানালা খুলে দোতলা থেকে এক পুরুষকণ্ঠ গর্জে উঠল, কী হচ্ছে, অ্যা, গুণ্ডামি? লোকটা চিৎকার করে উঠল! দুড়দাড় করে কিছু লোকের ছুটে আসার শব্দ এল অন্ধকারের মধ্য থেকে।
নিখিল আর চিন্তা করার সুযোগ নিজেকে দিল না। প্রাণপণে রাস্তার নির্জন দিকে ছুটতে শুরু করল। ছুটতে ছুটতে যখন দম ফুরিয়ে এল, থামল। তখন পায়চারি করতে করতে এক কনস্টেবল তার কাছে এসে কেন সে এমন করে হাঁপাচ্ছে তার কারণ জানতে চাইল। নিখিল বলল, একটা গুণ্ডা তাকে তাড়া করেছিল। কনস্টেবলটি কিছুক্ষণ সেইদিকে তাকিয়ে থেকে আচ্ছা ঠিক হ্যায় বলে পায়চারি করতে করতে চলে গেল।
নিখিল এইবার টের পেল কাগজের থলিটা তার কাছে নেই। ছোটার সময়ও হাতে ছিল না। সেটি শশাঙ্কর কাছেই রয়ে গেছে। শশাঙ্ককে লোকগুলো জিজ্ঞাসা করলে ও নিশ্চয় বলবে গুণ্ডা তাড়া করেছিল। গুণ্ডা নিশ্চয়ই সুদৃশ্য কাগজের থলিতে ভরা কাপড়ের প্যাকেট ফেলে যায়নি। লোকগুলো খুব খুশি হয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করবে, ভাগ্যিস আমরা এসে পড়লুম তাই ভদ্রলোকের এই জিনিসটা রক্ষে পেল। এই বলে তারা তার থলিটা শশাঙ্কর হাতে তুলে দেবে।
নিখিল বুকপকেটে হাত দিয়ে সার্টিফিকেটটা অনুভব করে ভারি আরাম পেল। এবং সে মনশ্চক্ষে দেখল, শশাঙ্ক সেই থলিটা হাতে নিয়ে হেঁটে চলেছে।
ঘর
চারটি ভাই এবং তাদের বউ-ছেলে-মেয়েরা থাকতেও অমলা জানে পৃথিবীতে তার একটি মাত্র ভরসা অন্ধ বুড়ি মা-টি। ছাদের এই ঘরটিতে সে থাকতে পারছে যেহেতু মাকে দেখাশোনা করার আগ্রহ কারুর নেই; এবং মা বলেই বারান্দায় ফেলে না রেখে আস্ত একটি ঘরে থাকতে দিয়েছে। ছোটোভাই কমলের আজও বিয়ে হয়নি, কারণ আলাদা কোনো ঘর নেই। মা মারা গেলে অর্থাৎ তিন-তলার ঘরটি খালি হলে তার বিয়ের উদ্যোগ করা হবে। মেজোবউয়ের দূর সম্পর্কের আত্মীয়া একটি মেয়েকে পছন্দ করে রাখা হয়েছে।
