পূর্ণিমার মনে হল টেলিফোনটা জ্যোতির হাত থেকে পড়ে গেল। বার কয়েক হ্যালো হ্যালো বলে সে সুরেনের দিকে ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে বলল, তোমার কৌটোটা জ্যোতি নিয়ে গিয়ে সব খেয়েছে। আমি যাব ওর কাছে, এখনি আমি যাব।
সুরেন ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। পূর্ণিমার হাত থেকে টেলিফোনটা নিয়ে কানে দিল। সাড়াশব্দ পেল না।
তুমি আমায় এখনি নিয়ে চলো। এখনও গেলে ওকে বাঁচাতে পারব।
দাঁড়াও। এখন ট্যাক্সি পাব কি পাব না..বাড়ি তো ভবানীপুর থানার আণ্ডারে, ওদের খবর দিচ্ছি।
পুলিশ পৌঁছোতে দেরি করেনি। আর সেইজন্যই জ্যোতি বেঁচে গেল। হাসপাতালে দু-দিন রেখে প্রসাদ ওকে বাড়িতে নিয়ে আসে। জ্যোতির সঙ্গে হাসপাতালে কাউকেই কথা বলতে দেওয়া হয়নি, পূর্ণিমা বাড়িতে ওকে দেখতে যায়। বিছানায় শোয়া জ্যোতি হাসবার চেষ্টা করে বলল, আমি মরলুম না কেন বল তো?
ভগবান চাননি তাই। হয়তো তাঁর অন্য কোনো ইচ্ছা আছে।
জ্যোতি গভীর দৃষ্টিতে তার বন্ধুর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ বন্ধ করে। চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। পূর্ণিমা আঁচলে জল মুখে নিয়ে ওর মাথায় হাত বোলাতে লাগল।
তোকে আর নিজের সম্পর্কে কিছু ভাবতে হবে না, আমিই যা ভাবার, যা করার করব। তোকে আমি সুখী করবই।
কর। জ্যোতি সান্ত্বনা দেবার জন্য হাসল।
ছায়া চ্যাটার্জি থাকে কোথায় রে?
ঠিক জানি না। শুনেছিলাম পার্কসার্কাসে থাকে।
ওর কোনো ছবি তোর কাছে আছে?
না। কেন?
এই সময় প্রসাদ ঘরে ঢুকল। পূর্ণিমার আর জবাব দেওয়া হল না।
এর তিন সপ্তাহ পর রবিবার বিকেলে পূর্ণিমা বারান্দায় গাছের টবে জল দেবার সময় গ্রিলের ফাঁক দিয়ে দেখতে পেল, সাদা একটা মরিস মাইনর ইন্দ্রনগরে ঢোকার জন্য বাঁক নেবার আগে পানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। গাড়ির চালককে দেখা যাচ্ছে না তবে তার পাশে বসা শ্যামবর্ণা স্ত্রীলোকটির মুখের কিছুটা পূর্ণিমা দেখতে পাচ্ছে। খুবই সাধারণ, দ্বিতীয় বার না তাকানোর মতোই লম্বাটে মুখ, বয়স সম্ভবত ত্রিশের দু-এক বছর এধার ওধার-গলায় কানে অলংকার নেই। খোলাচুল সিথির দু-ধারে নামানো। ঘন প্রচুর চুলেই পূর্ণিমার চোখ আটকে গেল। দোকানি ব্যস্ত বিগলিত হয়ে পানের খিলি ভরা একটা কাগজের দোনা চালককে দিয়ে গেল। তারপর আবার দিয়ে গেল বোধ হয় মিঠামশলা। স্ত্রীলোকটি হাত পেতে চালকের কাছ থেকে মশলা নিয়ে মুখে দিল।
মোটরটা বাঁক নিয়ে ইন্দ্রনগরে যখন ঢুকছে পূর্ণিমা তখন চালকের মুখটি দেখতে পেল এবং কিছুক্ষণ পাথর হয়ে রইল তার মাথাটা। প্রসাদ!
পানওয়ালার হাবভাব দেখে তার মনে হল প্রসাদকে সে চেনে। মিনিট দশেক পর পূর্ণিমা পান কিনতে দোকানটায় এল। খিলিটা হাতে নিয়ে সে বলল, একটু আগে একটা সাদা গাড়িতে করে এসে এক ভদ্রলোক পান কিনলেন, চেনা চেনা মনে হল।
উনি তো প্রসাদ ঘোষ। বিরাট গাইয়ে, বিরাট নাম। ইন্দ্রনগরে নতুন যে গানের স্কুলটা সেখানে প্রতি রোববার শেখাতে আসেন। আমার কাছ থেকে পান নিয়ে ঢোকেন। শোনেননি ওঁর গান?
নিশ্চয় শুনেছি। স্কুলটা কোথায় বলুন তো?
এই তো সোজা গিয়ে, দুটো রাস্তা ছেড়ে থার্ডটার মোড়ে একটা লন্ড্রি, ঠিক তার পাশের বাড়ি, সাইনবোর্ডে গীতিপ্রসাদ লেখা।
কতদিন হল স্কুলটা হয়েছে?
তা মাস খানেক কী আর একটু কমই হবে। একদম নতুনই। ওর পাশে মোটরে যে মহিলা বসেছিলেন তাঁরই স্কুল। প্রসাদ শেখায় বলে খুব ছাত্র-ছাত্রী হয়েছে।
এইটুকুই যথেষ্ট। পূর্ণিমা ধরেই নিল প্রসাদের পাশে যাকে দেখেছে সে-ই ছায়া চ্যাটার্জি। তবু নিশ্চিত হবার জন্য সে ইন্দ্রনগরে ঢুকল। আগে কখনো সে এখানে পা দেয়নি। রাস্তার একধার দিয়ে ড্রেনের পাইপ বসানোর কাজ চলছে। মাটির ঢিপির পাশ দিয়ে সাইকেল রিকশার চাকার ধাক্কা সামলে প্রায় ষাট-সত্তর মিটার হেঁটে সে লন্ড্রির সামনে পৌঁছোল। পাশ দিয়ে যে-রাস্তাটা ভিতরে ঢুকেছে তার প্রথম বাড়ির সামনেই সাদা মোটরটা দাঁড়িয়ে।
বাড়িটা একতলা। বুক সমান উঁচু ছোট্ট লোহার গ্রিলের ফটক। একটুখানি বাগান, বারান্দা, জানলায় পর্দা-লাগানো দুখানা ঘর। ফটকের পাশে পাঁচিলের হলুদ রং-করা কাঠের তক্তায় সাদা অক্ষরে লেখা, গীতিপ্রসাদ। তার নীচে, প্রতি রবিবার বৈকাল ৫টা থেকে ৮টা। বারান্দায় দুটি বেঞ্চে কয়েক জন স্ত্রীলোক বসে। ঘরের ভিতর দেখা যাচ্ছে না তবে গান ও হারমোনিয়ামের শব্দ ভেসে আসছে। পূর্ণিমা ভিতরে গিয়ে কাছের থেকে ছায়া চ্যাটার্জিকে দেখে আসবে কি না ভেবে ঠিক করতে পারছে না। প্রসাদ যদি তাকে দেখে ফেলে। এটা সে কোনোমতেই চায় না।
বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে এক মা পূর্ণিমার পাশ দিয়ে ফটকের দিকে যাচ্ছে। তাকে থামিয়ে সে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা এখানে কি বড়োদেরও গান শেখানো হয়?
হয় বোধ হয়, আপনি ভেতরে গিয়ে ছায়াদিকে জিজ্ঞেস করুন-না।
ছায়াদি!
ছায়া চ্যাটার্জি, প্রসাদ ঘোষের ছাত্রী। উনিই স্কুলটা করেছেন।
পূর্ণিমা সোজা বাড়ি ফিরে না এসে ইন্দ্রনগর থেকে বেরিয়ে জনু যেখানে থাকে সেই নন্দ কলোনির দিকে গেল। জনুর ঘরটাকে চেনে না। মাঝবয়সি একটি স্ত্রীলোক টিউবওয়েলে জল ভরছে। পূর্ণিমা তাকে জিজ্ঞাসা করতে সে হাত তুলে দেখাল, আর খানিকটা এগিয়ে ডান দিকে একটা পেঁপে গাছ, ঘরের চালে দু-তিনটে কুমড়ো, ওইটে জনুর ঘর।
জনু ঘরে নেই। বছর বারোর মেয়েটি পূর্ণিমাকে চেনে। সে বলতে পারল না, তিন বাড়ির কাজ সেরে মা কখন ফিরবে। পূর্ণিমা তাকে বলে এল, তোমার মা ফিরলে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলে দিয়ো। খুব দরকার। পারলে আজই যেন দেখা করে।
