উনুনে দুধ চাপিয়ে এসেছি। এই বলে পূর্ণিমা দ্রুত রান্নাঘরে চলে আসে। তার পিছু নেয় জ্যোতি।
আমি আর ঘুমোতে পারি না পুনি। চোখ বন্ধ করলেই ওই মাগিটার মুখ ভেসে ওঠে। এ যে কী দুঃসহ কষ্ট তোকে বোঝাতে পারব না। কিছু-একটা কর, না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কি আমি মরে যাব? টস টস জল ঝরল জ্যোতির গালে।
প্রশস্ত রান্নাঘরের কোণে সিমেন্টের আল দেওয়া ছোট্ট জায়গাটায় বসে বাসন মাজছে ঠিকে-ঝি জোনাকি। বিবাহিতা, রুগণা, মুখটিতে পরিশ্রমের ও দারিদ্রের ঝামেলা থাকলেও শ্ৰী আছে।
জনু তাড়াতাড়ি ডেকচিটা মেজে দাও।
জনুর অবাক হয়ে জ্যোতির দিকে তাকিয়ে থাকাটা প্রত্যাহত হল। পূর্ণিমা চায় না বাইরের কেউ তার বন্ধুর লজ্জার ও দুঃখের কথা জানুক।
জ্যোতিকে শোবার ঘরে পাঠিয়ে দিয়ে সে জনুর অবশ্যম্ভাবী কেতুহলী প্রশ্নগুলোর গোড়া কেটে দেবার জন্য নিজের থেকেই বলল, আমার ছেলেবেলার বন্ধু, দুই বোনের মতো ছিলুম। বিপদে আপদে ও ছুটে আসত, এখনও আসে। আমিও যাই।
কী বিপদ বউদি, উনি কাঁদছেন যে?
স্বামীর সঙ্গে খটাখটি, যা হয়ে থাকে।
জনু নিজের কাজে মন দিল এবং পূর্ণিমাও। কিছুক্ষণ পর জনু আপনমনে বলার মতো স্বরে বলল, স্বামীর সঙ্গে খটাখটি থেকে শেষকালে কী কান্ডই যে হয়ে যায়। আমার ছোটোননদ মলি, পাশের কলোনির গৌতমের সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে ফিরে এল। সবার আপত্তি ছিল বিয়েতে, গলা নামিয়ে জনু ফিসফিস করে বলল, ছেলেটা মাডার করে। দু-বার পুলিশ ধরে নিয়ে গেছল বাড়ি থেকে, জেলও খেটেছে।
তা খটাখটি থেকে কী কান্ড হল? পূর্ণিমা দুধে চাল ঢালার আগে এক বার তাকাল জনুর দিকে। হাতের কাজ বন্ধ করল জনু।
গৌতম সন্দেহ করত মলিকে, চরিত্রটা তো খুব ভালো নয়। বউদি ওকে তুমি দেখনি, হিন্দি সিনেমার রেখাকে দেখেছ তো, ঠিক ওইরকম দেখতে। গৌতমের আগে আরও অনেকের সঙ্গে মিশেছে। বিয়ের পরও একজনের সঙ্গে ভাব শুরু করেছিল। এই নিয়েই দুজনের খটাখটি হত, মারধরও চলত। শেষে কী হল জান? জনু নাটকীয়ভাবে কথা বন্ধ করল। পূর্ণিমা কৌতূহলভরে ঘুরে দাঁড়াল।
ছেলেটাকে একদিন লোডশেডিংয়ের সময় অন্ধকারে ধরে এই তোমার বাড়ির সামনেই, তখনও তোমরা এখানে আসনি, রাস্তার ওপর মাথায় অ্যাসিড ঢেলে দিল।
ই-ই-ই মাগো! পূর্ণিমা শিউরে উঠল। কী মানুষ গো, একটা লোকের মাথায়…!
তাহলে আর বললুম কী, মাডার করে। এই যে কসবায় ট্যাক্সিওলাটা খুন হল, ও তো গৌতমের কাজ। ইলেকশনে ইন্দর নগরে পিস্তল চালাল তো ওই টাকা দিলে ও মানুষ খুন। করে দেবে।
তা মলি এখন কী করছে? সেই ছেলেটা মরে গেছে না বেঁচে আছে?
বেঁচে আছে। ওকে তো গৌতম মারতে চায়নি। মাস দুই পরে মলিকে নিয়ে গেছল ছেলেটার বাড়িতে। বাইরে থেকে ডাকতেই ছেলেটা বেরিয়ে আসে। ওকে দেখেই মলির ভিরমি লেগে মাথা ঘুরে যায়। বাড়ি এসে বমি করে, একহপ্তা ভালো করে খেতে পারেনি।
কেন? পূর্ণিমা হঠাৎ আগ্রহ বোধ করল মলির এইরকম প্রতিক্রিয়ার কারণ জানতে।
অ্যাসিডে মুখের আধখানা গলে গিয়ে কী ভয়ংকর যে…। জনু চোখ বন্ধ করে ফেলল।
পূর্ণিমা চাপা স্বরে বলল, তুমি দেখেছ?
না বাবা, আমার আর দেখে কাজ নেই। মলির কাছেই শুনেছি একদিকের গাল কান আর চোখ প্রায় নেইই, কেউ যেন চেঁচে কামিয়ে দিয়েছে। নাকে শুধু দুটো ফুটো। লাল দগদগে..
থাক থাক আর বলতে হবে না।
পূর্ণিমা শোবার ঘরে এসে দেখল জ্যোতি বুকে বালিশ দিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে।
ঘুমোচ্ছিলিস?
ঘুম আমার হয় না। জ্যোতি উঠে বসল।
ওনাকেও ইদানীং এই রোগ ধরেছে। পূর্ণিমা ড্রেসিং টেবলের ড্রয়ার থেকে একটা ছোটো অ্যালুমিনিয়াম কৌটো বার করে জ্যোতিকে দেখিয়ে ড্রয়ারে রেখে বলল, খেতে হয়। অসম থেকে ট্রাক আসছিল, মালদার কোথায় অ্যাকসিডেন্ট করেছে তাই কাল দৌড়েছে। ফিরে এসেই ক-দিন নির্ঘাত খেতে হবে।
জ্যোতি চোখ বন্ধ করে বসে রইল। কথা বলছে না। দাঁতে দাঁত চাপার জন্য চোয়ালের হাড় এক বার প্রকট হল। রগের কাছে শিরা ফুলে দপ দপ করছে। ঢোঁক গিলল।
গরম পায়েস খাবি? লক্ষ করতে করতে পূর্ণিমা বলল।
দে।
পূর্ণিমা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই জ্যোতি চোখ খুলে ড্রয়ারের দিকে তাকাল।
সেদিনই রাত এগারোটা নাগাদ পূর্ণিমা জ্যোতিকে ফোন করল বিপন্ন কণ্ঠে; স্লিপিং পিলের কৌটোটা খুঁজে পাচ্ছি না রে, ওর দরকার, না খেলে ঘুমোতে পারবে না, তুই কি…
হ্যাঁ।
পূর্ণিমার কানের মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ ঢুকে তাকে কয়েক সেকেণ্ড অসাড় করে রাখল। তারপরই চিৎকার করে উঠল, না জ্যোতি না, এমন কাজ করিসনি, জ্যোতি করিসনি, জ্যোতি ভুল করিসনি। আমি তোর সুখের ব্যবস্থা করব জ্যোতি, কথা দিচ্ছি তোকে…
পুনি এগারোটা ছিল, এইমাত্র সব ক-টাই খেয়েছি।
হাউহাউ করে কেঁদে উঠল পূর্ণিমা। তার স্বামী সুরেন ছুটে এল।
পুনি, হ্যালো হ্যালো। …প্রসাদ তো বিয়ে করবে আবার, তুই আমার বাবু, বান্টা আর মণিকে তোর কাছে নিয়ে যাবি এই আমার শেষ চাওয়া তোর কাছে।
জ্যোতি এ তুই কী করলি? মাউথপিসে ঠোট ঠেকিয়ে পূর্ণিমা কান্না-জড়ানো গলায় বলল। আমি তোর ব্যবস্থা করব, তোকে কথা দিচ্ছি। তুই ফোন কর ডাক্তারকে, বাড়িতে প্রসাদ থাকলে তাকে ডাক, হাসপাতালে নিয়ে যাবে। জ্যোতি দেরি করিসনি।
আমি একটা চিঠি লিখে যাব। এক লাইন, আমার মৃত্যুর জন্য…তারপর কী লিখব রে? আমার সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে, কী লিখব বল তো? কেউ দায়ী নয়, নাকি আমার স্বামী দায়ী? প্রসাদকে ডুবিয়ে গেলে কি ভগবানের কাছে।
