রাত আটটা নাগাদ জনু এল। কী ব্যাপার বউদি, ডাকতে গেছলে কেন? খুব দরকার বলেছ!
ছেলে আর সুরেন টিভি দেখছে। জনুকে বারান্দায় ডেকে এনে পূর্ণিমা কোনো ভণিতা না করে বলল, গৌতমকে দরকার, আমার একটা কাজ ওকে করে দিতে হবে।
জনু হতভম্বের মতো তাকিয়ে বলল, তোমার দরকার! গৌতমকে?
হ্যাঁ। সে জন্য যা টাকা লাগবে দেব।
কী দরকার গো বউদি? জনুর স্বর ষড়যন্ত্রীর মতো নীচু হয়ে গেল।
সে এখন বলা যাবে না। কর্কশ গলায় পূর্ণিমা বুঝিয়ে দিল কৌতূহল তার পছন্দ হচ্ছে না। তুমি কি ওকে বলতে পারবে আমার সঙ্গে কালই এক বার দেখা করতে?
গৌতম এখন বাড়িতে না অন্য কোথাও এসব নোক ঘরে তো কমই থাকে। আমারও ছছাটো ছেলেটার সকাল থেকে বমি আর পায়খানা–
তার কথা শেষ হবার আগেই পূর্ণিমা দাঁড়াও বলে শোবার ঘরে ঢুকল এবং আধ মিনিটের মধ্যে ফিরে এসে জনুর হাতে কুড়ি টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিল।
চুপচাপ যাবে। গৌতমকে বলবে দুপুরে আসতে। ওকে চিনি না, এসে যেন বলে জোনাকি পাঠিয়ে দিয়েছে, তাহলেই বুঝব।
খারাপ কাজ কিছু নাকি বউদি? জনুর স্বরে আবার কৌতূহল ফুটে উঠল।
খারাপ নয়, একদমই নয়। একজনের খারাপ কাজ বন্ধ করতে হবে, ভালো উদ্দেশ্যেই দরকার। এতে তোমার তো কোনো দায়দায়িত্ব থাকছে না, তুমি শুধু যোগাযোগটা করিয়ে দেবে। কাজটা হলে তোমাকে আরও পঞ্চাশ দেব। নিশ্চয় তুমি এটা নিয়ে কাউকে কিছু বলবে না।
না গো না, গৌতম কি তাহলে আমায় আর আস্ত রাখবে?
জনু চলে যাবার পরও পূর্ণিমা বারান্দার গ্রিল ধরে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ইন্দ্রনগরের মোড়ের দিকে। কিছু লোক আর যানবাহন, অস্পষ্ট শব্দ আর আবছা আলো ছাড়া তার চেতনায় আর কিছু পোঁছুচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর সে মুখটা তুলে বিড়বিড় করল, তোকে সুখী করব। একটু ধৈর্য ধর। সেই সময়ই লোডশেডিং হল তল্লাটজুড়ে। দীর্ঘশ্বাসের মতো একটা হা আ আ রব উঠে তখন ছড়িয়ে পড়তেই পূর্ণিমার গ্রিলধরা মুঠোটা শক্ত হয়ে উঠল।
পরদিন দুপুরে বারান্দায় অপেক্ষা করছিল পূর্ণিমা। দেখতে পেল জনুর সঙ্গে একটা লোক আসছে। তার মনে হল এই লোকটাই গৌতম। পায়ে চটি, খয়েরি রঙের সরু ফাঁদের ট্রাউজার্স যাতে ইস্ত্রির বালাই নেই, হাওয়াই শার্টটা নীল ও কালো ডোরাকাটা, পাতাকাটা চুল, গায়ের রং গাঢ় শ্যাম। পূর্ণিমা খুবই দমে গেল লোকটির স্বাস্থ্য দেখে। কঠিন অসুখ থেকে ওঠার পর মানুষ যেভাবে হাঁটে, রুগ্ন দেহটার চলন সেইরকম।
কাজের মেয়েটির ঘুম না ভাঙিয়ে পূর্ণিমা এক তলায় নেমে এল! সদর দরজা খোলামাত্র জনু বলে উঠল, বউদি এই হল গৌতম, কথা বলো, আমি কাজে যাচ্ছি। এই বলেই সে দোতলায় উঠে গেল কাজ করতে। পূর্ণিমার একটাই সমস্যা দেখা দিল, গৌতমের সঙ্গে তুমি না আপনি সম্বোধনে কথা বলবে।
দুটো ঠোঁট ঢেকে রাখতে পারে না সামনের লম্বা দাঁতগুলোকে, তাই বেরিয়েই থাকে কিন্তু গৌতমের মুখে রাক্ষুসে ধরনের ছাপ নেই। পূর্ণিমা সামান্য হতাশ হল। জনুর গল্প থেকে যে রকম একটা ধারণা ইতিমধ্যেই গড়ে ফেলেছে তার সঙ্গে গৌতমকে কোনোভাবেই সে মেলাতে পারছে না। এক-তলায় বসার ঘরে ঢুকে সোফার দিকে হাত বাড়িয়ে গৌতমকে সে বসতে ইঙ্গিত করল।
কেন দেখা করতে চাই সেটা আর জনুকে বলিনি, ওর কাছেই তোমার একটা ব্যাপার শুনে মনে হয়েছে আমার একটা কাজ তুমি বোধ হয় করে দিতে পারবে। অবশ্য সেজন্য টাকা দেব। চোখ-কান বুজেই প্রায় এক নিঃশ্বাসে পূর্ণিমা কথাগুলো বলে একটু সহজ বোধ করল। তারপরই খেয়াল করল সম্বোধন সমস্যাটা মিটে গেছে।
কী শুনেছেন আমার সম্পর্কে কোনোরকম ঔৎসুক্য নেই গৌতমের চাহনিতে ও কণ্ঠস্বরে। স্বরটা ভরাট। চোখের পাতা দুটোই শুধু সামান্য নেমে মণির আধখানা ঢেকে দিল। পূর্ণিমার মনে হল ভণিতা ও শোভনতার জন্য সময় নষ্ট করার সময় এখন নয়। সোজাসুজি কাজের কথাতেই যাওয়া উচিত।
তুমি একজনকে মুখে অ্যাসিড ঢেলে দিয়েছিলে, জনু আমায় বলেছে।
অসিত। তা হয়েছে কী? এটা তো পুরোনো ব্যাপার!
হয়েছে এই যে, পূর্ণিমা চেয়ার থেকে উঠে এসে সোফায় বসল। এইরকম একটা কাজ আমার জন্য করে দিতে হবে।
গৌতমের বসাটা ঢিলেঢালা থেকে খাড়া হয়ে উঠল। কেন?
যে কারণে অসিতকে শাস্তি দিয়েছ ঠিক সেই কারণেই। তবে এক্ষেত্রে একটা মেয়ে। আমার খুব ক্ষতি করেছে, করে যাচ্ছে।
আপনি আপনার নিজের স্বামীকে সামলাতে পারেন না? গৌতমের ভৎসনাটা পূর্ণিমার কাছে অপ্রত্যাশিত। কিন্তু সে নিজেকে ম্রিয়মাণ দেখাবার চেষ্টা করতে করতেই লক্ষ করল গৌতম তার বুক থেকে পেট পর্যন্ত দ্রুত জরিপ করে বোঝার চেষ্টা করছে স্বামী বেহাত হওয়ার কারণটা।
অনেক কাজই আমি করি, তাতে জানের ভয় আছে রিক্স আছে কিন্তু টাকা পেলে সব কাজই করে দিই। থেমে থেমে গৌতম বলল, চোখটা ভেজানো দরজার দিকে রেখে।
কত নেবে?
আগে শুনি কাজটা কেমন। অ্যাসিডের কারবারে ঝামেলা অনেক। চেম্বার দিয়ে হাসিল করা বরং অনেক সোজা। পলিটিক্যাল পার্টির সঙ্গে কানেকশন থাকলে তো আরও ঝামেলা।
না না, কোনো পাটিফার্টির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। একদমই নিজস্ব ব্যাপার।
অ্যাসিডের কাজ আমার এলাকার বাইরে গিয়ে আমি করি না, এতে খুব হ্যাপা আছে।
ইন্দ্রনগরে সে আসা-যাওয়া করে। আর এটা তো তোমারই এলাকা!
হ্যাঁ।
এখানেই তো তাহলে কাজ সেরে ফেলতে পারবে।
যত সহজে বললেন, ব্যাপারটা কিন্তু অত সোজা নয়। নিজের এলাকা হলে কি রিক্স থাকবে না? জনুবউদি আপনাকে কতটা কী বলেছে জানি না, তবে অসিতের কেসটা ছিল আমার নিজের বউকে নিয়ে, টাকার জন্য নয় তাই রিক্সের পরোয়া করিনি। গৌতম অনুত্তেজিত স্বরে বলে গেল। নিজের এলাকায় হলে মিনিমাম পাঁচ হাজার নেব। দেখুন, কেন, কী উদ্দেশ্যে আপনি করতে চান, বা মেয়েছেলেটার নাম কী, ঠিকানা কী এসব জানার কোনো ইচ্ছে আমার নেই, দরকারও নেই। ফ্যালো কড়ি মাখো তেল এই হচ্ছে আমার কথা। লেনদেনের ব্যাপারটা তাই গোড়াতেই ঠিক করে নেওয়া ভালো। আপনি যদি টাকায় এগ্রি না করেন তাহলে আমি এখুনি চলে যাব, করলে বাকি যা জানার জেনে নোব।
