পূর্ণিমার বাড়িটার বয়স ছয় মাসও নয়। তার স্বামী কাঠের ব্যবসায়ী। জ্যোতির এক বছর পর বিয়ে হয়ে পূর্ণিমা অসমে স্বামীর সঙ্গে চলে যায়। দুজনের মধ্যে যোগাযোগটা পত্র মারফত ক্ষীণভাবে ছিল। দশ বছর পর কলকাতায় ফিরে এসে পূর্ণিমাই টেলিফোন ডিরেক্টরি থেকে নম্বর বার করে ফোন করেছিল জ্যোতিকে।
কলকাতার উপকণ্ঠে ইস্টার্ন বাইপাসের কাছাকাছি সদ্য গড়ে-ওঠা এই বসতিটায় বাড়ির সংখ্যা বেশি নয়। কিছু বাড়ির নির্মাণকাজ চলছে। বহু প্লটেই শুধু ঝোপজঙ্গল, রাস্তার উপর দিকে পুরোনো বসত অঞ্চল। পল্লিগ্রামের মতো দুটো কলোনি আর প্রচুর ঝুপড়ি নিয়ে একটা
পাকা রাস্তা ভিতর দিকে গেছে। সেখানে ইন্দ্রনগর নামে একটি ক্ষুদ্র উপনিবেশ। প্রধান রাস্তাটি থেকে মাছের শিরদাঁড়ার কাঁটার মতো দু-ধারে সরু সরু রাস্তা বেরিয়ে গেছে। নানান আকারের ও গড়নের বাড়িগুলোর প্রায় সবই একতলা। কিন্তু ইন্দ্রনগরের বাসিন্দাদের শিক্ষা, রুচি, পেশা এবং আর্থিক সঙ্গতি এক স্তরের নয়। মোটর গাড়ি, স্কুটার ও সাইকেলের সহাবস্থান এখানে মামুলি দৃশ্য, চোখে পড়ার মতো নয়।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে জ্যোতি ইন্দ্রনগরের প্রবেশ রাস্তার দিকে আনমনা তাকিয়েছিল। সেখানে রাস্তার মোড়ে চাক বেঁধে রয়েছে ছছাটো-বড়ো কিছু দোকান আর আরোহীর অপেক্ষায় গুটিকয় সাইকেল রিকশা। চায়ের কাপ হাতে পূর্ণিমা বারান্দায় নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল। জ্যোতিকে পিছন থেকে কিছুক্ষণ লক্ষ করে সে বলল, অত ভাবছিস কেন, ভগবান আছেন তিনিই তোকে দেখবেন।
হ্যাঁ, এখন ভগবানই আমার ভরসা, আর তুই। আমার দিন রাত যে কী করে কাটে তোকে বোঝাতে পারব না। জ্যোতি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বিষাদমাখা চোখে তাকিয়ে থাকে। পূর্ণিমার মনে হল, তাদের এতকালের বন্ধুত্ব, যা মাঝের দশটা বছরে ঝাপসা হয়ে গেছিল, আবার যেন তা ঝলমলিয়ে ফিরে আসছে। জ্যোতির চোখ দুটো কোটরে ঢুকে নাকটা আরও খাড়া দেখাচ্ছে। চোখের কোলের ছোপটা ঢাকতে কিছু-একটা মেখেছিল যার রং এখন ফিকে হয়ে গেছে, হাতের গড়নে সেই নরম ভাবটা আর নেই। দুটো কাঁধ আড়ষ্ট লাগছে। চল্লিশে পৌঁছোতে এখনও অনেকটা বাকি, বুড়ি বুড়ি দেখাচ্ছে না ঠিকই তবে তারুণ্যের কোনো প্রমাণ চলাফেরা, চাহনি বা স্বরে আর নেই। পূর্ণিমার কষ্ট হল। কিন্তু বন্ধুর দুঃখ কী করে যে লাঘব করবে তার হদিস সে খুঁজে পাচ্ছে না!
ওর নাম কী? কতদিনের ছাত্রী? দেখেছিস ওকে?
ছায়া চ্যাটার্জি। হ্যাঁ দেখেছি। কতদিনের তা বলতে পারব না, তবে আমার বিয়ের আগে থেকে নয়। সবথেকে আমার অবাক লাগে কেন জানিস, মেয়েটাকে কুচ্ছিত দেখতে। দাঁত বার করা চ্যাপটা গোল মুখ, কয়লার মতো রং, রুগ্ন, এইটুকু খোঁপা, মোটেই মিষ্টি নয়। চলনসই গলা, দেখলে ঝি ছাড়া আর কিছু মনে হবে না। প্রসাদের টেস্ট যে এত নীচু হবে তা আমি কল্পনা করতে পারি না।
তুই এই নিয়ে আর ভাবিসনি। দু-দিন পরেই দেখবি প্রসাদের নেশা ছুটে গেছে।
এত বছরেও যা ছুটল না আর তুই বলছিস কিনা দু-দিনেই সেটা হয়ে যাবে! জ্যোতি অবিশ্বাসভরে মাথা নাড়ল। ব্যাপারটা তুই ঠিক করতে পারছিস না। পুরোপুরি ভগবানের হাতে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আমার আর কিছু করার নেই। রাক্ষুসিটা ক্যান্সারট্যান্সার বা অন্য কিছুতে যদি মরে যায় তবেই আমি শান্তি পাব। ঠাণ্ডা চা একচুমুকে শেষ করে জ্যোতি বলল, এবার আমি যাব। বড়োছেলের স্কুল থেকে ফেরার সময় হয়েছে। এখান থেকে ভবানীপুর কম দূর তো নয়!
ছোট্ট দুধসাদা রঙের মরিস মাইনরের দরজা খুলে জ্যোতি ড্রাইভারের পাশে বসল। পূর্ণিমা ঝুঁকে বলল, এত নামকরা লোকের এইটুকু গাড়ি কী রে! প্রসাদকে বড়ো একটা কিনতে বল।
এটা তো ছ-বছর আগে সেকেণ্ড হ্যাণ্ড কিনেছিল। এখন একটা কন্টেসা হয়েছে। মন কি শরাবি সুপার হিট করল তো প্রসাদেরই গানের জন্য, প্রসিউসার গাড়িটা দিয়েছে। কিন্তু ওর ফেভারিট এই খোকা গাড়িটা। এটা নাকি ওর খুব পয়া তাই রেখে দিয়েছে, নিজেই চালায়।
এবার যখন আসবি কন্টেসায় চড়ে আসবি। পাড়ায় আমার খাতির বাড়বে।
তোর এখানে আবার পাড়া কোথায়, কেমন ফাঁকা ফাঁকা।
আছে, ইন্দ্রনগরের লোকেরা তো এখান দিয়েই যাতায়াত করে। পূর্ণিমার সঙ্গে জ্যোতিও হেসে ওঠে।
গাড়ি রওনা করার জন্য ড্রাইভার যখন গিয়ার দিয়েছে জ্যোতি মুখ বার করে চাপা গলায় তখন বলে, আমি কিন্তু ভগবান নয় তোর ভরসায় রইলুম। কী করব বলে দিস।
গাড়িটা ছেড়ে দেবার পর পূর্ণিমা মাথা হেলিয়ে বলেছিল, বলব। কিন্তু বলা আর হয়নি। গত দু-বছরে জ্যোতি মাঝে মাঝে এসেছে। প্রায়ই ফোন করে একই কথা বলেছে; কখনো কাতর অসহায় স্বরে, কখনো রাগী তিক্ত কণ্ঠে। পূর্ণিমা প্রতিবারই ফোন রাখার আগে বলে, ধৈর্য হারাসনি। সব ঠিক হয়ে যাবে। ভগবান আছেন।
অবশেষে একদিন জ্যোতি এসে বলল, আমি এখন করব কী তুই বল।
পূর্ণিমা প্রায় চমকে উঠেছিল ওর মুখটা দেখে। গাল দুটো বসা, দুই হনুর হাড় উঁচু, চোখের কোটর আগের থেকে গভীর, চামড়া খসখসে, কালচে ছোপ পড়া, চোখের নীচের কালিতে আর একটা পরত, ঠোঁট দুটি ফ্যাকাশে, চুল পাতলা নারকোল ছোবড়ার মতো প্রায়। প্রথম দৃষ্টিতেই তাই মনে হয়েছিল সে একটা মড়ার মুখ দেখল। ভুল ভাঙল চোখ দুটি দেখে। বহুদিন খেতে না পাওয়া মানুষের সামনে থালায় ভাত ধরে দিলে তার যেমন চাউনি হবে সেইরকম।
