একবার প্রসাদ তাকে দেখতে পেল। কী ব্যাপার? জ্যোতি লাজুক স্বরে বলল, আপনার গান শুনব বলে এসেছি।
প্রসাদ বলল, আমার গান না মান্নাদার গান?
জ্যোতি ব্যস্ত হয়ে প্রতিবাদ করেছিল, না না শুধু আপনার গানই। দেখবেন আপনার গান শেষ হলেই হল থেকে বেরিয়ে যাব, আর কারুর শুনব না। কিছু লোক প্রসাদকে ঘিরে তখন দাঁড়িয়ে। তারা হেসে উঠল। লজ্জায় রাঙা হয়ে প্রসাদ বলে, চলো, ভেতরে চলো।
জ্যোতি মাথা নেড়ে বলে, টিকিট কেটেছি অডিয়েন্সের মধ্যে বসে আপনার গান শুনব বলে। ওদের রিঅ্যাকশনও আমার ভালো লাগে।
প্রসাদ গান গেয়ে বেরিয়ে এসে দেখে জ্যোতি দাঁড়িয়ে। তাকে মোটরে বাড়ি পৌঁছে দেবার সময় প্রসাদ বলেছিল, তোমার গলা তো ভালো, ফাংশনে গাইতে চাও যদি তাহলে একদিন নয়, রোজ বসতে হবে, এটা সাধনার ব্যাপার।
কুষ্ঠিতভাবে জ্যোতি বলে, একা একা রেওয়াজ করতে ভয় করে, ভুলভাল হলে শুধরে দেবে কে?
প্রসাদ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল, সকালে আমি বাড়িতে আলাদা করে শেখাই।
তার কথা শেষ হওয়া মাত্র জ্যোতি বলেছিল, জানি। আমাকে শেখাবেন? ঘাড় নেড়েছিল প্রসাদ।
ব্যাপারটা পূর্ণিমাকে জানিয়েছিল। শুনে সে বলেছিল, একা এক জনকেই শেখায় না আরও অনেকে থাকে?
জ্যোতি চোখ সরু করে তীব্র স্বরে বলে, তোর সন্দেহ করার একটা বাতিক আছে। যদি একা শুধু আমাকেই শেখায় তাতে হয়েছে কী? পূর্ণিমা শান্ত স্বরে বলেছিল, কিছুই হবে না। পরে কপাল চাপড়াবি!
এরপর ওদের বন্ধুত্বে চিড় ধরেনি। তবে প্রসাদ এবং গান নিয়ে পূর্ণিমার সঙ্গে সে আর কথা বলত না। একদিন পূর্ণিমা বলল, সালকেয় সেজদিদের পাড়ার ফাংশনে তুই গান গেয়েছিস? কই আমাকে তো বলিসনি? জ্যোতি অপ্রতিভ হয়ে বলে, প্রসাদদার কান্ড। ভয়ে তোকে বলিনি, কী জানি বাবা প্যাঁক দিয়ে যদি তুলে দেয়! চেনাশোনা বন্ধুবান্ধবদের সামনে হলে লজ্জাটা বেশি করবে বলে তোকে আর বলিনি। এবার কোথাও গেলে তোকে বলব, যাবি তো? প্রশ্নটা এড়িয়ে পূর্ণিমা বলেছিল, প্রসাদ ঘোষ তাহলে তোকে চান্স করিয়ে দিচ্ছে? জ্যোতি অবাক হয়ে বলে, বাঃ, আমার নিজের কি কোনো নামডাক আছে নাকি যে যেচে ফাংশনে ডাকবে!
জ্যোতি কলকাতার মধ্যে এবং কাছাকাছি অনেক জায়গায় প্রসাদের সঙ্গে গিয়ে গান করেছে কিন্তু পূর্ণিমাকে এক বারও বলেনি। কিন্তু পূর্ণিমার কানে খবর ঠিকই এসেছে। সে আবার একদিন বলল, আমার কাছে লুকোচ্ছিস কেন, আমি তো সবসময় তোর ভাললাটাই চাই। তুই প্রসাদ ঘোষের সঙ্গে এখানে-ওখানে গেয়ে বেড়াচ্ছিস, তোর নামটাম হলে আমার তো আনন্দই হবে। কিন্তু আমাকে কিছু আর কেন বলিস না.প্রেম করছিস? জ্যোতি উদ্ধত ভঙ্গিতে জবাব দিয়েছিল, আমি! ওর সঙ্গে প্রেম আমি করছি না প্রসাদ করছে আমার সঙ্গে। পূর্ণিমার বিস্ফারিত চোখ দুটি তখন জ্যোতিকে গর্ব এবং অহংকারের চোরাবালির দিকে ঠেলে দিয়েছিল। কথাটা বলে সে যে তৃপ্তি পেয়েছে সেটা আরও গভীরে নিয়ে যাওয়ার জন্য জ্যোতি তারপর বলেছিল, আমার শরীরে কটা তিল আছে আমি জানতুম না, প্রসাদ গুনে বলে দিয়েছে। মর্মাহত পূর্ণিমা বিড়বিড় করে বলেছিল, এটা বাড়াবাড়ি। এতটা ভালো নয়, তোকে কপাল চাপড়াতে হবে। জ্যোতি একগাল হেসে জবাব দেয়, তাহলে তোর কাছে এসেই চাপড়াব।
এর দশ বছর পর পূর্ণিমার নতুন বাড়িতে একদিন দুপুরে হাজির হয়ে জ্যোতি বলে, তোর কথাই সত্যি হল পুনি, আমি কপাল চাপড়াতেই এসেছি রে।
জ্যোতির বিয়ে হয়েছিল রেজেষ্ট্রি করে। সাক্ষী হবার জন্য সে পূর্ণিমাকে অনুরোধ করেছিল, কিন্তু সে রাজি হয়নি। বরং জিজ্ঞাসা করেছিল, লোকটাকে ভালো করে চিনেছিস, বুঝেছিস তো? জ্যোতি বলেছিল চেনা বোঝার কী আছে, ওসব হবে বিয়ের পর। একসঙ্গে বসবাস না করলে কি চেনা বোঝা হয়?
সেই কথা তুলে জ্যোতি দশ বছর পর বলেছিল, আমি বরাবরই বোকা রে। তোর কথা আমার শোনা উচিত ছিল। তখন পাগলের মতো হয়ে গেছলাম। ওর গান, ওর খ্যাতি, ওর চেহারা সব আমি দখল করব, সব আমার তাঁবে থাকবে, লোকেরা এসে আমায় খোশামোদ করবে, এইসব ভেবে মাথা ঘুরে গেছল। এখন ও অন্যরকম হয়ে গেছে। দু-হাতে টাকা কামায়, বম্বেতে প্লেব্যাক করতে তো যাচ্ছেই, ইংল্যাণ্ড আমেরিকা কানাডাও ঘুরে এল। আমিও ওর সঙ্গে গেছি।
তাহলে তো সুখেই আছিস!
না।
তাহলে…আর তোকে ভালোবাসে না?
না।
অন্য আর কেউ?
হ্যাঁ। ওর এক ছাত্রী। ইতস্তত করে জ্যোতি বলেছিল, ওর সঙ্গে সঙ্গেই সব জায়গায় যায়, বম্বেতেও গেছল।
কেন, প্রসাদ ঘোষের ক-টা তিল আছে গোনার জন্য?
জ্যোতি ফ্যালফ্যাল করে শুধু তাকিয়ে থেকেছিল। বিদ্রুপটা হঠাৎই মুখ থেকে বেরিয়ে আসার অনুতপ্ত পূর্ণিমা সঙ্গে সঙ্গে জ্যোতিকে বুকে টেনে নিয়েছিল। ফুঁপিয়ে উঠে জ্যোতি বলে এখন আমি কী করব রে পুনি? আমি তো বউয়ের যা-যা করার সবই করি, তবে এমন কেন হল? ও বলল, গান করা ছাড়ো তোমার দ্বারা হবে না। আমি গান ছেড়েদিলুম। বলল মন দিয়ে ছেলে–মেয়েদের মানুষ করো। তাই করছি, এখন এইটেই আমার কাজ। কিন্তু..।
কিন্তু আবার কী, তোকে কি ডিভোর্স করবে বলেছে?
না। কিন্তু করলেই মনে হচ্ছে বেঁচে যাই।
পূর্ণিমা উঠে গেল চা করার জন্য। জ্যোতি একা বসে ঘরের সর্বত্র চোখ বোলাল। মেঝেয়, বিছানায়, দেয়ালে, সিলিঙে যেখানেই দৃষ্টি রাখল কেমন যেন একটা শক্তির আর নিরাপত্তার, যত্নের আর মমতার বাঁধন নড়েচড়ে উঠল। পূর্ণিমার স্বামী জনপ্রিয় নামকরা কেউ নয়। খুব বেশি লেখাপড়া করেনি। কিন্তু মনের সুখ আছে এই সংসারে। বিষগ্ন বোধ করে সে রাস্তার দিকে বারান্দায় বেরিয়ে আসে।
