হিমাংশুবাবু বার কয়েক জানালা দিয়ে আকাশে তাকাল। কপালের কুঞ্চন ঝিয়ের অথবা আসন্ন ঝড়-বৃষ্টির জন্য কি না বোঝা গেল না।
উৎপাত ঠিক নয়…আসলে দায়ী তো আমিই। ওকে টাকা রাখতে আমিই পরামর্শ দিয়েছি। অশিক্ষিত, গরিব অসহায়…মরাল রেসপন্সিবিলিটি তো এড়াতে পারি না। মাসে মাসে দুশো করে টাকা দিয়ে শোধ করব, দু-মাস দিয়েছিও।
অরুণ ও বাণী বহু দূরে চমকানো বিদ্যুৎ ও নির্ঘোষের ফলে নিশ্চয় এই রকম বোধরহিতের মতো তাকিয়ে থাকল না।
আপনি টাকা শোধ করবেন? চব্বিশ হাজার!
বাণী তার সঙ্গত বিস্ময় প্রকাশ করল। অরুণও যোগ দিল।
হয় নাকি। এত বছর ধরে কষ্ট করে..ধ্যাত। এ আপনার বাড়াবাড়ি।
হিমাংশুবাবু তার শীর্ণ আঙুলগুলো দিয়ে নিজের দুই গালে চেপে ঝুঁকে বসল বালিশ কোলে নিয়ে।
আই ওয়ান্ট টু এনজয় মাইসেলফ। নিজেকে আনন্দে ডুবিয়ে রাখতে চাই অরুণবাবু। আমাকে অবশ্যই বাঁচতে হবে আরও কিছু বছর…
চব্বিশ হাজার শোধ না হওয়া পর্যন্ত।
চব্বিশ নয়, আর একটু কম। মাস ছয়েক পেয়েছে তো, সেটা বাদ যাবে।
বৃষ্টি হতে পারে নাও হতে পারে এমন এক পরিবেশের মধ্যে ওরা বাস স্টপে এসে দাঁড়াল। অন্ধকারটা প্রায় সন্ধ্যার মতো। দুটো বাস এসে চলে গেল, তাদের গন্তব্যের নয়।
আর দেরি করা নয়, এবার যেটা আসবে উঠে পড়ব, কাছাকাছি তো পৌঁছোনো যাবে।
অরুণ কথাটা শেষ করামাত্র একটা বাস এল। অন্য দিকে যাবে, তার মোড় ঘুরবে যেখানে, বসবাস হেঁটে সেখান থেকে মিনিট চারের পথ। ওরা উঠল। টিপ টিপ বৃষ্টি, এলোমেলো হাওয়ায় মাছির মতো উড়ে ওদের গায়ে বসল বাস থেকে নামামাত্র।
পৌঁছোতে পৌঁছোতে ভিজে যাবে, একটু জোরে হাঁটো।
গতি দ্রুত করতে গিয়ে বাণীর জীর্ণ চটির স্ট্র্যাপ ছিড়ল। হাতে তুলে নিল।
বরং পাশের এই মাঠটা দিয়ে…
অরুণকে অনুসরণ করে বাণী ও বাবু মাঠে নামল।
বৃষ্টি আসছে কেমন দ্যাখ।
মাঠের ওপারে বহু দূরে গাছপালা বাড়ির ঝাপসা পর্দা ঝুলছে।
বাণী সেদিকে তাকিয়ে চলতে চলতে হোঁচট খেল।
এগিয়ে আসছে, আমাদের ধরে ফেলবে।
বাবা দ্যাখো।
তীক্ষ্ণ তীব্র স্বরে ওরা দুজন থমকে দাঁড়িয়ে বাবুর তোলা হাতের নির্দেশের দিকে তাকাল। দূরে বসবাস দেখা যাচ্ছে। আধো অন্ধকারে জমি গাছপালা আকাশের মাঝখানে ফিকে কমলা রঙের চৌকো একটা বাড়ি। রুপালি-রেলিং-ঘেরা ছোটো ছোটো বারান্দা। বন্ধ কাচের জানলায় ঘরের আলো। অ্যান্টেনাগুলো শীর্ণ আঙুল মেলেছে আকাশের দিকে ভিক্ষুকের মতো। একটি মানুষও কোথাও দেখা যাচ্ছে না। অরুণ অবাক হয়ে ভাবল, এমন করে তো বাড়িটাকে দেখিনি, অদ্ভুত তো।
কপিল কপিল। বাবা বারান্দায় কপিলকে দ্যাখো, নাচছে।
ক্ষীণভাবে ভেসে আসা কুকুরের ডাক যেন ওরা শুনতে পেল। বাবু দৌড়োচ্ছে।
গলিত সুখ
আমি এখন করব কী তুই বল।
কথাটা দ্বিতীয় বার সে বলল, পূর্ণিমা মুখ নীচু করে ফুটন্ত দুধে হাত নেড়ে যাচ্ছে মন দিয়ে। জবাব না দিয়ে শুধু জ্ব কোঁচকাল। এতক্ষণ আড়ষ্ট হয়ে সে জ্যোতির দাম্পত্য বিপর্যয়ের কথা শুনে যাচ্ছিল।
তুই আমার শোবার ঘরে গিয়ে একটুখানি বস আমি এই দুধটা…ছেলে পায়েস খেতে চেয়েছে, এই হয়ে এল।
তুই বোধ হয় বিরক্ত হচ্ছিস। ফোনে অবিরত ঘ্যানঘ্যান করি, আবার বাড়িতে এসেও সেই একই কথা বলে জ্বালাচ্ছি। কিন্তু তুই ছাড়া আর আমার কে আছে যাকে এসব কথা বলতে পারি! বল কাকে বলব, কাকে শোনাব, কাকে এভাবে জ্বালাতন করব? জ্যোতির স্বর অনুপ্তের মতো, কান্নাভেজা এবং গভীর দুঃখ ও অসহায়তা প্রসূত।
হয়েছে তোকে আর ফরম্যাল হতে হবে না। একশো বার জ্বালাতন করবি। পূর্ণিমা হালকা ধমক দিল। যা ঘরে যা।
ওরা স্কুলজীবন থেকেই বন্ধু। প্রায় বাইশ বছরের বন্ধুত্ব। একসঙ্গে কলেজেও পড়েছে। বুদ্ধি বিবেচনায় পূর্ণিমার থেকে জ্যোতি কিছুটা দুর্বল। এটা সে জানে বলেই পূর্ণিমার যুক্তি পরামর্শ মেনে সে চলে। শুধু এক বার ছাড়া সে আর কোনো ব্যাপারে পূর্ণিমার কথা অগ্রাহ্য করেনি এবং সেই ব্যাপারটাতেই সে ঠকে গেছে। প্রসাদকে বিয়ে করেছিল পূর্ণিমার বারণ সত্ত্বেও।
ওরা দুজনই একসঙ্গে গান শিখতে যায় সঙ্গীতা নামে এক গানবাজনা শেখাবার স্কুলে। সেখানে আধুনিক গান শেখাত প্রসাদ ঘোষ। তখন সে জনপ্রিয়তার প্রথম ধাপে, এখনকার শীর্ষস্থানীয়দের একজন হিসেবে গণ্য হত না। চারখানি রেকর্ড বেরিয়েছে, একটি ফিলমে একখানি মাত্র গান গেয়েছে এবং সেটি হিট করেছে। প্রসাদ গৌরবর্ণ, হৃষ্টপুষ্ট, হ্রস্বাকৃতি, দেখতে পুরুষালি নয়, নারীসুলভ কোমল লাবণ্য তার মুখে এবং দেহের গড়নেও। কথায় ও ব্যবহারে বিনীত, মৃদুভাষী। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার সময় দৃষ্টি বেশিক্ষণ মুখে নিবদ্ধ রাখতে পারে না।
জ্যোতি একটা গানের অনুষ্ঠানে প্রসাদকে দেখে এবং দেখামাত্র ভালো লেগে যায়। গান তো আগেই ভালো লেগেছিল। খোঁজ করে জানল প্রসাদ গান শেখায় সঙ্গীতায়। বাড়ি থেকে হেঁটে দশ মিনিট, পূর্ণিমার সঙ্গে গিয়ে সে ভরতি হল আধুনিক গানের ক্লাসে। জ্যোতির গানের গলা ভালো তবে প্রথাবদ্ধভাবে শেখেনি। রেকর্ড বা রেডিয়ো থেকে শুনে গলায় তুলে নিত। জ্যোতিকে দেখতেও ভালো। হালকা তসরের মতো ত্বক, চোখা নাক, পানের মতো আকৃতির মুখ এবং সুঠাম দেহ। প্রথমদিন ক্লাস করেই সে মুগ্ধ হল এবং প্রসাদকে আরাধ্য করল।
যেসব ফাংশনে প্রসাদ গান গাইতে যেত জ্যোতি টিকিট কেটে সেখানে গিয়ে বাইরে এমনভাবে অপেক্ষা করত যাতে গাড়ি থেকে নেমেই প্রসাদ তাকে দেখতে পায়।
