টেবিলে মাথা রেখে অজ্ঞানের মতো হয়ে গেছল..স্ট্রোক হয়নি, হাই ব্লাডপ্রেশার আছে, দুশ্চিন্তায় ভাবনায় এইসব হয়। ভাবলুম এক বার দেখে আসি কিন্তু মাঝপথে আর নামতে ইচ্ছে করল না, রোববার দেখে একদিন যাব।
বাণী মৃদু উদবেগ বোধ করল। ব্লাডপ্রেশার অরুণের আছে তবে নীচুর দিকে। বন্ধুর বাবা সম্পর্কে দেবুকে প্রায়ই সে জিজ্ঞাসা করে। ইতিমধ্যে বসবাস-এর এক সদস্য ক্যানসারে মারা গেলেন। দীর্ঘদিনই ভুগছিলেন। বাকি উনচল্লিশ ফ্ল্যাটের লোকেরা ব্যাপারটা প্রায় লক্ষই করল না। শুধু চার তলার দুই বারান্দার মধ্যে কথাবার্তার টুকরো বাণীর কানে এল— …পুরো টাকাটাই তো উনি দিয়ে দিয়েছেন। যদি না দিতেন এখন আর শশাধ করার দরকার হত না, কত হাজার টাকা তা হলে রাখতে পারতেন ভাবুন তো! …উনি তো ঠাট্টা করে বলেন, এখন যদি মরে যাই ইনশিয়োরেন্সই শোধ করবে, হাজার চল্লিশ বেঁচে যাবে।
খরচ কমাবার জন্য বাণী পরের সাত দিন একের-পর-এক ব্যবস্থা নিল। ট্রানজিস্টরের ব্যাটারি ফুরিয়েছে কেনা হয়নি; লন্ড্রিতে আর কিছু যায় না, সবই নিজে কাচছে; ফিরিওয়ালা ।দেখলেই মাথা নেড়ে দরজা বন্ধ করে দেয়; অরুণের দূরসম্পর্কের কাকার মেয়ের বিয়েতে নিমন্ত্রিত হয়েও তারা যায়নি, তাতে অন্তত একশো টাকা বেঁচেছে; জানালার কাচ বাবু ভাঙল কিন্তু বদলায়নি; জিরজিরে তোয়ালে দুটো আর বদল না করলেই নয়, গামছা কিনল। চা কিনেছে অর্ধেক দামের। তার এই ব্যয়সংকোচন চেষ্টার কোনো প্রতিবাদ উঠল না সংসারে বরং ঠাট্টা করেই দেবু বলল, লোডশেডিং মাকে অনেক সাহায্য করছে ইলেকট্রিক বিল কমিয়ে দিয়ে।
আগের মতোই সাজানো গোছানো অথচ কোথায় যেন একটা ফাটল, যেখান থেকে প্রাণরস চুইয়ে চুইয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। অরুণ অনুভব করে, বাণীও সেটা জানে। সবাই কথা কম বলে। রুটিন মাফিক কাজগুলো হয়ে যাচ্ছে, অযথা অকারণ কিছু নেই। শুধু কুকুরটার চেঁচামেচি, ছোটাছুটি জিইয়ে রেখেছে মরে আসা উচ্ছাসকে। বাবু তার কপিলের জন্য হাড়গোড় উচ্ছিষ্ট জোগাড় করে আনছে। বসবাস-এর ছেলেরা পিকনিকে যাবে, সে দশ টাকা চেয়েছিল কিন্তু বাণী দেয়নি। ওর মুখ তখন যে-কষ্ট বাণীকে দিয়েছিল সেটা অরুণও পেয়েছে, কেননা তারপর বাবু চুপিচুপি তার কাছেও চেয়েছিল। সেও প্রত্যাখ্যান করে। তখন অরুণের মনে হয়েছিল, তারা যেন বাড়াবাড়িই করছে। তাদের কোনো অধিকার নেই সন্তানদের পীড়ন করার। মানুষ উপরেই উঠতে চায়, নীচের দিকে নামে না, কথাটা তাকে উত্তেজিত করেছিল। কিন্তু এই কি উপরে ওঠা?
কারণটা খুঁজতে খুঁজতে প্রতিবারই সে একটা কানাগলির দেওয়ালের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সে আর বাণী দুজনেই সমান দায়ী, যে-কারণে তারা আর এই মার খাওয়ার প্রসঙ্গ তোলে না, নীরবে প্রাক্তন জীবনে ফিরে যাচ্ছে মুখ নামিয়ে। বারান্দায় বসে গাছ, পাখি, প্রজাপতি, ঘুঘুর ডাক, ধু-ধু মাঠ বা তৈরি-হওয়া বাড়ি কি মাটির গন্ধ এখন তার ভালো লাগে না। এসব শুধুই জড়বস্তু, ওদের কাছ থেকে কিছুই ফিরে আসে না। রোববার হিমাংশুবাবুকে এক বার দেখতে যাব। এই বলে অরুণ খাবার টেবিল থেকে উঠে বেসিনে গিয়ে হাত ধুতে লাগল।
আগেই যাওয়া উচিত ছিল। আমিও বরং তোমার সঙ্গে যাব। অসুস্থ মানুষ, লোকজন দেখলে মনটা ভালো থাকবে।
তাহলে আমিও যাব। বাবু বলে উঠল। আমি কখনো হাসপাতাল দেখিনি।
নার্সিং হোম, তফাত আছে হাসপাতালের সঙ্গে।
ওরা তিন জন রবিবার বেরোল। দেবু তার বন্ধুর বাড়ি গেছে। ফিরবে সন্ধ্যার পর। বারান্দায় কুকুরটিকে বেঁধে দরজায় চাবি দিয়ে ওরা রওনা হল। বাসে মিনিট পাঁচেকের পথ। ফাঁকা চওড়া নতুন রাস্তা। হু হু করে বাস যায়।
অরুণ অফিস থেকে ঘরের নম্বরটা জেনেই এসেছিল। হিমাংশুবাবু বিছানায় বসে জানালা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। অরুণের থেকে বয়সে কিছু ছোটো, শীর্ণ, চুলের অর্ধেক পাকা। লম্বাটে মুখে গভীর কয়েকটা ভাঁজ, শান্ত চোখ। খাটের পাশে টুলে বয়স্ক একটি লোক বসে।
অরুণদের দেখে হিমাংশু হাসল।
জানালা দিয়ে দেখেছি আপনারা আসছেন। ..খা.টের উপরই বসুন, টুল ওই একটাই।
আমার স্ত্রী আর ছোটোছেলে বাবু, আছেন কেমন?
ইতিমধ্যে লোকটি উঠে দাঁড়িয়ে টুলটা ঠেলে দিয়েছে বাণীর দিকে।
আমার মেজো ভাগনে,…ভালোই আছি। একটা অ্যাটাক হয়েছে, ফাস্ট, তবে আমাকে ডাক্তাররা কিছু বলছে না। না বললেও বুঝতে ঠিকই পারি। অফিস থেকে মাঝে মাঝে ওরা আসে, আজ বউ আসেনি ওরও শরীরটা খারাপ,…রোজ রোজ আসতে কি ভালো লাগে কারুর, নবদম্পতি তো নয়।
হিমাংশুবাবু অবশ্য খুব জোরে হাসবার চেষ্টা করল না। অরুণ জানালা দিয়ে দেখল আকাশের একদিকে ঘন মেঘ দ্রুত আর একদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে। গত কয়েক দিন এই সময় কালববাশেখির মতো ঝড়-বৃষ্টি হয়ে গেছে।
খুঁটিয়ে ঘরের জিনিসগুলো লক্ষ করার পর বাবু গুটিগুটি ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। বাণী কয়েকটা মামুলি কথা বলল। এক নার্স এসে হিমাংশুবাবুকে ক্যাপসুল খাইয়ে গেল। তারা পাঁচ টাকার সন্দেশ কিনে এনেছিল। বাক্সটা খুলে হিমাংশুবাবু ডাকল বাবুকে। সে ইতস্তত করে বাবা-মার দিকে তাকিয়ে রইল। ইচ্ছা নেই কিন্তু অসুস্থ লোকটি খুশি হবে ভেবে বাণী মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। ওর ভাগনে আকাশের দিকে আড়চোখে বার কয়েক তাকিয়ে বিদায় নিল।
আপনার সেই ঝিয়ের খবর কী? বলেছিলেন রোজ খুব উৎপাত করে। এখানে কটা দিন তাহলে শান্তিতেই ছিলেন বলুন?
