ভালো না লাগলে খেয়ো না। মাসে চার কিলো সর্ষের তেল খরচ হয় এই কটা লোকের জন্য! এবার থেকে দু-কিলোর বেশি আর কিনব না। আগে তো এইরকমই রান্না হত, তখন মুখে রুচত কী করে?
গুম হয়ে কিছুক্ষণ বসে দেবু উঠে গেল। বাণী কষ্ট পেল এইভাবে কথা বলার জন্য। এখানে আসার পর এই প্রথম বসন্ত দাস স্ট্রিটের কণ্ঠস্বর তার গলা দিয়ে বেরিয়ে এল।
টেপরেকর্ডারে বিলিতি বাজনার সুর বাজছে নীচু স্বরে। মাস ছয়েক আগে দেবুকে কিনে দিয়েছিল অরুণ। বাণী ঘরে ঢুকতেই দেবু বন্ধ করে মুখ ফিরিয়ে উপুড় হল। ঘরের অন্য কোণে খাটে বাবু ঘুমোচ্ছে। কুকুরটা তার পায়ের কাছে। বাণীকে দেখে এক বার মুখ তুলেই আবার কুন্ডলী পাকাল।
তোকে একটা কথা বলা দরকার।
সে ঠিক করেই ফেলেছে তাদের অবস্থা এবং ক্ষতির কথাটা দেবুকে এবার বলা দরকার। বয়স প্রায় আঠারো, বুঝতে পারবে।
বাণীর মাত্র দু-মিনিট লাগল দেবুকে বিস্ময়ে উঠে বসাতে।
বাবা ওখানে টাকা রেখেছিল। ও আর ফেরত পাবে না। আমার ক্লাসের এক বন্ধুর বাবার তো মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
এরপর বাণী দেখল কৈশোরের প্রান্ত থেকে দেবুর তাজা মুখটা ধীরে ধীরে বার্ধক্যে পৌঁছে যাচ্ছে। কুঁজো হয়ে কাঁধ ঝুকিয়ে স্তিমিত দৃষ্টিতে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। ও রেগে উঠল না, কিছুটা যেন উদাসীন হয়ে পড়েছে। সে ভেবেছিল অনেক কিছু বুঝিয়ে বলতে হবে ছেলেকে, কেন তাদের টেনেটুনে চলতে হবে এবং কেন ভবিষ্যতেও কিছু রেখে যাওয়ার আর উপায় নেই এই ফ্ল্যাটটি ছাড়া।
কিন্তু কিছুই বলার দরকার হল না। খবরের কাগজে পড়েছে নিশ্চয়, শুনেছে অনেক। তবে প্রথমেই বলে উঠেছে মাথা খারাপ হওয়ার কথা কেন?
আমাদের এখন অন্যভাবে চলতে হবে, বুঝতেই তো পারছিস।
বাণী এইটুকু বলে বারান্দায় এল। ইজিচেয়ারে গল্পের বই পড়ছে অরুণ। বইটা হাতে-ধরা, চোখ সামনের অন্ধকারে। একটু ত্ৰস্তে সে বইটায় চোখ ফেরাল।
দূরের জানালার আলো কী সুন্দর লাগে দেখতে।
দেবুকে বলেছি।
কী বলল? কীভাবে নিল?
বাণী মাথা নাড়াল। অরুণ উদবিগ্ন চোখে সিধে হয়ে বসল।
ওর এক বন্ধুর বাবার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
তার মানে আমার হতে পারে…পাগল!
অরুণ হাসতে শুরু করল। হাসিটা যখন টানার ক্ষমতা হারিয়ে থেমে গেল তখন বলল, হিমাংশুবাবুর সেই ঝি কী বলে বেড়াচ্ছে জান? বাবু-ই তার টাকা মেরেছে, কাগজপত্তরে সই করিয়ে লিখিয়ে নিয়ে এখন বাবু বলছে কোম্পানি ফেল করেছে। ঝি রোজ এসে কান্নাকাটি, গালাগালি, শাপশাপান্ত করছে। হিমাংশুবাবুর অবস্থাটা ভাবো। ওর তো পাগল হওয়ার কথা, হয়নি।
নিজের টাকা গেলে হত।
অরুণ বইটা আবার চোখের সামনে তুলল। পার্কের থেকে ঝিঝিপোকার ডাক আসছে। দূরে হর্ন দিল ইলেকট্রিক ট্রেনের ইঞ্জিন। দেবু আবার টেপরেকর্ডার চালিয়েছে। বাণী বারান্দার কোনায় রেলিং ঘেঁষে দাঁড়াল।
পর্দাটা সরানো। ঘরে অনেক সুবেশ নারী ও পুরুষ কোনো কারণে নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছে, অনেকের হাতে প্লেট। হঠাৎ দমকা সমস্বরে হাসি, চেঁচিয়ে ওঠা একক কণ্ঠ, উজ্জ্বল আলো, টেবিলে রজনিগন্ধার গোছা। এইসবের মধ্যে বাচ্চাটিকে সে দেখতে পাচ্ছে না, হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। বাবাকে বার দুয়েক দেখা গেল ধুতি আর গরদের পাঞ্জাবিতে। একেবারে অন্য চেহারা; গলায় মোটা বেলফুলের মালা, কপালে চন্দনের ফোঁটা, বরের মতো লাগছে। হয়তো বিবাহবার্ষিকী কিংবা জন্মদিন।
বাণী মুখ ফিরিয়ে অরুণের দিকে তাকাল। দেবুর বন্ধুর বাবা পাগল হয়ে গেছে। সে আরও নিবিষ্ট হয়ে দেবুর বাবার দিকে তাকাল। একইরকম মনে হচ্ছে, বসন্ত দাস স্ট্রিটেরই লোকটা।
মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল বাণীর। দালানে আলো জ্বলছে। ঘরের খোলা দরজা দিয়ে সে দেখতে পাচ্ছে অরুণ দাঁড়িয়ে। তাকাচ্ছে এধার-ওধারলাইম পানিংয়ের শঙ্খ মসৃণ দেয়ালে হাত বুলোল, উবু হয়ে মার্বেলাইট টালির মেঝেয় হাত বুলোল, হাত বাড়িয়ে পর্দাটা মুঠোয় ধরে অনেকক্ষণ নকশার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর রেফ্রিজারেটর, ডাইনিং টেবিল, টিভি সেট, পপার্সেলিনের বেসিন, ইলেকট্রিক সুইচ বোর্ড ছুঁয়ে ছুঁয়ে আনমনে দালানটায় ঘুরতে লাগল। এক বার রান্নাঘরের দরজা খুলে পাথরের টেবলের উপর নিকেলের ঝকঝকে হটপ্লেটের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল। এরপর সে দালানের মাঝে দাঁড়িয়ে আবার প্রত্যেকটি জিনিস খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। তার দু-চোখে অবিশ্বাস, সন্দেহ।
কয়েক দিন পর দেবু জানাল সে একটা টিউশনি পেয়েছে, ক্লাস থ্রি-র ছাত্র, ষাট টাকা মাইনে।
শুনে অরুণ বলল, স্বাবলম্বী হওয়াই তো উচিত, তোর বয়সেই আমি রোজগারে নেমেছি, তবে নিজের পড়ার যেন ক্ষতি না হয়।
বাণীকে সে বলল, আর বছর দশেক, তারপর এই ফ্ল্যাটের জন্য যা-কিছু ধারদেনা ওকেই তো টানতে হবে। অবশ্য আমি মরে গেলে অ্যাপেক্সের টাকাটা আর দিতে হবে না, ইনশিয়ার করানো আছে।
একথা শুনে বাণী বা দেবু কোনো মন্তব্য করল না। রাতে চাপা গলায় বাবু জানতে চায়, যাট টাকা নিয়ে কী করবি রে দাদা?
পড়ার ব্যাপারে আর বাবার কাছ থেকে কিছু পোব না।
কপিলের জন্য একটা চিরুনি কিনে দিবি?
দোব, ওর নামটা এবার বদলা।
প্রবল বৃষ্টিতে বাস চলাচল প্রায় বন্ধ হওয়ায় অরুণ জল ভেঙে ভিজতে ভিজতে অফিস থেকে বাড়ি ফিরল। কয়েক দিন সর্দিজ্বরে ভুগে অফিসে গিয়েই শুনল কাজ করতে করতে হিমাংশুবাবুর বুকে ব্যথা ওঠায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, কিন্তু সেখানে সিট না পাওয়ায় নার্সিং হোমে ভরতি করা হয়েছে। অফিসেরই খরচে। অরুণ জেনে নিল নার্সিং হোমটা বসবাস-এর কাছেই। অফিসের অনেকেই দেখে এসেছে।
