আমাদের খরচ কমাতে হবে। ভাবছি কাল থেকে আট টাকা হাতে নিয়ে বাজারে যাব। কুকুরের জন্য আর বাড়তি কেনা সম্ভব নয়।
ওতে আর ক-টাকা সাশ্রয় হবে।
যতটুকু হোক। এভাবেই কিছু কিছু করে ছাঁটতে হবে।
অরুণের চোয়ালে ও ঠোঁটে কাঠিন্য দেখে বাণী কিছু বলতে গিয়েও বলল না।
কুকুরটাকে বিদেয় করলেই ভালো হয়।
বাবুর মনে লাগবে।
টিভিটা দরকার বাড়িতে সময় কাটাতে। আগে কী বিশ্রীই সন্ধে বেলাটা লাগত।
রাস্তা দিয়ে বাবা-মা দুই মেয়ের একটা পরিবার আসছে বসবাস-এর দিকে তাকাতে তাকাতে। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে আর সারা বাড়িটাতে চোখ বোলাচ্ছে। কোনো ফ্ল্যাটে সম্ভবত ওদের আত্মীয় আছে। গেটের কাছে ওরা দাঁড়াল। দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করছে।
তোমার জ্যাঠামশাইরা একদিন ফ্ল্যাট দেখতে আসবেন বলেছিলেন।
হ্যাঁ। সেই বেহালা থেকে আসা..জেঠিমার পক্ষে তিন-তলায় ওঠাও আর সম্ভব নয়। দীপু বলছিল বাংলাদেশ ধরার জন্য অ্যান্টেনায় কী-একটা লাগবে, এখানে অনেকেই লাগিয়েছে।
একদম নয়, কোনো খরচের মধ্যে আর যাওয়া নয়। দরকারটা কী? এভাবেই তো লোভেপড়ে…
অরুণ প্রায় অজান্তেই মুখ ফেরাল বাণীর দিকে এবং বাণীও ফেরাল তার দিকে। কয়েক সেকেণ্ড দুজনের চাহনি বাঁধা রইল।
ওদের এবার বলতে হবে, এভাবে খরচ-টরচ করা আর সম্ভব নয়। শুধু বাজারই নয়, অন্যান্য ব্যাপারেও কমাতে হবে। অনেক কিছুই তো আমাদের আগে ছিল না।
তাহলে তুমিই ওদের বলে দিয়ো।
মেঝেতে টালি না বসিয়ে সিমেন্টের করালে হাজার ছয়-সাত বাঁচত।
আমি করাইনি, তুমি করিয়েছ।
বাণীর কষ শক্ত, গলায় ঝাঁজ। অরুণ অবসাদ বোধ করল। তারা ঝগড়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আরাম স্বাচ্ছন্দ্যর জন্য লোভী না হলে টাকাগুলো থাকত। বড়ো কষ্ট করে জমানো টাকা।
তখন অনেকেই বলেছিল গবরমেন্ট এ ব্যাবসা চালাতে দেবে না, কিছু-একটা করবে। বিশ্বাস করিনি। এত লোকের এত টাকা…
বাণীর কানে এসব কথা পৌঁছোল না। সে তখন ভাবছিল বসন্ত দাস স্ট্রিটের জীবনে আবার কী করে ফিরে যাবে? অন্ধকার ঝুলকালিভরা রান্নাঘর, শ্যাওলামাখা উঠোন কলঘর, ফোঁটা ফোঁটা কলের জল, হাজা ফাটা ঘরের মেঝে, দরদর ঘাম, ভ্যাপসা বিছানা, বালিখসা ভিজে দেয়াল, জানলার নীচে আস্তাকুঁড়, রাস্তায় দিনরাত বস্তির বাচ্চাদের চিৎকার, লাউডস্পিকার, বোমা নিয়ে খুনোখুনি..নানাবিধ গন্ধ-শব্দ-রং প্রাক্তন জীবন থেকে তালগোল পাকিয়ে হা-হা করে তার উপর আছড়ে পড়ছে এখন। প্রশস্ত, প্রশান্ত, আলোবাতাস-মাখানো জীবনের জন্যই সে যুদ্ধ করে গেছে। বসন্ত দাস স্ট্রিটে ফিরে যেতে হবে না ঠিকই। কিন্তু এই পরিসর, পরিচ্ছন্নতা, অবকাশ, নীরবতা পেয়েও হারাতে হবে। আবার কষ্ট আবার একটা যুদ্ধ। এখন মাইনের টাকাই সম্বল, তাই দিয়ে সব মেটাতে হবে। বাণী ক্লান্তি বোধ করতে শুরু করল।
দরজায় ধাক্কা পড়ছে আর কুকুরের ডাক। বাবু ফিরেছে। বাণী দরজা খুলে দিতেই উত্তেজিত বাবু বলে উঠল, জান মা, কপিল আজ হাড় খেয়েছে। ওই যে চায়ের দোকানটা, বাসরাস্তায় ব্যাঙ্কের গায়ে টালির চাল-দেওয়া, ওর যে মালিক সে বলেছে মাংসের হাড়টাড় যা প্লেটে পড়ে থাকবে সব রেখে দেবে। আমাকে বলল একটা টিনের কৌটোমৌটো দিয়ে যেতে। স্কুল থেকে ফেরার সময় বাস থেকে ওখানে নেমে কৌটোটা নিয়ে বাড়ি আসব। আজ এই মোটা একটা হাড় ওকে দিয়েছিল, পারে নাকি চিবোতে! একটা লোক তখন মাংস খাচ্ছিল, একটা নরম হাড় ছুড়ে দিতেই ঝাঁপিয়ে কচমচ করে চিবিয়ে খেল, দাঁতে বেশ জোর হয়েছে। ঘিয়ের কত টিন রয়েছে তো, একটা দেবে? আমার সঙ্গে বলু আর প্রদীপ্ত ছিল, ওরা বলেছে ওদের যেদিন মাংস হবে কপিলের জন্য হাড়গোড় রেখে দেবে।
বাণী বকুনি দিতে গিয়েও দিল না। শুধু বলল, এঁটোকাঁটা ভিক্ষে করে ক-দিন খাওয়াবে, তার থেকে ওকে বরং বিদেয় করাই উচিত।
কথাটা এতই হাস্যকর যে বাবু গ্রাহ্যে না এনে বলল, আচ্ছা, সব ফ্ল্যাটে গিয়ে যদি কপিলের জন্য রাখতে বলি? তাহলে নিশ্চয় এক বালতি হয়ে যাবে। অত খেতে পারবে না।
কুকুরটা ঘুরঘুর করছিল ঘর-বারান্দা। কয়েক বার ওকে মেঝে শুকতে দেখে বাবু ধমকে উঠল, না না এখানে নয়, বাথরুমে।
সে নিজে বাথরুমের ভিতরে গিয়ে ডাকতে লাগল, কাম কাম।
বাণী বারান্দায় আসতেই অরুণ মুখ না ফিরিয়ে বলল, সিগারেট ছেড়ে দেব, শ-খানেক টাকা সেভ হবে।
বাণী নিরুত্তর রইল। বাথরুমের থেকে বাবুর নির্দেশ শোনা যাচ্ছে: নো নো, এইভাবে এইভাবে বোসো। মার খাবে কিন্তু বলছি…
দূরের বাড়িগুলো ঝাপসা হয়ে এসেছে। লোডশেডিংয়ের জন্য কোথাও আলো দেখা যাচ্ছে। কিছু কাক ডাকাডাকি করে চুপ করে গেল। একটু পরে আলো জ্বলে উঠতেই ওরা ঘরে এসে বসল টিভিতে সিনেমা দেখার জন্য।
দু-দিন পর রান্নাঘরের সিঙ্কের নীচে একটা টিনে কিছু হাড় মাছের কাঁটা দেখে অরুণ ব্যাপারটা জানতে চায় এবং বাণী জানায়।
এইভাবে বাইরে থেকে চেয়ে আনলে লোকে ভাববে আমাদের বোধ হয় মাছ-মাংস খাওয়ার পয়সা নেই। এসব বন্ধ করো।
বাচ্চা ছেলে চেয়ে আনছে, এতে কে আর মনে করবে?
পরদিন বাণীকে সকালে ঘর মুছতে দেখে অরুণ প্রশ্ন করতে গিয়েও করল না। বাণী নিজেই বলল, সামান্য কাজের জন্য মাসে পঞ্চাশ টাকা করে দেওয়া…ছাড়িয়ে দিলুম। একটু খাটাখাটনি না করলে বাত ধরে যাবে।
সেই দিনই রাতে দেবু খাওয়ার টেবিলে হাত গুটিয়ে বসল।
রোজ রোজ দু-বেলা এই ডাল-ভাত, ভাত আর তরকারি ভালো লাগে? একটা ভাজা পর্যন্ত নেই, মাছ নেই।
