স্বামী-স্ত্রী নীরবে, পাশাপাশি। ভবিষ্যৎ ওদের অস্থির, কাতর ও ভীত করছে এবং অতীতকে সেইজন্যই বার বার এখন মনে পড়ছে, অথচ সেখানে তারা আর আশ্রয় নিতে চায় না। কেউ কারুর দিকে না তাকিয়েই বুঝতে পারছে বর্তমান থেকে তাদের নিস্তার নেই।
বাবু কী বলছে?
ওর অত খাওয়া নিয়ে বাহানা নেই…কুকুরের পেট ভরলেই সন্তুষ্ট।
অরুণের মুখে পাতলা হাসি ভেসে উঠল। আড়চোখে দেখল বাণীও স্তিমিত হয়ে পড়েছে। এগারো বছরের বাবু আর সাত মাসের একটা স্পিৎজ বাচ্চা মিলে চমৎকার এক উৎপাত তৈরি হয়েছে। রাত্রে কুকুরটিকে বুকের কাছে নিয়ে ঘুমোয়, মাস্টারমশাইয়ের কাছে পড়ার সময় টেবিলের নীচে বসিয়ে রাখে। স্নান করানো, ললাম আঁচড়ানো, সহবত শেখানো ইত্যাদি ওর নানান কাজের ব্যস্ততায় তারা মজা পায়, দিন দশেক আগেও স্পিৎজ বাচ্চার নাম ছিল বথাম, এখন হয়েছে কপিল। একসময় টারজান ও বেতালকেও সে সম্মানিত করেছে।
অফিসের লিফটম্যান হামিদ কোথা থেকে বাচ্চাটিকে এনে দিয়েছে সাড়ে চারশো টাকায়। সবাই বলেছে, খুব সস্তায় পেয়েছেন। তখন চব্বিশশো টাকা প্রতি মাসে দিয়ে যেত পরিতোষ। মাসিক আয়টা হঠাৎ দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাওয়ার জোয়ারে সংসারটা ফুলে উঠেছিল উচ্ছাসে। ক্রমশ সেটা থিতিয়ে গেল বটে কিন্তু উচ্ছাসের স্তর আর নামল না। এখন ওরা এই সচ্ছলতায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
পরিতোষ তার নিজের ভাগনে। সরকারি অফিসের কেরানি। প্রথম যখন বলেছিল, অরুণ বিশ্বাসই করতে পারেনি।
দেওয়া যায় নাকি বছরে শতকরা আটচল্লিশ?
বাণী বলেছিল, হাজারে চল্লিশ টাকা মাসে? তার মানে?
দেওয়া যায় কি না-যায়, টাকা খাটাচ্ছে এমন লোকের কাছে যাচাই করে দ্যাখো। আমিই তোমায় মাসে মাসে সুদের টাকা দিয়ে যাব বাড়িতে।
দিন দশেক পর রাতে বিছানায় নীচু গলায় অরুণ বলেছিল, এবার টাকার দরকার হবে, এবার তোমার হেল্প চাই।
কীভাবে করব!
খরচ আরও কমিয়ে আনতে হবে। জমাতে হবে। ফ্ল্যাটের জন্য সোসাইটি পনেরো হাজার টাকা চেয়েছে, তিন মাস পর আরও দশ হাজার। এই বছরেই আমাকে মোট দিতে হচ্ছে। পঁয়ত্রিশ হাজার, ব্যাঙ্কে যা আছে তাতে হাজার তিরিশ পারব। তা ছাড়া অ্যাপেক্স থেকে লোন চল্লিশ হাজার, তারপর আরও দশ হাজার প্রভিডেন্ট ফাণ্ড থেকে তুলতেই হবে, ভেবেছিলুম ওখানে হাত দেব না, কিন্তু আর পাবই-বা কোথা থেকে। জিনিসের যা দাম বেড়েছে তাতে ওরা বলছে পঁচাশি হাজারে পারা সম্ভব নয়, তার মানে আবার টাকা চাইবে।
নতুন জায়গায় নতুনভাবে থাকতে হলে অনেক কিছু কেনার দরকার হবে, তাতেও তো অনেক টাকা লাগবে।
লাগবেই তো। এখানকার পুরোনো ভাঙা ছেঁড়া রংচটা জিনিসগুলো নিয়ে যাব ভেবেছ নাকি? বালিশ তোশক থেকে শুরু করে বাসন কোসন, পর্দা, চেয়ার, টেবিল, পাখা কত কী করাতে হবে।
গ্যাসের জন্য বলেছ?
হ্যাঁ, হয়ে যাবে। সেও হাজার-বারোশোর মতো পড়বে।
এত!
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাণী একগুঁয়ে গলায় বলেছিল, হোক, কয়লার উনুনে আর আমি রাঁধব না।
ওখানে কয়লার উনুন প্রহিবিটেড, কেরোসিন নয়তো গ্যাস।
ডাইনিং টেবিল ছাড়া চলবে না। দেবু আর বাবু আলাদা ঘরে থাকবে। খাট চাই, পড়ার টেবিল চাই।
ওসব পরে হবে, টাকা জমিয়ে জমিয়ে করাব।
আবার কষ্ট করে চলতে হবে?
উপায় কী? অ্যাপেক্সের ধারের টাকা কোয়ার্টারলি শোধ করতে হবে না? তারপর আসবে ট্যাক্স, ইলেকট্রিক, সোসাইটির চাঁদা, সব নিয়ে মাসে অন্তত পাঁচ-ছশো ধরে রাখতে পারো কিংবা তারও বেশি। মাইনের টাকা থেকে এতসব দিতে হলে…
আবার কষ্ট করতে হবে। জীবনে সুখের মুখ দেখা আর…
এসব কথা এক রাত্রে হয়েছিল। তার পরদিনই অফিস থেকে ফিরে অরুণ দেখল পরিতোষ তার জন্য অপেক্ষা করছে।
মামা কমিশনের টাকাটা তাহলে আমার কপালে আর নেই।
চট করে কি এসব করে ফেলা যায়।
কম করে রাখ…হাজার দশেক। মাসে চারশো টাকা…
কাল আসিস।
রাতে ওরা আবার আলোচনা করেছিল।
ওখানে গিয়েও কষ্ট করা, কী লাভ তাহলে ফ্ল্যাট কিনে। মানুষ উপরে উঠতে চায়, নীচের দিকে নামে না।
প্রভিডেন্ট ফাণ্ডে হাত দেব না ভেবেছিলুম…আজ খোঁজ নিয়ে দেখলুম অফিসের সাত আট জন টাকা রেখেছে, জানতুমই না। হিমাংশুবাবুর ঝি পর্যন্ত চব্বিশ হাজার রেখেছে।
ঝিয়ের…চব্বিশ হাজার! এত?
ঝিয়ের ছেলে কারখানায় কাজ করত অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছল। দু-বছর ধরে কাঠখড় পুড়িয়ে হিমাংশুবাবুই কম্পেনসেশন চব্বিশ হাজার টাকা আদায় করে এনেছে। তারপর এখানে টাকা রাখার জন্য যা-কিছু করার সব করেছে, এখন সে-ঝি বস্তির ঘরে বসে মাসে মাসে প্রায় এক হাজার টাকা পাচ্ছে, ভাবতে পার? পনেরো টাকা মাইনের বাসনমাজা ঝি…
তুমি প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের সবটাই দাও।
বাণীর স্বরে তীব্রতা ছিল। সবটাই বরং বা সম্ভব হলে ধরনের দ্বিধা ছিল না। অরুণ পরদিন প্রভিডেন্ট ফাণ্ড থেকে টাকা তোলার জন্য দরখাস্ত করে। আড়াই মাস পর পরিতোষ একটা খাম দেয়, তাতে তার মাইনের থেকেও বেশি টাকা ছিল।
এখনও ইলেকট্রিক এল না, আজ কী সিনেমা আছে?
জানি না।
এখনও বৃষ্টি নামল না, ধানটান কেমন হবে কে জানে?
টিভিটা বিক্রি করে দাও।
অরুণ না শোনার ভান করল। বহু দূরের রাস্তা দিয়ে কয়েক জন মজুর মেয়ে-পুরুষ চলেছে। শাড়ির লালরংগুলো জমির মাটি ও গাছের পাতার মধ্যে চমৎকার সাম্যতা এনে দিয়েছে। এরকম কিছু-একটা তাদেরও থাকা উচিত ছিল, তাহলে লোভ সংবরণ করা যেত। অরুণ অবাক হল, লোভ শব্দটা এখনও বাণী বা সে ব্যবহার করেনি। হয়তো ভয়ে, কেননা তাহলেই ওটা ছোড়াছুড়ি হবে। তারা কেউই ঝগড়া করতে চায় না। এটা ঝগড়ার ব্যাপার নয়।
