খুকি বেরিয়ে এসে বলল, ছবিটা মরে পড়ে রয়েছে রে! এবং তারা ফিরে এল সন্তর্পণে, দ্রুত পায়ে, নীরবে।
রাত্রে নাইট ডিউটিতে বোরোবার আগে ফেলা দত্ত টিউবওয়েল থেকে খাবার জল আনতে গিয়ে আস্তাকুঁড়ে ঝুঁকে দেখল। ভেলোর মা তখন যাচ্ছিল, বলল, এতক্ষণ কি আর পড়ে থাকে, কাক-কুকুরে হয়তো খেয়ে ফেলেছে, কি ধাঙড়ে নিয়ে গেছে।
ইডিয়ট গাড়ল কোথাকার ড. মৈত্র গজরে উঠল। রুবি মাথা নামিয়ে বসে। ডাক্তার বলল, হতে পারে ওই একদিনের ভুলের খেসারত দিতে হতে পারে। তখন তো নার্সিং হোমে গিয়ে, ওই যা হয়েছে আজ…
হয় যদি হবে। রুবি হঠাৎ ছিলে-ছেঁড়া ধনুকের মতো উদ্ধত হয়ে উঠল।
মাথা নামিয়ে মুচকি হেসে গৌরীর মা বলল, রাগ করব কেন, তুমি তো আর পর ভেবে মারনি। রাগ তো নিজের জনের উপরই লোক করে।
তাহলে শাড়িটা পরো, দেখি কেমন মানায়।
আগে আলোটা নিবোও বাপু।
ছ-মাসও তো বিয়ে হয়নি, এত তাড়াতাড়ি সংসারে আটকে পড়ার কী দরকার ছিল? চাটুজ্জেদের ছোটোবউ শান্ত গলায় অনুযোগ করল।
সময় কাটাবার একটা ব্যবস্থা হল, ভালোই তো।
কেন, সেজন্য তুমিই তো আছ।
আমি তো পুরোনো হয়ে যাব একসময়।
কিছুক্ষণ পর ছটোবউ ফিসফিসিয়ে বলল, আচ্ছা ওইরকম কিছু-একটা ব্যবস্থা করা যায় না? সাড়া না পেয়ে বুঝল স্বামী ঘুমিয়ে পড়েছে।
কপিল নাচছে
আমি তো একা নই। হাজার হাজার লোকের…কারুর পাঁচ, কারুর পঞ্চাশ হাজার, কারুর পাঁচ লাখ। রণেনবাবু রিটায়ার করে যা পেয়েছিল, সারা জীবনের সঞ্চয় নব্বই হাজার ওখানে রেখেছিল, সব গেছে। আমি তো সেই তুলনায় ভাগ্যবান, ষাট হাজার মাত্র।
এক মাস ধরে অনবরত এই শুনছি, আর ভালো লাগে না হাজার হাজারের কথা শুনতে। সর্বনাশের মধ্যে এখন আমরা নিজেরাই।
তিন তলার বারান্দায় রবিবারের বিকেলে স্বামী-স্ত্রী অরুণ এবং বাণী রেলিংয়ে কনুই রেখে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে। ওদের দেখলে মনে হবে সফল জীবনকে তাদের সামনে স্থির বা ধাবমান প্রকৃতির মধ্যে পাঠিয়ে দিয়ে তা ফিরিয়ে নেবার জন্য প্রশান্ত আলস্যে যেন অপেক্ষা করছে।
চল্লিশ ফ্ল্যাটের সমবায় আবাসন সসাসাইটির চার তলা এই বাড়ির নাম বসবাস। বাড়ির সামনের রাস্তা পার হলেই পাঁচিলঘেরা পার্ক। পার্কের তিন দিকে খন্ড খন্ড বসতজমি কয়েকটিতে বাড়ি হয়েছে, কয়েকটিতে হচ্ছে। তারপরই ধু-ধু শূন্যতা। দূরে ছাইরঙের সদ্য সমাপ্ত অতিকায় এক বাড়ি, কোনো সরকারি দপ্তর হয়তো বসবে। আরও দূরে ছড়ানো গাছের আড়ালে গ্রামের আভাস দিচ্ছে কয়েকটি খড়ের চালা। তাতে লতানো গাছ, হয়তো লাউ বা চালকুমড়োর। পার্কের ডাইনে একটা ঝিলের কিছুটা অংশ দেখা যায়, কিন্তু দেখা যাবে না বাড়ি উঠলে। সকালে রোদ পড়লে ঝিলটা আয়নার মতো ঝলসায়। বিরাট কিছু গাছ ঝিলের ধার ঘেঁষে। তার কিছু ফুলের। হলুদ আর লাল এ পর্যন্ত দেখা গেছে। বাতাসে কাঁপানো পাতার ফাঁক দিয়ে রাস্তার বা বাড়ির আলো মিটমিট করে জোনাকির মতো। মেয়ে এবং পুরুষরা ঝিলে দুপুরে স্নান করে।
পার্কেও গাছ রয়েছে। উচ্চতায় এবং ঝাড়ে এখনও কৈশোরে কিন্তু হলুদ, সাদা, বেগুনি, লাল ফুল ফুটিয়েছে। সিমেন্টের বেঞ্চগুলো খালিই পড়ে থাকে। অভিজ্ঞতার প্রাচুর্যে উপচানো সঙ্গলোভী বৃদ্ধদের সংখ্যা এখনও হয়তো বাড়েনি এই অঞ্চলে। পাঁচিলের ধার ঘেঁষে ঝোপ, বড়ো বড়ো ঘাস। পার্কের যত্ন নেওয়ার লোকটি বোধ হয় অলস কিংবা বেতন কম পায়। ঝোপের উপর প্রজাপতি ওড়াউড়ি করে, তিন-তলা থেকে দেখা যায়। পার্কের মধ্যে শালিক নামে, ঝগড়া করে। জোড়া বুলবুলি এ গাছ ও-গাছ উড়ে বেড়ায়। লম্বা লেজওয়ালা কালো পাখি পার্কের পাঁচিলে কখনো-সখনো বসে। সকালে বা দুপুরে ঘুঘুর ডাক শোনা যায় দূর থেকে ভেসে আসা মোটর বা বাস বা জেনারেটরের শব্দ ছাপিয়েও।
এক বৃষ্টির দিনে মাটির সোঁদা গন্ধ, ঝাপসা গাছপালা এবং ঝম ঝম আওয়াজের মধ্যে প্রান্তরে একটা তাল গাছকে আবিষ্কার করে অরুণ অবাক হয়েছিল।
বসবাসের উত্তরের অংশে একটি ফ্ল্যাটের কিছুটা অভ্যন্তর দেখা যায় যদি পর্দা সরানো থাকে। একদিন ফুটফুটে একটা বাচ্চা হামা দিচ্ছিল। অবাক হয়ে ঝুঁকে দেখছিল বিরলকেশ, কৃষ্ণকায় হাফ প্যান্টপরা স্বাস্থ্যবান এক যুবক। হঠাৎ পর্দার আড়ালে থাকা কারুর দুটি নিটোল বাহু বাচ্চাটিকে তুলে নিয়ে চলে গেল। তারপর যুবকটি, সম্ভবত বাবা, বাচ্চাটার নকল করে ঘরে হামা দিয়ে এক বার ঘুরেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল এবং সেইসঙ্গে ভেসে এল মাঝরাতে ঝম ঝম বর্ষার মতো হাসি। বাণী এই দৃশ্য ও হাসিতে অভিভূত হয়েছিল।
এভাবে ঠকাবে একদমই ভাবিনি।
ভেবে আর লাভ নেই।
প্রসঙ্গটা দুজনেই এড়িয়ে যেতে চায় কিন্তু মনের মধ্যে সারাক্ষণই বিষাদের বোঝা বহন করে চলার সামর্থ্যও আর নেই। অরুণ কঠিন ধাতের মানুষ, যা তার ছোটোখাটো রুগ্নদেহ ও নম্র আচরণ থেকে বোঝা যায় না। স্কুলের পড়া শেষ করেই চাকরিতে ঢুকেছিল এবং গত তিরিশ বছরে ধাপে ধাপে উঠে এখন বিরাট এক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠানে বিক্রয় বিভাগের তিন নম্বর কর্তা। সে জানে আর তার ওঠার যোগ্যতা নেই, এখানেই আরও বছর দশেক থেকে অবসর নিতে হবে।
আজ ভাত খাবার সময় দেবু কিছু বলেনি?
পর পর তিন রোববার মাংস হল না। গাঁইগুঁই করছিল—অভ্যেস হয়ে গেছে তো। এখনও ব্যাপারটা জানে না।
জানতে হবে। নইলে…
কী জানবে?
সতেরো-আঠারো বয়স, এখন তো নানা ব্যাপারে অভ্যস্ত হবার সময়, নানা প্ল্যান মাথায় খেলে, স্বপ্ন দেখে। আমার ক্ষমতার ভরসাতেই তো সব। এখানে ওর বন্ধুবান্ধবরা সবাই সচ্ছল ঘরের। ওর চালচলন, আবদারগুলোও সেইরকম হয়ে উঠেছে। কিন্তু আমার ক্ষমতা যে নেই এটা ওকে বুঝিয়ে দিতে হবে, আমি যে মার খেয়ে গেছি…
