গলাখাঁকারি দিয়ে অরুণ তিক্তস্বরে বলল, এটা যে একটা বীভৎস ভালগার ব্যাপার তা আমি জানি। আমার পয়েন্ট হচ্ছে, একটি মেয়েমানুষ নিজের হাতে খুন-করা দুটি লাশের ওপর দেড় মাস শান্ত অচঞ্চল হয়ে কাটিয়ে দিল। কীভাবে সে পারল? ওই সময় সে নিজেই চায়ের দোকানটা চালিয়েছে, খদ্দেরদের সঙ্গে মিষ্টি করে কথা বলেছে, ঝগড়া করেছে, স্বামীর খোঁজ পাচ্ছে না বলে অনেকের কাছে উদবেগ পর্যন্ত প্রকাশ করেছে।
প্রফুল্লর দিকে তাকিয়ে চাপা হেসে মৃগাঙ্ক বলল, এটাকে সাবজেক্ট করেই অরুণবাবু একটা গল্প লিখে ফেলতে পারবেন।
প্রফুল্ল বলল, মন্দ কী, গল্প হয় না অরুণবাবু?
অরুণ গম্ভীর হয়ে গিয়েছিল। দ্বিধাজড়িত স্বরে সাবধানে বলল, হতে পারে। তবে এই দেড় মাস যেরকম স্বাভাবিকভাবে কাটিয়েছে তার একটা ব্যাখ্যা, মনের মধ্যে কী ঘটছিল, তার উৎপত্তি কোন উৎস থেকে, এসব না বোঝা পর্যন্ত এ ধরনের সাবজেক্ট নিয়ে গল্প লেখা যায় না।
আমাদের মধ্যে নরহত্যা কেউই বোধ হয় করেনি, তবে প্রাণী হত্যাকারী আছেন একজন। প্রফুল্ল ঘাড় নেড়ে সহাস্যে সকলের দিকে তাকিয়ে বলল, হত্যা করার পর মনের মধ্যে কী কী ব্যাপার ঘটে তিনিই বলতে পারবেন।
আমি কিন্তু মশা মাছি ছারপোকা ছাড়া জীবনে আর কিছু হত্যা করিনি। গীতা নকল গাম্ভীর্য দ্বারা আবহাওয়া লঘু করার চেষ্টা করল।
কিসসু ঘটে না। তখন একটা দারুণ একসাইটমেন্ট হয় বটে, তারপর যে-কে-সেই। পরিমল ঝুঁকে অরুণের সিগারেট প্যাকেট আবার তুলে নিল। জন্তুজানোয়ার মারা আর মানুষ খুন তো এক জিনিস নয়। মানুষ মারার উত্তেজনাটা অনেক দিন থাকে, হয়তো সারা জীবনই, যদি ধরা না পড়ে।
মৃগাঙ্ক মন্থর স্বরে কাউকে উদ্দেশ না করে বলল, এই উত্তেজনার উৎপত্তি কোন উৎস
থেকে?
ঘরটা চুপ করে রইল, এই সময় দূর থেকে পর পর তিন-চারটি বোমা ফাটার শব্দ এল। গীতা বলল, এই এক ব্যাপার শুরু হয়েছে, সন্ধের পর রোজ আওয়াজ করা। কী যে এর মানে, বুঝি না।
নড়েচড়ে বসল অরুণ। এসডিও সাহেবের কাছে শুনলাম, কাল বড়ো তালপুরে জমি দখলের আন্দোলন শুরু হচ্ছে। জোতদাররাও তৈরি আছে। অনেকগুলো লাশ পড়বে মনে হয়।
কাল মিসেস বসুমল্লিককে দেখলাম ফুটবল গ্রাউণ্ডের মিটিং-এ বক্তৃতা দিচ্ছেন। মাঠটা কিন্তু ভরে গেছল। গীতা এই বলে সপ্রশংস চোখে তাকাতে মৃগাঙ্কের মুখে বিরক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠল।
অরুণ জানে মৃগাঙ্ক তার স্ত্রীকে নিয়ে আলোচনা একদমই পছন্দ করে না। তাই বলল, পরশু ওঁকে সিদ্ধেশ্বরীতলায় বক্তৃতা দিতে দেখলাম। দারুণ বলেন, লোকেরা খুব মন দিয়ে শুনছিল। কালকে উনিও নাকি বড়ো তালপুরে যাবেন।
সেকী! না না বারণ করে দিন মৃগাঙ্কবাবু। গীতা উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল, খুনোখুনি হতে পারে, বলা যায় না।
অরুণ বলল, আমি এরকম একজন ফিয়ারলেস ওম্যান উইথ স্ট্রং পার্সনালিটি—সত্যি বলছি, কখনো দেখিনি। শুনলাম, বটারহাটে সেদিন জমি দখলের যে মারপিট হল, উনি নাকি তখন কাছাকাছিই ছিলেন। যেমন স্পিরিটেড তেমনি পরিশ্রমও করেন দিনরাত। আচ্ছা, ক বছর জেল খেটেছেন উনি মৃগাঙ্কবাবু?
টর্চের ব্যাটারি দুটো বার করে মৃগাঙ্ক তখন খোলের ভিতরটা গভীর মনোযোগে পরীক্ষায় ব্যস্ত। জবাব দিল না। অরুণ খুশি হল এবং বিষগ্ন ভঙ্গিতে বলল, শুনেছি জেল থেকেই নাকি ওঁর শরীর ভেঙে যায়।
পরিমল চুপচাপ সিগারেট খেয়ে যাচ্ছিল। শেষ টান দিয়ে জানলার বাইরে ছুড়ে ফেলে হঠাৎ বলল, এটা একটা নেশা, বুঝলেন মুনসেফবাবু? পলিটিকসে অনেক ভয় আছে। শিকারে যাই কেন, যেহেতু সেখানে ভয় আছে। জানোয়ার আমাকেও মেরে দিতে পারে। ওই ভয় থেকেই তো আসে উত্তেজনা। তখন ঝাঁঝাঁ করে শরীরের মধ্যে রক্ত ছোটাছুটি করে, ভারি আরাম হয়, নেশা নেশা লাগে। তবে কী জানেন, শিকার তো আর রোজ রোজ করা হয় না। তাহলে আপনি কি বলতে চান, মিসেস বসুমল্লিক… অরুণ যোগ্য একটি শব্দের জন্য প্রফুল্লর দিকে তাকিয়ে দেখল প্রফুল্ল একদৃষ্টে জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে। তখন সে গীতার দিকে তাকাল।
আমার ধারণা, বাচ্চা থাকলে উনি এসব করতেন না। গীতা গলা নামিয়ে কথাগুলো বলার সময় মৃগাঙ্ক এবং পরিমলকে দ্রুত দৃষ্টি বিনিময় করতে দেখল।
ইয়েস, আমারও তাই মনে হয়, অরুণ হাঁফ ছেড়ে বলল। একটা ভ্যাকুয়াম ওঁর মধ্যে নিশ্চয়ই তৈরি হয়েছে, যেটাকে ভরাবার জন্য উনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
অরুণবাবু, গম্ভীর এবং নিস্পৃহ স্বরে মৃগাঙ্ক বলল, আমরা মোটামুটিভাবে শিক্ষিত এবং রুচির একটা স্তরেও পৌঁছেছি। আমরা নিশ্চয় কিছু কিছু বিধিনিষেধও মেনে থাকি, যেমন অপরের ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে অযথা ও অনাবশ্যক আলোচনা প্রকাশ্যে না করা।
অরুণ সকলের মুখের দিকে তাকাল। গীতা বিস্মিত, প্রফুল্ল বিব্রত, পরিমল কৌতূহলী। মুখ নীচু করে অরুণ বলল, আই অ্যাম সরি, আমি মাপ চাইছি।
ঘরে অস্বস্তিকর একটা আবহাওয়ার সঞ্চার হয়েছে। কী করে সেটা কাটানো যায় চার জনেই তা নিয়ে মনে মনে ভাবছে। গীতা হঠাৎ বলে উঠল, এই যাঃ, যেজন্য আসা সেটাই বলা হয়নি এতক্ষণ। কাল রাতে আপনারা দুজন কিন্তু আমার ওখানে খাবেন।
আবার কেন ঝাট করা। প্রফুল্ল আড়ষ্টভঙ্গিতে ক্ষীণ আপত্তি জানাল।
হোক ঝঞ্ঝাট, এক বারই তো। আপনাদের রাতের রান্নার পাট আর তাহলে থাকবে না।
অরুণ ব্যস্ত হয়ে বলল, দিনেও থাকা উচিত নয়। সকালে তাহলে আমার ওখানেই দুটি ঝোল ভাত খেয়ে নেবেন।
