না না অরুণবাবু, সকালে আমরা সময় পাব না। অনেকগুলো কাজ সেরে ফেলার আছে। বইগুলো এখনও বাইরে পড়ে। তা ছাড়া ভারী মালপত্তর বিকেলের মধ্যেই স্টেশনে পাঠিয়ে দেব বুক করার জন্য। পরিমলবাবু আপনার প্যাকিং বাক্সটা কাল কখন পাঠাবেন?
পরিমল কিছু বলার আগে ঘরে ঢুকল করবী এবং মিরা। পিছনে ট্রে হাতে বাসন্তীর মা। ওর হাত থেকে ট্রে-টা নিয়ে টেবলে রাখতে রাখতে করবী বলল, অরুণবাবুর গল্প বলা হয়ে গেছে তো?
গল্প নয় মিসেস ঘোষাল, ফ্যাক্ট। অরুণ ঈষৎ আহত কণ্ঠে বলল, বরং এটার উপর রং দিয়ে একটা গল্প লেখা হতে পারে। আপনি ভাবতে পারেন, একজন স্ত্রীলোক তার স্বামী আর আরেক জন স্ত্রীলোকের মৃতদেহের দেড় হাত উপরে বিছানা পেতে দেড় মাস ধরে শুয়েছে। কী করে পারল? ইয়েস, মাত্র দেড় হাত!
অরুণ থামামাত্র মিরা চাপা কণ্ঠে বলল, এইসব খুনোখুনির গল্প কী করে যে আপনারা শোনেন! কেমন গা-শিরশির করে শুনলে।
মিরার কথাগুলো যেন শুনতে পায়নি এমনভাবে অরুণ বলে চলল— আমি নিজে সেই স্ত্রীলোকটিকে থানায় আজ দেখেছি। অতি স্বাভাবিক মনে হল। একদম উত্তেজনা নেই, ভয়ও নেই। ঘোমটা দিয়ে বসে, যা জিজ্ঞাসা করছে উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। একদম নির্লিপ্ত। অথচ দেড় মাস ধরে অপরাধটা লুকিয়ে রেখেছিল, অ্যাকসিডেন্টালি ধরা না পড়লে তো জানাই যেত না।
কী করে খুনটা করল? গীতার কৌতূহলে কিঞ্চিৎ উত্তেজনাও প্রকাশ পেল।
আঃ। মিরা চায়ের কাপ নেবার জন্য করবীর দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, আবার এইসব গল্প।
গীতা ঘাড় ফিরিয়ে মিরার দিকে তাকাল। অরুণ রাগে মুখ লাল করে, অনাবশ্যক গলা চড়িয়ে বলল, পিছন থেকে মাথায় কয়লা ভাঙার লোহা দিয়ে মেরেছিল।
থাক গে এসব আলোচনা। মৃগাঙ্ক হেসে বলল, মিসেস সসামের বোধ হয় ভালো লাগছে না।
সারারাত ধরে গর্তটা খোঁড়ে একটা শাবল দিয়ে।
আমি এখন চলি। দোকানে একজনের আসার কথা। বাক্সটা কাল পাঠিয়ে দেব। পরিমল খালি চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে ব্যস্ত হয়ে চলে গেল।
ছোটগর্ত, ওরই মধ্যে দুমড়ে মুচড়ে বডি দুটোকে কোনোরকমে ভরে মাটিচাপা দিয়ে বিছানাটা পেতে ঢেকে রাখে।
ভালো কথা, প্রফুল্ল তাকাল করবীর দিকে। গীতা কাল আমাদের নেমন্তন্ন করেছে। রাত্রে।
ওমা, আমিও তো করবীদিকে রান্নাঘরে বললুম আমাদের ওখানে খাওয়ার জন্য, কাল রাতেই। মিরা উত্তেজিত হয়ে প্রফুল্লর দিকে তাকাল।
অরুণ দাঁতচাপা স্বরে বলল, মিস বিশ্বাস আগে বলেছেন এবং ড. ঘোষাল অ্যাকসেপ্টও করেছেন।
তোমাকে ওর হয়ে ওকালতি করতে হবে না। মিরা ক্ষিপ্তের চাহনিতে স্বামীকে বিদ্ধ করে রাখল কিছুক্ষণ। এই পরিস্থিতি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করার জন্য গীতা ঝুঁকে মৃগাঙ্ককে বলল, আপনার তো বন্দুক আছে, শিকারটিকার করেন না?
মাঝে মাঝে বেরোই, তাও পাখিটাখি! আসলে আমি খুব ভীতু লোক তো… মৃগাঙ্ক এমনভাবে হেসে উঠল যেটা এখন বিদ্রুপের মতো ধ্বনিত হল। প্রফুল্ল আর করবী অসহায়ভাবে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছে লক্ষ করে অরুণ গোঁয়ারের মতো বলল, না, মিস বিশ্বাসের নেমন্তন্নই ওঁরা নেবেন, নেওয়া উচিতও।
কেন, আমার নেমন্তন্ন কী অপরাধ করল? আমি কি রাঁধতে জানি না ওঁর মতে, না লোকের সঙ্গে কথা বলতে কি মিশতে পারি না? বলতে বলতে মিরার ঠোঁটের দুই কোণে থুতু জমে ওঠে।
গীতা কিছু-একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল। প্রফুল্ল জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতে, কঠিন গলায় বলল, সামান্য ব্যাপারটা নিয়ে একটু বেশিই ছেলেমানুষি হচ্ছে যেন। আমি বরং আমার নেমন্তন্ন উইথড্র করছি।
অরুণ ব্যস্ত হয়ে বলল, সেকী, তা কেন হবে!
আমার স্কুলের কিছু কাজ রয়ে গেছে, আজ চলি। গীতা উঠে দাঁড়াল। সাধারণভাবে হেসেই পরমুহূর্তে গম্ভীর হয়ে সে তার পঙ্গু ডান পা টানতে টানতে বেরিয়ে গেল। ওর পায়ের শব্দ গেটের কাছে পৌঁছোবার আগেই মিরা দু-হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে বলে উঠল, তুমি চাও আমার অপমান, আমি বুঝতে পারি, সব বুঝতে পারি।
চুপ করো। কর্কশ স্বরে অরুণ ধমকে উঠল। হিংস্র দেখাচ্ছে ওকে। মিরা ভয়ে কুঁকড়ে গেল। বাড়ি চলো। অরুণ উঠে দাঁড়িয়ে কারুর দিকে না তাকিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। মিরা ভীত চোখে ঘরের তিনটি লোকের উপর দিয়ে চাহনি বুলিয়ে দ্রুত স্বামীর অনুসরণ করল।
প্রত্যাশিত অপ্রতিভতা কাটিয়ে মৃগাঙ্কই প্রথম কথা বলল, মিসেস সোম অরুণবাবুকে খুব ভয় করেন। তারপর হেসে বলল, অর্থাৎ পরিমল সাঁপুইয়ের যুক্তি অনুযায়ী নেশার ঘোরে আছেন।
প্রফুল্ল তামাক দিয়ে কাগজ পাকাতে পাকাতে মাথা নীচু করে বলল, এটা একটা গতানুগতিক ভয়। নেশা হবার মতো উত্তেজনা এতে নেই। নেশা হয় সেই ধরনের ভয়ে যা দিয়ে অনুভব করা যায় জীবনকে। আপনার কী মনে হয়?
প্রফুল্ল মুখ তুলে শান্ত চোখে মৃগাঙ্কের বদলে করবীর দিকে তাকাল। চেয়ারে বসে করবী। হাত-দুটি কোলের উপর দুর্বলভাবে রেখে ক্লান্তভাবে প্রফুল্লর দিকে তাকিয়ে।
মানুষের শ্রেষ্ঠ ভয় মৃত্যুভয়। সেটা সামনে এসে দাঁড়ালে তখনই শ্রেষ্ঠ জীবনযাপন সম্ভব। মৃগাঙ্ক নীচু স্বরে কথাগুলো বলে থামল এবং কয়েক মুহূর্ত পরই দ্রুত যোগ করল, কিন্তু ভয়েরও রকমফের আছে।
কীরকম? পুরু লেন্সের ওধারে চকচক করে উঠল প্রফুল্লর চোখ দুটি। মৃগাঙ্ক চুপ করে রইল।
আপনি কখনো ভয়ের মুখোমুখি হয়েছেন? প্রফুল্ল আবার বলল।
অস্পষ্ট স্বরে মৃগাঙ্ক বলল, আমার সন্তান নেই, হবার সম্ভাবনাও নেই।
