শুনেছেন তো আজকের ঘটনাটা? চেয়ারে বসে অরুণ বলল। প্রফুল্ল অবাক চোখে তাকাতেই সে উত্তেজিত হয়ে সিগারেট বার করল। স্টেশনের গায়েই সারি সারি দরমার তৈরি রিফিউজিদের যে-দোকানগুলো রয়েছে তার মধ্যে একটা চায়ের দোকানও আছে। প্রায় দেড় মাস আগে সেই দোকানদারের বউ থানায় গিয়ে বলে তার স্বামী তিন দিন যাবৎ নিখোঁজ। পুলিশ খোঁজ নিয়ে দেখল ওখানকার একটা যুবতী বিধবাকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সুতরাং দুই আর দুইয়ে চার ধরে নিয়ে ব্যাপারটা ওখানেই ধামাচাপা পড়ে। আজ সকালে দোকানের মাটির মেঝে খুঁড়ে দুটো লাশ পাওয়া গেছে। দুটোরই মাথার খুলির পিছন দিকটা চুরমার অর্থাৎ পিছন থেকে ভারী কিছু দিয়ে…
করবীকে ঢুকতে দেখে অরুণ থেমে গেল। সিগারেটের কাগজ ও তামাক প্রফুল্লর হাতে তুলে দিয়ে করবী হেসে মিরাকে বলল, বাচ্চারা কেমন আছে? আপনার শরীরও তো ভালো মনে হচ্ছে না।
শোনামাত্র খুশিতে নড়েচড়ে বসল মিরা। কিন্তু অরুণের বিরক্ত চোখে চোখ পড়ামাত্র নিরাসক্ত স্বরে বলল, আমি ভালোই আছি। কাল আপনারা চলে যাবেন তাই দেখা করতে এলুম।
অরুণ ইতিমধ্যে সিগারেট ধরিয়ে ফেলেছে। প্রফুল্ল মাথা নীচু করে সিগারেট বানাতে ব্যস্ত। অরুণ গলাখাঁকারি দিল। করবী বলল, গল্পটা শেষ না করা পর্যন্ত অরুণবাবু স্বস্তি পাবেন না, বরং শেষ করেই ফেলুন।
গল্প নয় মিসেস ঘোষাল, ফ্যাক্ট! আমি নিজে গিয়ে দেখে এসেছি। বউটাকে অ্যারেস্ট করে থানায় যখন ইন্টারোগেট করা হচ্ছে তখন আমি ছিলাম, এসডিও সাহেবও ছিলেন। নিজে থেকেই স্বীকার করল খুন করেছে। কী বীভৎস ব্যাপার ভাবুন! দোকানটার পিছনে একটা খুপরিতে থাকত আর খুন করে তারই তলায় মেঝের মাত্র দেড় হাত নীচে দুটো ডেডবডি পুঁতে রেখে দেড় মাস তার উপর শুয়েছে। ভাবতে পারেন? অথচ এমন কোয়ায়েটলি সব কথা বলে গেল যেন অরুণ যুৎসই উপমা খোঁজার জন্য মুহূর্তেক অবসর নিতেই মিরা বলল, পাপ কখনো কি চাপা থাকে!
প্রফুল্ল বলল, কার পাপ?
মিরার বসার ভঙ্গিটা কঠিন হয়ে গেল। মেঝের দিকে তাকিয়ে হাত মুঠো করল এবং কাঁপা গলায় বলল, কার আবার, স্বামীর পাপ।
আর যে খুন করল তার বুঝি পাপ হয় না।
চোখ তুলে করবীর দিকে এক বার তাকিয়ে মিরা একটু ভেবে বলল, কী জানি।
তিন জনের কেউ কিছুক্ষণ কথা বলল না। নীরবতা ভাঙার জন্য প্রফুল্ল বলল, অরুণবাবু কাল সকালেই ভারী মালগুলো স্টেশনে পাঠাব বুকিংয়ের জন্য। আপনার চৌকিটা নিতে কালই কিন্তু লোক পাঠাবেন।
অরুণ অন্যমনস্কের মতো মাথা কাত করল। বাইরে গেট খোলার শব্দ হল। গেট থেকে বারান্দা পর্যন্ত প্রায় পনেরো মিটার ইট-বাঁধানো পথের উপর দিযে জুতোর শব্দ এগিয়ে আসতেই অরুণ বলল, পরিমলবাবু।
দশাসই লম্বা মধ্যবয়সি পরিমল সাঁপুই ঘরে ঢুকেই বলল, উকিলবাবু, হেড দিদিমণি, ওরা এখনও আসেনি? একটু আগেই দোকান থেকে যেন দেখলুম দুজনকে রিকশায় আসতে।
শুনেই মুখ কালো হয়ে গেল অরুণের। বলল, আপনি বোধ হয় ভুল দেখেছেন।
আর যা-ই ভুল হোক অরুণবাবু, চোখের ভুল আমার হবে না। আগের মাসেও এক জোড়া বুনো শুয়োর মেরেছি পঞ্চাশ গজ দূর থেকে। আর দুটো চেনা মানুষকে পঞ্চাশ হাত দূর থেকে চিনতে পারব না? পরিমল শেষপর্যন্ত বিরক্তি চেপে রাখতে পারল না।
অরুণ জবাব দিল না। প্রফুল্ল বলল, আজ রোমহর্ষক একটা ব্যাপার নাকি শহরে আবিষ্কৃত হয়েছে?
পরিমল তাচ্ছিল্যসূচক একটা শব্দ করে বলল, ওরকম আকছারই ঘটে। আমি কিন্তু বেশিক্ষণ বসব না, দোকানে একজনের আসার কথা। যেজন্য এসেছি বলে নিই, একটা বড়ো প্যাকিং বাক্সে মাল এসেছে, মজবুত খুব। আপনার দরকার লাগে যদি কাল পাঠিয়ে দেব।
ভীষণ দরকার, তাহলে দামি বইগুলো আর থলেয় ভরতে হয় না। করবী উৎসাহভরে বলল।
তাহলে চা খাওয়ান। পরিমল হাত বাড়িয়ে অরুণের সিগারেট প্যাকেটটা তুলে নিল।
রিকশার ভেঁপু বাজল রাস্তা থেকে। অরুণ চেয়ারের হাতলে ভর দিয়ে শরীরটাকে তুলে বাইরে তাকিয়েই আবার বসে পড়ল। পরিমল মুচকি হাসল। মিরা হাত মুঠো করে দেওয়ালে তাকিয়ে রইল।
প্রথমে ঘরে ঢুকল গীতা। ত্রিশের কাছাকাছি বয়স। বাল্যে পোলিওয় ডান পা-টি পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ চিকিৎসায় সেরে উঠলেও এখন সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটে। এই ঘাটতি অবশ্য দেহের অন্যান্য অংশ মনোরমভাবে পুষিয়ে দিয়েছে। মোটা জ্বয়ের নীচে ওর চোখ দুটি সতত চঞ্চল, ঠোঁট দুটি পুরু এবং টসটসে, নাক চাপা, গলায় রক্তাভ জড়ল। কণ্ঠস্বর ঈষৎ কর্কশ।
গীতার পিছনে পাঞ্জাবি ও ঢোলা পায়জামা পরা মৃগাঙ্ক, রুমাল দিয়ে ঘাড় মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকে বলল, আজ বড্ড গুমোট। ধনী বনেদি পরিবারের সন্তান, প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়সি মৃগাঙ্ক স্থূলকায়, টকটকে গায়ের রং, মাথায় অল্প টাক পড়েছে।
ঠিক সময়েই এসেছে গীতা, চা করতে যাচ্ছিলাম আর অরুণবাবুও একটা খুনের গল্প বলছিলেন।
কী খুনের? বলেই গীতা খালি চেয়ারের দিকে এগোল।
বাঃ শোননি? করবী বিস্মিত স্বরে বলল। স্টেশনের ধারে এক চায়ের দোকানের মেঝে খুঁড়ে এক জোড়া লাশ পাওয়া গেছে!
না তো! কী ব্যাপার অরুণবাবু?
মিরা আচমকা উঠে করবীকে বলল, এইসব গল্প দু-বার শুনতে আমার ভালো লাগে না। চা করতে যাবেন তো চলুন, আমিও যাব।
মিরা এবং করবী ঘর ছেড়ে যাবার পরও সবাই ভিতরের দরজার দিকে তাকিয়ে থাকল। মৃগাঙ্ক বলল, আমি অবশ্য শুনেছি, কিন্তু এইরকম বীভৎস নোংরা একটা ব্যাপার নিয়ে কোনো মহিলার সঙ্গে আলোচনা করতে ইচ্ছে হয়নি।
