কিন্তু ও কে? আনন্দ বিশ্বাস করতে পারছে না। কোমরে হাত রেখে। সরু কঞ্চির মতো ডান পা। শরীরটা ডানদিকে হেলে রয়েছে। মেয়েদের থেকে একটু তফাতে দাঁড়িয়ে গভীর মনোযোগে লেডি সোবার্সের স্টার্ট শেখানো দেখছে। বীরা দত্ত রোড ধরে ডগুদা তখন হনহনিয়ে আসছে কৌতূহলী দৃষ্টি মেলে।
ডগুদাকে দেখে ও বাঁ দিকে ঝুঁকে পা টানতে টানতে এগিয়ে গেল। লাইব্রেরির দরজায় তালা খুলে ডগুদা ভিতরে ঢুকল। বেরিয়ে এল হাতে একটা বেলের। আকারের লোহার গোলা নিয়ে, একে ওরা বলে শট! ইনস্টিটিউটের টিকে থাকা যে কটি লোহার সম্পত্তি এখনও রয়েছে এটি তারই অন্যতম।
শটটা দুহাতে ধরে, ও দুলে দুলে ফিরে এল। ধপ করে মাটিতে ফেলে, তালু ঝাড়ল। অবাক হয়ে আনন্দ ভাবল, লোহার বল কে ছুড়বে? ওই মেয়েরা না লেডি সোবার্স?
উত্তরটা একটু পরেই সে জেনে গেল। মেয়েরা একে একে বাড়ির দিকে রওনা হয়েছে। সাতটার পর ওরা থাকে না। হয়তো পড়াশুনা করতে হয়। লেডি সোবার্স শট নিয়ে ছুড়তে শুরু করল। তিনটে ইট সাজিয়ে সার্কল করেছে। সার্কলের দিকে পিঠ ফিরিয়ে। ডান হাতে ধরা শট ডান গালে ঠেকিয়ে কুঁজো হয়ে। বাঁ পা জমি থেকে তোলা। স্ট্যাচুর মতো কয়েক সেকেন্ড নিথর, তারপরই ছিলেছেড়া ধনুকের মতো ছিটকে উঠল। ডান পায়ের ওপর ভর করে তিনটে ছোট্ট লাফে সার্কলের কাছে পৌঁছেই শরীরটা ঘুরিয়ে নিয়ে বাঁ পা মাটিতে ফেলল। ডেলিভারি দেবার ঠিক আগে যেন—তারপর সারা শরীরের মাসল টানটান। সব জোর গুটিয়ে এসে কাঁধে, সেখান থেকে ডান বাহু বেয়ে উঠে এল শট ধরা মুঠোয়। আ আ আহ চাপা একটা গোঙানির মতো আওয়াজ এতদূর থেকেও আনন্দ শুনতে পেল। তারপরই লোহার গোলাটা হাত থেকে উড়ে বেরিয়ে এল। মাটিতে পড়তেই ধপ শব্দ হল একটা।
ও প্রায় পনেরো হাত ছুটে গেল, দুলতে দুলতে। একটা ভাঙা ইটের ছুচলো টুকরো দিয়ে আঁচড় কাটল যেখানে গোলাটা পড়েছে। তারপর সেটা দুহাতে ধরে ফিরে এল লেডি সোবার্সের কাছে। আনন্দ হেসে ফেলল। সর্বত্র এই ওর কাজ, ফিরিয়ে দেওয়া। কিন্তু সারাজীবন কি ওর এইভাবেই চলবে! খাওয়া-পরার জন্য তো ওকে কাজকম্মো করতে হবে, চেষ্টা না করলে কি কাজ পাওয়া যায়? তা ছাড়া কে ওকে কাজ দেবে? খোঁড়া লোকেরাও চাকরি করে কিন্তু তারা লেখাপড়া জানে। ও তো স্কুলে পড়ে বলে মনে হয় না।
পিছনে গলা খাঁকরি হতেই আনন্দ চমকে কুঁকড়ে গেল। তাকিয়ে দেখল, বাবা।
এখানে?
এই দেখছি, কেমন প্র্যাকটিস করছে শট পাট।
অনাদিপ্রসাদ এগিয়ে এসে মাঠের দিকে তাকালেন, ভ্রু কুঞ্চিত হল।
অসভ্যের মতো পোশাক, এসব কী! মেয়েছেলের এ কী বেশ!
আনন্দ একপা একপা পিছাচ্ছে।
তুমি দেখছিলে?
এইমাত্র আমি এলাম।
হুম।
দরজার কাছে পৌঁছে গেছে। ডান দিকে ঘুরেই আনন্দ ছুটে ঘরে এল। অনাদিপ্রসাদের গলা শোনা গেল, বিপিনদাকে ধমকাচ্ছেন আনন্দর উপর নজর রাখায় অবহেলার জন্য।
সারাদিন কিছু করার নেই। মেজদার এনে দেওয়া গল্পের বই পড়া আর বিলিতি খেলার ম্যাগাজিন দেখা ছাড়া। ছবিগুলো দেখে দেখে চোখ পচে গেছে। ইংরেজি অক্ষরগুলোর অধিকাংশেরই মানে বুঝতে পারে না। আর বুঝতে না পারলে শুধু ছবি দেখে কী লাভ। বাড়ির কয়েকটি লোকের মুখ আর গলার শব্দ, এছাড়া আর কোনও মানুষের মুখ সে দেখতে পায় না। পুবের জানলা দিয়ে দূরে, কয়েক হাত বীরা দত্ত রোড আর মাঠে লরি দাঁড়ালে কয়েকটা লোক দেখা যায়। শুধু একদিন দুপুরে খুব কাছ থেকে একটা লোককে দেখেছিল।
উত্তরের জানলা দিয়ে সে দূরে তাকিয়ে শুয়েছিল। বহু দূর পর্যন্ত আকাশ দেখা যায়। ঘন ঝোপগুলোর ওপাশে জলা। মাঝে মাঝে ইলেকট্রিক ট্রেনের ভেঁপু বেজে উঠছে। আনন্দ কিছুই ভাবছিল না। শুধুই তাকিয়ে রয়েছিল। এমন সময় হঠাৎ জানলার গায়ের পথটা দিয়ে একটা লোক চলে গেল। পাঁচ-ছ সেকেন্ড পরে লোকটা, যার একমুখ দাড়ি আর একরাশ পাকাচুল, পিছিয়ে এসে অবাক হয়ে জানলা দিয়ে ভেতরে তাকাল। কারখানার কেউ, হয়তো গুদামে যাচ্ছে। আগে কখনও সে এই জানলাটা খোলা দেখেনি।
আনন্দ চমকে উঠেছিল। প্রায় তিন হাত দূরে এমন বিদঘুটে একটা মুখ আচমকা হাজির হলে ভয় তো করবেই। হাত বাড়িয়ে জানলার পাল্লাটা বন্ধ করে দিয়েছিল। বহুক্ষণ পরে পাল্লা খুলে এধার ওধার তাকায়। লোকটাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল। বহুদিন সে বাইরের মানুষ দেখেনি। তারপর সে একটু একটু করে বিষণ্ণ হয়ে পড়তে শুরু করে। খুব স্বাভাবিক, সাধারণ বিষণ্ণতা। দীর্ঘদিন মানুষ না দেখলে, বাইরে বেরোতে না পারলে, এরকম সকলেরই হয়। এই নিয়ে নালিশ করা যায় না। করবেই বা কার কাছে। প্রতিদিন সকালে আর রাতে মেজদা আসে। তাকে কিছু বলা যাবে না। এই নিয়ে। বেরোনোর কথায় একদমই কান দেবে না।
আনন্দ আপনমনে মাথা নাড়ল। মনটা ভার লাগছে। সকালে মেয়েদের ছোটা দেখে তার নিজেরও ইচ্ছা করেছিল, মাঠে গিয়ে ছুটতে। ওদের মতো স্টেপিং ফেলে দৌড়তে। হঠাৎ সে উঠে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করল। যেভাবে ওরা পা ফেলছিল সেই ভঙ্গিতে পা ফেলে ছোট্ট ঘরটায় আনন্দ পাক দিতে শুরু করল।
মাথাটা ঘুরছে, আনি-মানি-জানিনার পর যেভাবে ঘোরে। হাঁপ ধরছে। কারণ, যে-কোনও পরিশ্রমই একদম বারণ। আনন্দ দাঁড়িয়ে পড়ল। মুখটা রাগে গনগনে হয়ে উঠল। দ্বিগুণ জোরে সে হাঁটু তুলে তুলে ঘরের মধ্যে গোল হয়ে ছুটতে শুরু করল। আর বিড়বিড় করে বলতে থাকল:
