বেশ করব। বেশ করব। বারণ বারণ বারণ। মানি না মানি না। এভাবে বেঁচে থাকার দরকার নেই, মানে হয় না।
বিছানার উপর দড়াম করে পড়ল সে। বালিশে মুখ ডুবিয়ে হাঁপাচ্ছে। হাঁপানিটা ধীরে ধীরে কান্নায় রূপান্তরিত হল। ফুপিয়ে ফুঁপিয়ে কিছুক্ষণ কেঁদে সে শূন্য চোখে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল। তখন সে একটা পাখির ডাক শুনতে পেল। প্রথমে ভেবেছিল বাঁশি। দ্বিতীয়বার সে মুখ তুলে উত্তরের জানলা দিয়ে তাকাল। ক্ল্যারিওনেটে প্রথম ফু দেওয়ার মতো করুণ একটানা। সেকেন্ড চারেক পরই স্বরটা ছটফটিয়ে লাফালাফি করল ছোট্ট বাছুরের মতো।
বার তিনেক ডাকার পর পাখিটার আর সাড়া নেই। কী পাখি? কোথায় ছিল এতদিন? ঝোপ-জঙ্গলের দিকে চোখ রাখল আনন্দ। অদ্ভুত ডাকটা তো। ময়না, কোকিল আর টিয়ে, কাক, চড়াই আর পায়রা ছাড়া কটা পাখির ডাকই বা শুনেছি। কটা গাছই বা চিনি। গ্রামের ছেলেরা অনেক বেশি জানে। এ পাখিটা আগেও হয়তো ডেকেছে, শুনিনি। কী মিষ্টি, অদ্ভুত কী যেন একটা রয়েছে শিসটায়।
আনন্দ বুঝতে পারছে না, কিন্তু শরীরে অনুভব করতে পারছে। হাতের রোমগুলো খাড়া হয়ে উঠেছে। তিরতির করে কাঁপুনি দিয়েছিল যেভাবে আজ সকালে তার বুকের মধ্যে হয়েছিল। নিঃসঙ্গ দিন ও রাতের মধ্যে ঢুকে পড়েছে অজানা এক সঙ্গী, এই শিসটা।
আবার শিস।
পুবের জানলায় সরে এসে আনন্দ নিম গাছের ডালে ডালে চোখ ফেলতে লাগল। কত বড়? চড়ুইয়ের মতো ছোট্ট? কাকাতুয়ার মতো বড়? শালিক পাখির মতো রঙ? কী নাম?
আনন্দ একবার উত্তরের, একবার পুবের জানলায় আসা-যাওয়া শুরু করল। আর ডাকছে না, হয়তো উড়ে গেছে। কিংবা ও সারাদিন তিন-চারবারের বেশি ডাকে না। কত পাখির কতরকমের স্বভাবই যে থাকে। কিংবা এখনি হয়তো কোনও বেড়াল কি চিল কি সাপ ওকে…!
হতাশ হয়ে আনন্দ বিছানায় শুয়ে বাইরে তাকাল। আকাশ ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। আকাশে মেঘ, উঁচু থেকে তোলা হিমালয় পর্বতমালার ছবির মতো। কী নিঃসঙ্গ, ধূধূ, বিরাট! বহুদিন আগে একটা রূপকথায় সে পড়েছিল, মানুষ মারা গেলে মেঘ হয়। সে বিশ্বাস করত এবং এখনও করে তার মা মেঘ হয়ে আকাশে কোথাও আছে। কিংবা হয়তো নেই। গনগনে রোদের তাপে সমুদ্র নদী খাল বিলের জল বাষ্প হয়ে মেঘ হয়। এসব প্রকৃতির তৈরি মেঘ। তার মা এভাবে মেঘ হবে না। কীভাবে হবে, কেমন দেখতে হবে তাই নিয়ে সে ভাবতে থাকল।
ঘুমিয়ে পড়েছিল আনন্দ। বন্ধ দরজায় ধাক্কার শব্দে ঘুম ভাঙল। হাবুর মা দুধ এনেছে। সে তাকাল লেবুগাছের পাশ দিয়ে মাঠের দিকে। ম্লান হয়ে এসেছে বিকেল। সন্ধ্যা নামছে। কয়েকটি মেয়ে মাঠের উপর দৌড়ে গেল। তারপর ও এল দুলতে দুলতে। ভাঙা ইটের টুকরো কুড়িয়ে একধারে ছুড়ে ফেলতে ফেলতে এগোচ্ছে। খালি পায়ে মেয়েদের পা কাটে, ব্যথা লাগে বলে তাই কাজে নেমে পড়েছে। সেই কুড়োনোরই কাজ। আনন্দ হাসতে গিয়েও হাসল না। ও যা কিছু করে সবই অন্যকে সাহায্য দিতে যেটা ওরই দরকার। লেডি সোবার্স বিকেলে আসে না। এধার ওধার ঘুরে এই সময়টায় হয়তো লটারির টিকিট বিক্রিতে ব্যস্ত থাকে। নিশ্চয় খুব গরিব। অনেকগুলো লোক আছে বাড়িতে, তাদের খাওয়াতে পরাতে হয়। ওর কাছ থেকে। একটা টিকিট কিনলে কেমন হয়?
সন্ধ্যায় হাবুর মা আফিংয়ের মৌতাতে কুঁদ হয়ে থাকে। বাবা চেম্বারে, মেজদা তো কোনওদিনই ফেরে না। বিপিনদা এইমাত্র কাচা জামা-প্যান্টের পুঁটলি নিয়ে বেরোল ধোপার কাছে ইস্ত্রি করিয়ে আনতে।
সন্তর্পণে ফটক থেকে বেরিয়েই আনন্দ প্রায় ছুটে অন্ধকার মাঠের মধ্য দিয়ে ইনস্টিটিউটের দিকে এগোল। ডগুদা লাইব্রেরি খুলেছে অনেকক্ষণ।
ডগুদা নিজেই একদিন বলেছিল, তার নাম ডগু কেন।
ডগ থেকে ডগু। ডগ মানে কুকুর। পতৌদির নাম টাইগার কেন জানিস? ছোটবেলায় ও বাঘাহামা দিত। তাই আদর করে টাইগার বলে ডাকা হত। আমিও ওই রকম হামা দিতুম, কিন্তু আমাকে বাবা আদর করে বলত ডগ। পতৌদির বাবা ছিল নবাব, আমার বাবা ছিল স্যাকরার দোকানের কারিগর। জীবনে হালুম হালুম করার চানস আর এল না, শুধু ঘেউ ঘেউই করে গেলুম। তাই সবাই বলে রগচটা ডগু।
ডগুদার বয়স বোঝা যায় না। চল্লিশ থেকে ষাটের মধ্যে যে কোনও একটা বয়স ধরে নেওয়া যেতে পারে। বিয়ে করেনি। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছে কি না বোঝা যায় না কথাবার্তায়। মাথায় টাক, ছোটখাটো রোগাটে চেহারা। ভাইদের সংসারের এককোণে পড়ে আছে। বাড়ির বাইরের দিকের ঘরটায় থাকে। ময়দানে ঘেরা মাঠের গেট-কিপার। দৈনিক সাতটাকা মাইনে। বছরে পাঁচমাস মাত্র এই চাকরি। বাকি সাতমাস চলে টিউশনি করে। কয়েকটা বাচ্চা ছেলেকে পড়িয়ে মাসে আশি টাকা পায়। আর আছে আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের জন্য বেগারখাটা। তারই অন্যতম, এই অবৈতনিক লাইব্রেরিয়ানের কাজ।
পঁয়ত্রিশ বছরের এই লাইব্রেরিতে গত বছর দশেক বই কেনা হয়নি। তার আগে কেনা আর চেয়েচিন্তে আনা হাজার খানেক পুরনো বই নিয়েই ডগুদা চালিয়ে যাচ্ছে। মেম্বারদের চাঁদা থেকে মাসে গোটা পঁচিশ টাকা পাওয়া যায়। ইলেকট্রিক বিলের বাকি টাকা জমে গেলে ডগুদা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে সেক্রেটারি অনাদিপ্রসাদের কাছে। কিছুক্ষণ ধরে চড়াগলায় বলে যায়—পাড়াটা মরে গেল, এলাকাটা মরে গেল। কী ছিল আর কী হয়েছে। ছেলেরা বই পড়ে না, খেলাধূলো ব্যায়াম করে না। আপনারাও এসব দেখবেন না। নতুন বই কেনা দরকার, খেলার জিনিস টিনিস কিনে ছেলেদের সংগঠিত (ডগুদা ঘেরামাঠ কর্মচারী ইউনিয়নের সদস্য) করে একটা খেলার ক্লাব দরকার। প্রেসিডেন্ট তো মাঠটাকে নিজের কায়েমি স্বার্থে ব্যবহার করছে, তার তত উদ্দেশ্য মাঠটায় যাতে খেলাধুলো না হয়। বুঝি না ভেবেছেন? আমি ঠোঁটকাটা মানুষ, যা বুঝি তাই বলেছি। এসব আমি হতে দেব না, আপনি মেম্বারদের ডেকে সভা করুন, আমি বক্তব্য রাখব, আবেদন জানাব।
