আল তুই ফাস্টবোলার হতে চাস, তাই না?
বড়দা, বাবা, বিপিনদা, ডাক্তারবাবু, তুমি—সবাই তখন ঘরে ছিলে। হাবুর মা আমাকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গেল মার কাছে। আমি চোখ মেলতে পারছিলাম না, এত ঘুম তখনও চোখে। মা অনেকক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে হাসল, ডান হাতটা কাঁধের. ঠিক এইখানে রেখে আমায় টানল। আমি মার বুকে মাথা রাখলাম। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মা শুধু বলল, আন্দ আন্দ, লক্ষ্মী হয়ে থাকিস। তারপর বৃষ্টির একটানা শব্দটা আমাকে আবার ঘুম পাড়িয়ে দিল।
আন্দ, লর্ডস মেলবোের্ন ব্রিজটাউন ইডেনে আগুন ছোটাবি। ইন্ডিয়া রাবার আনবে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে।
বৃষ্টিতে আমি ভিজতুম। বৃষ্টি আমাকে মার কথা মনে পড়িয়ে দেয়। বৃষ্টি মায়ের মতো সারা গায়ে হাত বুলোয়। আমার জ্বর হত, তবু ভিজতুম। মেজদা, আর কি ভিজতে পারব না?
আন্দ, সারা দেশ গর্বে তোর দিকে তাকাবে। বলবে, হারা ম্যাচ, জেতা অসম্ভব, তবু জিতিয়ে দিল আনন্দ ব্যানার্জি। একা জিতিয়ে দিল। এমন ফাস্ট বোলিং পৃথিবীতে আগে হয়নি।
কিন্তু আমি জানি, আমি জানি।
আনন্দ ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে মুখ রাখল অরুণের কোলে।
কিচ্ছু জানিস না। কী জানিস…য়্যাঁ, কী জানিস এইটুকু ছেলে? সব অসুখই সারে। লক্ষ্মীছেলের মতো কথা শুনলে সব অসুখই সারে।
২. জানলার ধারে ভোরবেলায়
০৫.
জানলার ধারে ভোরবেলায় চেয়ারে বসে আনন্দ কৌতূহলে তাকিয়ে রইল মাঠের দিকে।
চেয়ারে বসলেই শুধু মাঠটার এক-তৃতীয়াংশ পুবদিকের জানলা দিয়ে দেখা যায়। বাকিটা ঢাকা পড়েছে কাগজিলেবু গাছটায়। বটতলা ইনস্টিটিউটের খানিকটা দেয়াল আর লাইব্রেরির একটা জানলাও আনন্দ দেখতে পায়। এখন জানলাটা বন্ধ অর্থাৎ ডগুদা এখনও আসেনি। সাতটায় লাইব্রেরি খোলার কথা।
এই নিয়ে চারদিন ওরা মাঠে আসছে। গুটি সাতেক বাচ্চা মেয়ে এবং আর একজন, যাকে প্রায়ই আনন্দ রাস্তায় দেখেছে। কাঁধে রঙিন ঝোলা, কালোপাড় সাদা শাড়ি, গায়ের রঙ কার্বন পেপারের ঝকঝকে দিকটার মতো, মুখটি লম্বাটে, সামনের দুটি দাঁতকে ঠোঁট কোনওমতেই আড়ালে রাখতে পারে না। শুধু হাঁটার জন্যই ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। এমন মেরুদণ্ড সিধে রেখে, চওড়া কবজির হাত দুটো না দুলিয়ে, মাথাটা একটু ঝুঁকিয়ে, গ্যারি সোবার্সের চলনে কোনও মেয়েকে আনন্দ হাঁটতে দেখেনি। সে আরও লক্ষ করেছে, প্রায় পুরুষদের মতো বাইসেপসের গড়ন, আঙুলগুলো মোটা। পায়ে সাদা কেডস। বয়স, আন্দাজ করা শক্ত। তার মনে হয়েছে, তিরিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে কোনও একটা জায়গায়। আনন্দ ওকে লটারির টিকিট বিক্রি করতে দেখেছে। থাকে বোধহয় বটতলার পিছনের কোনও গলিতে। তার বেশি সে ওর সম্পর্কে কিছু জানে না। মেয়েগুলির বেশির ভাগই বটতলা পাড়ার।
মাঠটাকে পাক দিয়ে ওরা দৌড়চ্ছে। কাগজিলেবু গাছটার পাশ দিয়ে সেকেন্ড দশেকের জন্য আনন্দ ওদের দেখতে পাচ্ছে। ধীরে, যেন লেফট-রাইট করতে করতে দৌড়চ্ছে। পা ফেলা শিখছে। একটি মেয়ের হচ্ছে না, আনন্দ এত দূর থেকেই সেটা বুঝতে পারছে।
মেয়েটি থেমে বাঁ দিকে তাকাল। লেবু গাছের আড়াল থেকে এগিয়ে এল—মনে মনে আনন্দ নামটা ঠিক করে ফেলে—লেডি সোবার্স। মেয়েটিকে কী বোঝাচ্ছে হাত নেড়ে, তারপর ঝুকে পা দুটো ধরে পর পর তোলা-নামা করিয়ে। এতদূর থেকে। আনন্দ শুনতে পাচ্ছে না। স্টেপিংটা দেখাবার জন্য লেডি সোবার্স নিজেই ছুটতে গিয়ে হাঁটুতে শাড়ি আটকে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল।
আনন্দ চোখ বুজল সঙ্গে সঙ্গে। প্রায় কুড়ি সেকেন্ড পর চোখ খুলল। মাঠের ওইখানটা ফাঁকা, কেউ নেই! এবার এল দুটি মেয়ে। ওদের পিছনে, লেডি সোবার্স। অ্যাথলিটরা যেমন খাটো প্যান্ট পরে তাই পরনে। রংটা আকাশি নীল। আনন্দ অবাক হয়ে গেল ওকে প্যান্ট পরা দেখে। এত বয়সী কেউ, অত খাটো প্যান্ট পরে এমন খোলা মাঠে! লোকজন যারা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে নিশ্চয় ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে বা দাঁড়িয়ে পড়ছে। আনন্দর কান দুটো গরম হয়ে উঠল। প্যান্টটা নিশ্চয় পরেই এসেছিল, ব্লাউজের মতো শার্টটাও। নিশ্চয় একসময় দৌড়টৌড় করত, ধরনধারণ দেখে তাই তো মনে হচ্ছে। কিন্তু এইরকম রক্ষণশীল এলাকায় প্রকাশ্যে এমন পোশাক পরতে পারে এত বয়সে—এ কে?
আনন্দ এরপর অনেকক্ষণ আর ওদের দেখতে পেল না। কিছু একটা করছে ওরা লেবু গাছটার ওধারে। দোতলার বারান্দায় গেলে দেখা যাবে, কিন্তু এঘর থেকে তার বেরোনো নিষেধ। শিকারি নেকড়ের মতো বিপিনদা ঘুরে বেড়ায় ঘরটার কাছাকাছি, দোতলায় মেজদা এখনও নিশ্চয় ঘুমোচ্ছে। নতুন টেবল-ঘড়িটায় সময় দেখল আনন্দ। ছটা বেজে পঞ্চাশ। সূর্য এখনও মন্দিরের আড়ালে, তবে কারখানার চালার ওপর রোদ পড়েছে।
ঘর থেকে সন্তর্পণে আনন্দ বেরোল। দোতলার বারান্দার তলায়, সিং-দরজার পাশের রকটা থেকে মাঠের অপরদিক দেখা যায়। মেয়েরা এখন কী করছে সেটা জানার জন্য কৌতূহলে সে মারা যাচ্ছে।
বিপিনদা বোধহয় দোতলায়। রান্নাঘর থেকে শব্দ আসছে, হাবুর মা এখন ব্যস্ত। প্রায় ছুটেই সে বাইরের রকে এল। একমাস পর এই প্রথম।
লেডি সোবার্স স্টার্ট নেওয়া দেখাচ্ছে। মাটিতে দুহাত, একটা হাঁটু ভেঙে মাটিতে ছুঁইয়ে রাখা। ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে বেড়ালের মতো শরীরটা কুঁকড়ে, তারপরই ছিটকে যাওয়া। এত দূর থেকে আনন্দ দেখতে পাচ্ছে স্টার্ট নেবার সেকেন্ড চারেক আগে ওর সারা শরীরটা শক্ত হয়ে যাচ্ছে। হাতির শুড়ের মতো কাঁধ থেকে নেমে আসা হাত দুটোর পেশিগুলো তীক্ষ্ণ হল, উরু থেকে পায়ের গোছ পর্যন্ত পাকানো রয়েছে ইস্পাতের স্প্রিং। মুখটা তুলে সামনে তাকিয়ে। গলার দুপাশে কান পর্যন্ত দড়ির মতো পাকিয়ে উঠেছে মাংস, চোয়াল শক্ত আর চোখদুটো ঝকঝক করছে সকালের রোদে। কালো পাথরে কয়েক মুহূর্তের জন্য খোদাই করা একটা অদ্ভুত কাঠিন্য যা বেগবান হবার প্রতীক্ষায়। বিপুল প্রাণশক্তি বেঁধে রাখা আছে লেডি সোবার্সের এই ভঙ্গিতে, ছাড়া পেলেই সকালের এই নরম রোদকে জ্বালিয়ে উৎখাত করে দেবে যেন। আনন্দর বুকের মধ্যে তিরতির করে উঠল ভয়।
