মিস্ত্রি আনিয়ে সারিয়ে, চুণকাম করে আনন্দর খাট বিছানা বই থেকে শুরু করে ব্যবহারের যাবতীয় জিনিস নীচের ঘরে আনা হল। ছোট্ট ঘরটা তাতেই যেন ভরে গেল। উত্তরে ছাড়াও পুবে একটা জানলা। সেটা খুললে বাড়ির বাগান তারপর পাঁচিল। বাগান বলতে কাগজিলেবুর গাছ, নিম গাছ, পাকার পোড় ইট, জংধরা টিন, সিমেন্টের ভাঙা রক আর এক হাঁটু ঘাস।
ঘরের ভিতর দিকেও একটা জানলা। অনেক টানাটানি করে অরুণ সেটা খোলে। অনাদিপ্রসাদের চেম্বারের দরজার মুখোমুখি জানলাটা। অরুণ সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেয়।
দু-একদিন লাগবে ঘরের গন্ধটা কাটতে। তারপরই ঠিক হয়ে যাবে। একটা পাখা লাগবে, কাল পরশুই কিনে আনব। একটা ঘড়ি হলেও ভাল হয়। আলনাও দরকার।
আনন্দ খাটে বসে দেখছিল কথা বলতে বলতে অরুণের পায়চারি। একা একটা ঘরে এবার থেকে দিন-রাত কাটাতে হবে ভাবতেই তার গা ছমছম করে উঠছে। কৌতূহলও হচ্ছে। ব্যাপারটা কেমন লাগবে কে জানে। অনেক রাত পর্যন্ত গল্পের বই পড়া যাবে, আলো নিভিয়ে দিতে বলবে না কেউ। এই সুবিধেটা ছাড়া আর কী লাভ হচ্ছে!
মেজদা, আমার কী অসুখ করেছে?
কিছু না, সামান্যই, অরুণ হাসবার চেষ্টা করে বলল। অসুখ অনেক রকমের হয়, কোনওটায় সঙ্গে সঙ্গে অপারেশন করতে হয়, কোনওটায় দীর্ঘদিন ওষুধ আর খাওয়াদাওয়ার রেস্ট্রিকশনে থাকতে হয়, কোনওটায় শুধু ডিসিপ্লিনড হতে হয়। আন্দ, তোমায় ডিসিপ্লিনড হতে হবে।
বিপিন দোতলার কুঁজোটা এনে রাখল। হাবুর মা তার নিজের বিছানা বালিশ এনে খাটের নীচে গুছিয়ে রাখছিল, বিপিন ধমকে উঠল: ওসব এখানে কেন?
আন্দ কি রাতে একা শশাবে নাকি? ভয় করবে না?
তোর তো নাক ডাকে, ও ঘুমোবে কী করে?
একটা ধুন্দুমার ঝগড়াকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে অরুণ বলল, হাবুর মা রাতে এঘরে থাকুক। একজনের থাকা দরকার। আনন্দর চলাফেরা একদম বারণ। ঝগড়াঝাঁটি শুনলে উত্তেজনা হবে, তাতে ক্ষতি হতে পারে।
অরুণের কথা শেষ হতে ওরা আনন্দর দিকেই তাকিয়ে ছিল। সে দেখল দু জোড়া চোখে ভীষণ মমতা, স্নেহ আর উৎকণ্ঠা। দেখে সে হাসল।
অরুণ তার পাশে খাটে বসল। জানলা দিয়ে একদৃষ্টে বাইরে তাকিয়ে আছে। কিছু একটা ভাবছে। আনন্দও চুপ করে মেঝের দিকে তাকিয়ে। সে কিছুই ভাবছে না। ঘরে আর কেউ নেই। জলার দিক থেকে ঘুঘুর ডাক ভেসে আসছে।
আন্দ, তুই যথেষ্ট বড় হয়েছিস, নিজের ভালমন্দ বোঝার মতো বয়স হয়েছে।
অরুণ জানলার বাইরে চোখ রেখেই কথা বলে যাচ্ছে। ভারী থমথমে গলার স্বর। কারুর মৃত্যু সংবাদ বা গুরুতর দুর্ঘটনার খবর বলার সময় রেডিয়োর খবরপড়ুয়ার স্বর যেরকম হয়। মেজদা ওদের সকলের থেকে ভাল খবর পড়ে দেবে।
তোর অসুখটা খুব সিরিয়াস ধরনের।
কী অসুখ?
তোকে দারুণভাবে নিয়ম মেনে চলতে হবে। চব্বিশ ঘণ্টাই শুয়ে থাকা দরকার। শুধু বাথরুমে যাওয়া ছাড়া। শুয়েই খাওয়াদাওয়া করতে পারলে ভাল হয়।
আমি তো চলাফেরা দিব্যিই করতে পারছি, তা হলে?
এ ঘর থেকে একদম বেরোবে না।
ডাক্তারবাবু তো বললেন আস্তে আস্তে চলাফেরা করা যায়, শুধু সিঁড়ি ভাঙাই বারণ।
নিয়মিত ট্যাবলেট খেতেই হবে।
আনন্দ চুপ করে রইল। অরুণের স্বর অধৈর্য বিরক্ত হয়ে উঠেছে। ভিতরে ভিতরে যেন আবেগের সঙ্গে সে যুদ্ধ করছে। চেপে নামিয়ে দিচ্ছে কিন্তু পারছে না। চোখ বড় হয়ে গেছে, মুখ লাল হচ্ছে। মেজদার ভিতরে একটা বেলুন ফুলে উঠছে। ফেটে যায় যদি!
ঠাণ্ডা লাগাবে না। সারাক্ষণ জামা পরে থাকতে হবে। এঘরে বোধহয় পাখা দেওয়াটা ঠিক হবে না। সর্দিকাশি কোনওরকমেই যেন হয়।
অরুণ উঠে গিয়ে জানলাগুলো বন্ধ করে আবার খুলে কয়েকবার পরীক্ষা করল।
বৃষ্টিতে ভেজা একদম বারণ। চটি আছে? আচ্ছা কিনে আনব। খালি পায়ে হাঁটবে না কখনও। মেঝেয় ভুলেও শোবে না। বসবেও না।
না না না, কী হয়েছে আমার যে এত বারণ? এই তো আমি হাঁটছি।
আনন্দ পায়চারি শুরু করল।
এই তো লাফাচ্ছি।
আন্দ!
চাপা চিৎকার করে অরুণ হাত বাড়িয়ে আনন্দর হাত চেপে ধরল।
ক্লাস টেন-এ যে পড়ছে, নিজের ভালমন্দ তার বোঝা উচিত।
কী আমার ভাল আর মন্দ? এইভাবে ঘরের মধ্যে সারাদিন নিয়ম মেনে, কী আমার ভাল হবে? আমি তো ঠিকই আছি। শুধু এই ব্যথাটা, এ তো সেরে যাবে। বল করার সময় বুকের মধ্যে যে ধড়ফড়ানি
কোনওদিন সারবে না।
বলেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল অরুণের মুখ। আনন্দ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে।
কোনওদিনই না?
নিশ্চয়ই সারবে, ডাক্তারবাবু যা বলেছেন যদি সেইভাবে চলো। আন্দ..আন্দ তোর নিজের জীবন এখন তোর নিজেরই হাতে। সারাক্ষণ তোকে চোখে চোখে রাখবার কেউ নেই। নিজেকেই নিজে দেখবি।
যদি না দেখি?
অরুণ চুপ করে তাকিয়ে রইল ওর মুখের দিকে। বেলুনটা ফেটে চুপসে গেছে।
আমার প্যারালিসিস হবে। আজীবন বিছানায় শুয়ে থাকতে হবে।
আনন্দ চেয়ারে বসল অরুণের মুখোমুখি। বিকেলের ফিকে সোনালি রোদ দূরে একটা নারকেল গাছের পাতার ভাঁজে ভাঁজে ধুলোর মতো জমে। পুবের জানলা দিয়ে অরুণ দেখছে আষাঢ়ের মেঘ। আকাশের একটা কোণ থেকে গুঁড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসছে পিঠে একরাশ বৃষ্টি নিয়ে। দুজনেই ক্রমশ ধূসর ঝাপসা হতে লাগল ঘরের মধ্যে নিঃশব্দে।
আন্দ, আন্দ।
ফিসফিস করল অরুণ। হঠাৎ আনন্দর মনে পড়ল তার মাকে।
ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছিল। আমি ঘুমোচ্ছিলুম। হাবুর মা ঘুম ভাঙিয়ে বলল, চল মা তোকে দেখতে চাইছে।
